আলমগীর কবির
০৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৬:৩৮ পিএম
আল-বালাদকে বলা হয় জেদ্দার পুরনো শহর। ঐতিহাসিকভাবে মক্কা থেকে মদিনা এবং অন্য স্থানগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের কেন্দ্র। এখানে বেশিরভাগ স্থাপনা ইসলামিক শৈলীতে নির্মিত, এরমধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বাড়ি, মসজিদ ও বাজার। শহরটি জেদ্দার আধুনিক অংশ থেকে কিছুটা আলাদা। পর্যটকরা সৌদি আরবের প্রাচীন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং জীবনধারা সম্পর্কে জানতে এখানে আসেন।
তবে শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর এখানকার কালচারাল স্কয়ারে সবার মুখে মুখে ছিল প্রখ্যাত অভিনেতা মাইকেল ডগলাসের নাম। কারণ আগেই জানানো হয়েছিল এদিন বিকেলে অডিটরিয়াম রুমে কনভারসেশন প্রোগ্রামে অংশ নেবেন এই হলিউড অভিনেতা। হোটেল রুম থেকে অনুষ্ঠানে যেতে একটু আগেই বের হয়েছিলাম, কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করতে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয়েছিল। সাধারণত এই ধরণের প্রোগ্রামে যেতে আগে থেকে টিকিট বরাদ্ধ করতে হয়। তবে এই অনুষ্ঠানে আসনের তুলনায় টিকিটের সংখ্যা ছিল অনেক কম। যারা টিকিট পাননি তারা অভিনেতাকে এক নজর দেখতে বাইরে ভীড় করে ছিলেন। আমার পাশে দাঁড়ানো কানাডিয়ান সাংবাদিক গ্রেভার বলছিলেন, ৮০ বছর বয়সেও ডগলাসের এতো জনপ্রিয়তা কিভাবে সেটা নিয়েই আজ প্রশ্ন করব।
অডিটরিয়ামের ভেতর প্রবেশের পর মনে হলো এই প্রশ্নটা আরও অনেকেরই। ‘ওয়াল স্ট্রিট', 'ফেটাল অ্যাট্রাকশন' এবং 'অ্যান্ট-ম্যান অ্যান্ড দ্য ওয়াস্প: কুয়ান্টামানিয়া'সহ একাধিক সফল সিনেমার অভিনেতার এমন জনপ্রিয়তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু উত্তরটা এসেছে সবার সঙ্গে ডগলাসের শুভেচ্ছা বিনিময়ের পরেই। তিনি বলেছেন, ৮০ বছর বয়সেও নতুন ধরণের কাজে আগ্রহী তিনি। ২০২৩ এবং ২০২৪ সালজুড়ে ক্যারিয়ার থেকে বিরতি নিলেও, মাইকেল ডগলাস বলছেন যে তিনি এখনও নতুন প্রকল্পে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত, বিশেষ করে এমন ধরনের কাজ যা তাকে নতুন অভিজ্ঞতা দিতে পারে, যেমন একটি হরর মুভি।

মাইকেল ডগলাস জানান, ‘আমি এখন ৮০ বছর বয়সে পৌঁছেছি। ২০১৩ সালে ক্যানসার চিকিৎসার পর এই প্রথমবারের মতো আমি একটানা বিশ্রাম নিচ্ছি। ২০২৩ সালে আমি পুরোপুরি বিশ্রামে ছিলাম এবং এখন ২০২৪ও প্রায় শেষ। এই সময়টা আমি বেশ উপভোগ করছি, জীবনটা সুন্দরভাবে কাটাচ্ছি।”
মাইকেল ডগলাস আরও উল্লেখ করেন যে, এই বিরতির আগে তিনি বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যা তার অভিনয়ের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে। তিনি 'দ্য কমিন্সকি মেথড' নামক সিরিজে অভিনয় করেছেন, যেখানে তিনি কৌতুক এবং কমেডি নিয়ে নতুনভাবে কাজ করেছেন। এছাড়া 'অ্যান্ট-ম্যান অ্যান্ড দ্য ওয়াস্প: কুয়ান্টামানিয়া'তে অভিনয় করে প্রথমবারের মতো গ্রীন স্ক্রিন প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। তার অভিনয়ের পরিসর আরও প্রসারিত হয়েছে 'ফ্র্যাঙ্কলিন' নামক পিরিয়ড ড্রামাতেও, যেখানে তিনি ইতিহাসভিত্তিক চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
তবে মাইকেল ডগলাস তার ক্যারিয়ার সম্পর্কে কিছুটা আফসোসও করেছেন। তিনি বলেছিলেন, "আমি যখন প্রযোজনা শুরু করেছিলাম, তখন এক ধরনের সফলতা পেলেও তা আমার অভিনয়ের আনন্দকে ছিনিয়ে নিয়েছিল। প্রযোজনা ছিল অত্যন্ত চাপপূর্ণ এবং আমাকে নানা কাজের মধ্যে বিভক্ত করতে বাধ্য করেছিল।" তিনি আরও বলেন, "কখনও কখনও, আমি নিজেকে একাধিক সিনেমায় প্রযোজক হিসেবে দেখতে পেতাম এবং অভিনয়ও করতাম, যা একেবারেই সঠিক নয়। এতে অভিনয়ের আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যায়।"

