বিনোদন প্রতিবেদক
১৯ মে ২০২২, ০৬:৫৭ পিএম
ঢাকা থেকে প্যারিস রওনা হওয়ার পর বিমানে কান চলচ্চিত্র উৎসব নিয়ে দুই ধরনের ধারণা পেলাম। দুবাইয়ে ট্রানজিট নেওয়ার আগ পর্যন্ত আমার পাশের সিটে ছিলেন হেলাল নামের একজন ভদ্রলোক। বাড়ি কুমিল্লা। আট বছর ধরে তিনি থাকেন ইতালির ভেনিস শহরে। কথায় কথায় তিনি জানতে চাইলেন আমার গন্তব্যের কথা। ফ্রান্সের কান চলচ্চিত্র উৎসব কাভার করতে যাচ্ছি শুনে প্রথমে বেশ উৎসাহ দেখানোর পর কিছুক্ষণ নিরব রইলেন।
দ্বিতীয়বার আলোচনার শুরুতেই তিনি নিজের ইতালি যাওয়ার গল্প শোনালেন। পরিচিত এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ইতালি পৌঁছাতে ১২ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছিল। তারপর ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কাজ শুরুর ছয় বছরের মধ্যে পেয়েছেন সিটিজেনশিপ (নাগরিকত্ব)।

আমাদের মধ্যে যখন এসব আলোচনা চলছিল তখন পাশেই বসেছিলেন দুবাইগামী একজন। নাম সজিব। বাড়ি নড়াইলে। তিনি বললেন, ‘আমি ছয় বছর ধরে দুবাই থাকি। ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছি এখন। আপনার তো ভাগ্য ভালো, সহজেই ইউরোপে যেতে পারছেন।’
তার কথা শেষ না হতেই আবার কথোপকথনে যোগ দিলেন হেলাল। বললেন, ‘ভাই আপনি একটা সুযোগ পেয়েছেন। এটাকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপে থেকে যান।’
আমি কোনো জবাব দিলাম না। বিমান পৌঁছে গেছে দুবাই। তারা চলে গেলেন নিজ গন্তব্যে। তিন ঘণ্টা ট্রানজিট নিয়ে দুবাই থেকে প্যারিস যাওয়া পথে আরও দুই জনের সঙ্গে পরিচয়। তাদের একজনের বাড়ি বাংলাদেশে। নাম মোসাব্বির আহমেদ। বাড়ি সাতক্ষীরা। তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন সুইডেনে। প্যারিসে যাচ্ছেন এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে। আমার গন্তব্য জানতে পেরে তিনি বেশ উচ্ছ্বসিত হলেন। তার মতে, কানের মতো উৎসবে দাওয়াত পারওয়াটাই অনেক সম্মানের।

উৎসবের খুঁটিনাটি অনেক কিছু জানতে চাইলেন। সব শুনে তিনি বললেন, ‘এই সম্মানটুকুই ব্যক্তি জীবনের অর্জন। কিন্তু অনেকেই অর্জন ধরে রাখতে পারি না লোভের কারণে। অনেকেই দেখা যায় খেলা কাভার করতে গিয়ে আর ফেরেন না। এ নিয়ে পুরো জাতি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা জন্ম নেয়।’
আমার পাশে যে আরেকজন তার নাম ফিলিপ। বাড়ি যুক্তরাষ্ট্রে। কান ফিল্ম ফেস্টিভাল কাভার করতে ফ্রান্স যাচ্ছি শুনে তার নানা কৌতূহল। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস হলেও হলিউডের তারকাদের সাক্ষাৎ পান না। কান নিয়ে অনেক গণমাধ্যমকর্মীদের চেয়ে তার জানাশোনা ভালো। ফেসবুকের আইডি নিয়ে রাখলেন মাঝে মাঝে যোগাযোগ করবেন বলে।
বিমানে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে পৌঁছে গেলাম প্যারিস চার্লস ডি গল বিমানবন্দর (সিডিজ)। ওখান থেকে প্যারিসের চারটি বড় রেল স্টেশনে যাওয়ার ট্রেন আছে। আমার গন্তব্য গারদো নর্থ। আরইআর-বি ট্রেন ধরে পৌঁছে গেলাম সেখানে। ৩০ মিনিটের ট্রেন যাত্রা। এজন্য গুনতে হয়েছে ১০.৩ ইউরো। ওখান থেকে নিসের ট্রেন ধরে ১৮ মে চলে এলাম পালে দে ফেস্টিভাল ভবনে।

