বিনোদন ডেস্ক
২৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৫:২৯ পিএম
কণ্ঠশিল্পী, সংগীত গবেষক এবং লেখক মোবারক হোসেন খান। জন্ম ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার শিবপুর গ্রাম। বাবা ওস্তাদ আয়েত আলী খান ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের একজন প্রসিদ্ধ সংগীতশিল্পী এবং সেতারবাদক। তার চাচা সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান।
মোবারক হোসেন খান ঢাকা বিশ্যবিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এম এ পাশ করেন। পেশাগত জীবনে তিনি দীর্ঘ ত্রিশ বছর বেতারে চাকরী করেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন। নজরুল ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতির পদ অলংকৃত করেন। সংগীত, অনুবাদ ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। সংগীত গবেষণায় তিনি একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, গবেষণা সাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং অনুবাদে অলক্ত সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
আমার কাছে প্রথম পরিচয়, মোবারক হোসেন খান আমার বাবা। আমার বাবা যে পরিবারে জন্মগ্রহন করেছিলেন সে পরিবার ছিল একটি সংগীতের পরিবার। আমার পিতামহ ওস্তাদ আয়েত আলী খান ছিলেন একজন সুরসাধক, সুরবাহার (সেতার) শিল্পী। সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের ছোট ভাই। খুব স্বাভাবিকভাবে জন্মের পর থেকেই সুরের সঙ্গে পরিচয় আমার বাবার। ছোটবেলায় কথা বলতে শেখার সাথে সাথেই গান শিখতে গেলেন। বাসায় বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের চর্চা হয়।হারমোনিয়াম থেকে শুরু করে সেতার, সরোদ, সুরবাহার, বেহালা, তবলা-বাঁয়া আরো কত কি ! বাসার আর সব শিশুদের মত আব্বা হারমোনিয়ামটা টেনে নিয়ে গুণ গুণ করে গান গাইতে শুরু করলেন। পরিবারে একটা রেওয়াজ ছিল ছেলেরা যখন স্কুলে যাবার মত বড় হয় তখন লেখাপড়ার পাশাপাশি তাকে কোনো একটা বাদ্যযন্ত্রে হাতেখড়ি দেওয়া হতো।
আব্বাকে হাতেখড়ি দেওয়া হলো বেহালা যন্ত্রে। প্রতিদিন স্কুল থেকে এসে আব্বা দাদুর বাদ্যযন্ত্রের কারখানায় চলে যেতেন। সেখানে আরো কয়েকজন একসাথে শিখতেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আব্বার চাচাতো ভাই আমিনুর হোসেন খান, তিনি বাজাতেন এস্রাজ। আরেকজন ছিলেন উনার ভাগ্নে ওস্তাদ খুরশিদ খান। সেতারে তালিম নিতেন। পরে তিনি দেশের একজন সেরা সেতারশিল্পী হয়েছিলেন। আব্বা এঁদের সাথে কয়েক বছর তালিম নিয়েছিলেন। কিন্তু পরে পড়াশোনার চাপে হোক বা অন্য কোনো কারণে হোক শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেননি। লেখাপড়ায় বরাবর ভালো ছিলেন সেজন্য দাদুর দিক থেকে একটা চাপ ছিল ভালোভাবে লেখাপড়া করার জন্য। যার ফলে ক্রমে আব্বা লেখাপড়া নিয়ে বেশী ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। সংগীত চর্চাটা সেভাবে ধরে রাখতে পারলেন না।
তাঁর সংগীত চর্চাটা ছিল অনিয়মিত। বেহালা ছেড়ে দেবার পর তিনি ‘মন্দ্রনাদ’ নামে একটা যন্ত্র বেশ কিছুদিন বাজিয়েছেন। যন্ত্রটা অনেকটা বেহালার আকার। কিন্তু অনেক বড়। আর বাজানোর ধরণটা আলাদা। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের পরামর্শে ওস্তাদ আয়েত আলী খান এই যন্ত্রটা উদ্ভাবন করেছিলেন। এরপর কিছুদিন বাজিয়েছেন ‘চন্দ্রসারং’। এই যন্ত্রটা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের পরামর্শে ওস্তাদ আয়েত আলী খান নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়া তবলা বাজানো রপ্ত করেছিলেন ছোটবেলে থেকেই। ছাত্রজীবনে অনেক অনুষ্ঠানে তবলা সংগীত করেছেন। তাছাড়া উচ্চাঙ্গ সংগীতেও তাঁর দক্ষতা ছিল।
চাচাতো ভাই ওস্তাদ খাদেম হোসেন খান, ভাগ্নে ওস্তাদ খুরশিদ খানের মতো গুণী শিল্পীদের সাথে বাজিয়েছেন তিনি। কিন্তু সবশেষে মনে ধরলো বাবার যন্ত্রটাকে। বাবাকে একদিন বললেন, আমি সুরবাহার বাজাবো। দাদুর খুব আদরের ছেলে ছিলেন আব্বা। তাঁর কোনো আবদারে দাদু না বলতেন না। তিনি অনুমতি দিলেন এবং নিজের সুরহাহার যন্ত্রটা ছেলেকে বাজাতে দিলেন।
চাকুরী জীবন শুরু করা পর্যন্ত তিনি নিয়মিত সুরবাহার বাজিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে চর্চা সেভাবে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে বিটিভির ‘সুরলহরী’ অনুষ্ঠানে অনেকদিন পর্যন্ত সুরবাহার পরিবেশন করেছেন।
২৪ নভেম্বর ছিল মোবারক হোসেন খানের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী।
ফেসবুক থেকে সংগৃহীত