মাইকেল ডগলাস তার ক্যারিয়ার এবং প্রযোজনার দিকটি পুনর্বিবেচনা করে বলেছেন, "অভিনয়ের মূল আনন্দ হলো একেবারে নিজের ভেতরে ডুবে যাওয়া, আর প্রযোজনার কাজ এতে বাধা সৃষ্টি করেছিল। আমি অনেক সময় চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য হই, যেমন স্ক্রিপ্ট বা লোকেশন ইত্যাদি, যা অভিনয়ের আনন্দ থেকে দূরে সরিয়ে রাখত।"
তবে দীর্ঘ বিরতির পরও মাইকেল ডগলাস পুরোপুরি নতুন অভিজ্ঞতার জন্য প্রস্তুত। তিনি এমন কাজের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, যা তাকে নতুন চ্যালেঞ্জ এবং নতুন ধরনের ভূমিকায় নিয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, "আমি সবসময় নতুন কিছু শেখার এবং নতুন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করার জন্য প্রস্তুত, যেমন যদি কোনো হরর মুভির সুযোগ আসে, আমি সেটা চেষ্টা করতে প্রস্তুত।"
এছাড়া, মাইকেল ডগলাস তার ক্যারিয়ারের সফল শুরু এবং একাধিক প্রযোজক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাও শেয়ার করেছেন, বিশেষ করে 'ওয়ান ফ্লু ওভার দ্য কুকু’স নেস্ট' ছবির প্রসঙ্গে, যেখানে তিনি প্রথম প্রযোজক হিসেবে ক্রেডিট পান। তবে, তার মতে, প্রযোজনার চাপ তার অভিনয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল এবং সেজন্য তিনি কিছু সময় অভিনয়ে আরও বেশি মনোযোগী হতে চান।
এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে রেড সি আন্তর্জাতিক উৎসবের পক্ষ থেকে তাকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়, যা তার বিশাল ক্যারিয়ার এবং চলচ্চিত্র শিল্পে তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
রেড সি ফিল্ম ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারওম্যান জোমানা আল-রাশিদ ডগলাসকে এই সম্মাননা প্রদান করেন। তিনি তার বক্তৃতায় বলেন, ‘মাইকেল ডগলাসের ব্যতিক্রমী প্রতিভা, তার শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা এবং বিনোদন জগতে তার অসাধারণ প্রভাবের জন্য তাকে আমরা সম্মানিত করছি।’
ডগলাস তার বক্তব্য-এ সৌদি আরব এবং আরব অঞ্চলের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির প্রতি উৎসবটির প্রভাব নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমি সত্যিই সম্মানিত যে রেড সি ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকে এই পুরস্কার পেয়েছি। এটি একটি অনন্য সুযোগ যা বিশ্বব্যাপী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।’
ফেস্টিভ্যালে মাইকেল ডগলাসের সঙ্গী ছিলেন তার স্ত্রী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী ক্যাথরিন জেটা-জোনস। তাদের উপস্থিতি ফেস্টিভ্যালে উজ্জ্বলতা যোগ করে এবং মাইকেল ডগলাসের কর্মজীবন এবং অর্জনগুলোকে সম্মান জানাতে এই আয়োজনটি আরও স্মরণীয় হয়ে উঠেছে।
কনভারসেশন প্রোগ্রামে আরও যাদের নাম
এবারের আসরে নামিদামি তারকারা কথোপকথন অধিবেশনে অংশ নিচ্ছেন। বৃহস্পতিবার প্রথম আয়োজনে ছিলেন আমির খান। কালচার স্কয়ারের রেড সুক-ফোরাম রুমে ছিল এই আয়োজন। এতে নিজের তিন দশকের ক্যারিয়ারের ওপর আলোকপাত করেছেন ৫৯ বছর বয়সী এই অভিনেতা। তার কথোপথন সঞ্চালনা করেন লেবানিজ টিভি উপস্থাপক ও সাংবাদিক রায়া আবিরাশেদ।
উৎসবের কথোপকথন অধিবেশনে শুক্রবার অংশ নিয়েছেন কারিনা কাপুর খান। এ তালিকায় যুক্ত হবেন বলিউড অভিনেতা রণবীর কাপুর, বলিউড অভিনেত্রী শ্রদ্ধা কাপুর, ভারতীয় অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, হলিউড তারকা ভিন ডিজেল, মিশেল ইয়ো, সিনথিয়া এরিভো, সারাহ জেসিকা পার্কার, নিক জোনাস, জেরেমি রেনার, ব্রেন্ডন ফ্রেজার, এমিলি ব্লান্ট, মাইকেল ডগলাস, ক্যাথেরিন জেটা-জোন্স, ইভা লঙ্গোরিয়া, ভায়োলা ডেভিস, অলিভিয়া ওয়াইল্ড, মোনা জাকি, পরিচালক স্পাইক লি, মাইকেল মান, মোহাম্মদ সামি, তার্কিশ তারকা এঙ্গিন আলতান দুজিয়াতান ও নুরগুল ইয়েসিলজায়।