উৎসব শুরু হয়েছে আরও একদিন আগে, ১৭ মে। তাই ব্যাজ সংগ্রহ করতে খুব একটা কষ্ট হয়নি। উৎসবের ৭৫তম আসরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত হন তিনি। রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ইউক্রেনের সাবেক এই অভিনেতা বিশ্বজুড়ে সবার সমর্থনের জন্য আবেদন জানান।
চলচ্চিত্রে যুদ্ধ ও স্বৈরশাসকদের তুলে ধরার বিষয়ে কথা বলেছেন জেলেনস্কি। এক্ষেত্রে দ্য গ্রেট ডিক্টেটর ও অ্যাপোক্যালিপস নাউর মতো ছবির উদাহরণ টেনেছেন তিনি। ২০১৯ সালে ইউক্রেনের টিভি সিরিজ সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল ছবিতে অভিনয় করে খ্যাতি এসেছে তার কাছে। এর গল্পের মতো বাস্তবেও প্রেসিডেন্ট হয়ে যান তিনি।
সন্ধ্যা ৭টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা) অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। আজীবন সম্মাননা হিসেবে সম্মানসূচক স্বর্ণপাম পেয়েছেন আমেরিকান অভিনেতা-প্রযোজক ফরেস্ট হুইটেকার। তাকে এই স্বীকৃতি তুলে দেন কান চলচ্চিত্র উৎসবের বিদায়ী সভাপতি পিয়েরে লেসকিউর।

এর আগে অনুষ্ঠানে তার অভিনীত বার্ড (১৯৮৮), গোস্ট ডগ: দ্য ওয়ে অব দ্য সামুরাই (১৯৯৯), দ্য কালার অব মানি (১৯৮৬), প্যানিক রুম (২০০২) ছাড়াও বেশ কয়েকটি ছবির অংশবিশেষ দেখানো হয়। এরপর তিনি মঞ্চে হাজির হলে গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান। লুমিয়েরে আসন সংখ্যা দুই হাজার ৩০০টি। সবশেষ মঞ্চে আসেন আমেরিকান অভিনেত্রী জুলিয়ান মুর। রাত ৭টা ৫০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ৫০ মিনিটে) তিনি ফরাসি ভাষায় ৭৫তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে দেখানো হয়েছে প্রতিযোগিতা শাখার বাইরে নির্বাচিত ফ্রান্সের মিশেল আজানাভিসুসের ফাইনাল কাট। এর গল্প একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। এতে অভিনয় করেছেন আজানাভিসুসের স্ত্রী বেরেনিস বেজো এবং ফরাসি অভিনেতা রোমা দ্যুরিস। এর মাধ্যমে তিন বছর পর আবারও কানের উদ্বোধনী ছবির সম্মান পেলো জম্বি কমেডি ধাঁচের ছবি। ২০১৯ সালের উৎসবে উদ্বোধনী ছবি ছিল জিম জারমাশের দ্য ডেড ডোন্ট ডাই। জীবন্ত লাশের দলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাধ্য হয় প্রতিষ্ঠানটি।
আয়োজন শুরুর আগে ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় ধরে ছিল লালগালিচার জৌলুস। এতে তারকাদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের ফিল্ম প্রফেশনাল, কানের স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি, ভাগ্যবান কয়েকজন সাংবাদিকও ছিলেন। জেমস বন্ড ছবির ব্রিটিশ অভিনেত্রী লাশানা লিঞ্চ প্রথমবার কানের লালগালিচায় হেঁটেছেন। মূল প্রতিযোগিতা শাখার বিচারকদের প্রধান ফরাসি অভিনেতা ভাসোঁ লাদোঁর নেতৃত্বে ছিলেন ভারতীয় অভিনেত্রী ও প্রযোজক দীপিকা পাড়ুকোন, যুক্তরাজ্যের অভিনেত্রী ও পরিচালক রেবেকা হল, সুইডেনের অভিনেত্রী নুমি রাপাস, ইতালির পরিচালক ও অভিনেত্রী জাজমিন ত্রিঙ্কা, ইরানি পরিচালক আসগর ফারহাদি, নরওয়ের পরিচালক ইওয়াকিম ত্রিয়ের, যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালক জেফ নিকোলস এবং ফরাসি পরিচালক লাজ লি।

অনুষ্ঠানে বিচারকরা একে একে মঞ্চে আসেন। ভাসোঁ লাদোঁ হাজির হওয়ার আগে তার অভিনীত কয়েকটি ছবির অংশবিশেষ দেখানো হয়। এর মধ্যে অন্যতম গত বছর স্বর্ণপাম জয়ী ফরাসি পরিচালক জুলিয়া দুকুরনের তিতান। তিনি মঞ্চে এলে সবাই দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান। কারও মুখেই মাস্ক দেখা যায়নি। তবে উৎসবের-সংশ্লিষ্টরা সবাই মাস্ক ব্যবসার করেছেন। ক্যামের দর শাখার বিচারকদের পরিচয় করিয়ে দেন সঞ্চালক ভার্জিনি এফিরা। অনুষ্ঠানে তিনি পিয়ানো সুরের সঙ্গে গানও গেয়েছেন।