রেজওয়ান সিদ্দিকী অর্ণ
১৩ এপ্রিল ২০২২, ০২:৪০ পিএম
রিল থেকে রিয়েল লাইফের হিরো ইলিয়াস কাঞ্চন। ক্যারিয়ারের বৃহস্পতি যখন তুঙ্গে, তখন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন তার স্ত্রী। কিন্তু ভেঙে পড়েননি তিনি। শোককে শক্তিতে পরিণত করে তিন দশক ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করে চলেছেন। বাধা এসেছে, তবুও দমে যাননি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিরাপদ সড়কের জন্য লড়ে যাবেন। এ ছাড়া শিল্পীদের উন্নয়নে কাজ করতে হাল ধরেছেন চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির। এসব বিষয় নিয়ে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন কিংবদন্তি এ অভিনেতা। তা তো কিছুটা হচ্ছে। তবে শিল্পী সমিতির কার্যক্রম চালাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কেবলমাত্র সাধারণ সম্পাদক পদের ওপর স্থিতাবস্থা দেওয়া হয়েছে। তাই নির্বাচিত শিল্পীদের নিয়ে আমরা মিটিং করছি। কিছুদিন আগে সহযোগী শিল্পীদের সদস্যপদ ফিরিয়ে দিয়েছি। চলচ্চিত্রের উন্নয়নে সামনে আরও কিছু কাজ করব।

আমার কাছে মনে হয়েছিল শিল্পী সমিতির নেতৃত্বের প্রয়োজন। নিপুণ যখন আমাকে নিয়ে প্যানেল করার প্রস্তাব দিলেন, তখন এটা আমার অনুধাবন হয়। তাছাড়া, আমার ছেলের ভূমিকাও আছে এখানে। সে আমাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
তখন আমাদের ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা ছিল রমরমা। সংগঠন নিয়ে এত মাথা ঘামানোর সময় পেতাম না। কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। ওই সময়টায় শিল্পীদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক বিরাজ করত। একে অন্যকে সম্মান দিয়ে চলতাম। সেই সময়টা এখন নেই। তবে আমি যেহেতু সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি, সেহেতু সম্মানের সঙ্গে কাজ করতে চাই। শিল্পীদের মধ্যে ভ্রতৃত্বের বন্ধন গড়ে তুলতে কাজ করব।

আমার আফসোস খুব কম হয়। তবে খারাপ লাগে। ইন্ড্রাস্ট্রি আমাকে ইলিয়াস কাঞ্চন বানিয়েছে। সেকারণে সিনেমা নিয়ে ভাবতে হয়। কিন্তু দেশের সিনেমা সেভাবে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। ভালো গল্পের সিনেমা হচ্ছে না। সেই একই গল্পে এখনও ছবি হচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে গল্পের ধরন বদলাতে হয়। আগে যে নায়ক-নায়িকার প্রেম হত। তাদের বিচ্ছেদ হলে মানুষ কেঁদে বুক ভাসাত। এখন সে আবেগ নেই। মানুষের সিনেমার প্রতি আগ্রহ কমে গেছে। তারা অর্থের পেছনে ছুটছে। এমনকি মানুষ টাকার কাছে নিজেকে বিক্রি করে দিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, টাকার ভেতর মানুষ বিনোদন খুঁজে পাচ্ছে।
তাছাড়া আগে মানুষ চাইলে যেকোনো সময় প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমা দেখতে পারত। এখন সিনেমা দেখতে গেলে তো পুরো দিনটি মাটি হয়ে যায়। সিনেমা হলে যেতে আসতেই তো সময় চলে যায়। সিনেমা হলে যেতেই যদি দুই-তিন ঘণ্টা লাগে তাহলে সিনেমা দেখার মুড থাকে না। এর ফলে মানুষ হাতের মোবাইল ফোনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অনলাইনে তারা ইচ্ছামতো অনুষ্ঠান দেখছে। সিনেমা হলে যাওয়ার আর প্রয়োজন পড়ছে না।
আমরা চলচ্চিত্রের যে ভীত গড়ে দিয়েছিলাম সেটা এ প্রজন্ম ধরে রাখতে পারল না। তাদের উচিত চলচ্চিত্রকে ভালোবেসে কাজ করা। নিজেদের মধ্যে রেষারেষি বন্ধ করে কাজে মন দিতে হবে। অন্যের ভালো কাজকে প্রশংসা করতে হবে। নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সেটা নিয়ে ঝগড়া থাকলে চলবে না। যদিও এখন প্রতিযোগিতার জায়গা নেই।

সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। ইন্ডাস্ট্রির সংকট এক দিনে তৈরি হয়নি। শুরুর দিকে যদি আমরা সংকট থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতাম, তাহলে ক্ষত এত গভীর হত না। এখন আমাদের একমাত্র ভরসা সরকার। বর্তমান সরকার চলচ্চিত্রবান্ধব। চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য যদি সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা পাই তাহলে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
১৯৯৩ সালে ২২ অক্টোবর আমার স্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর অনেকে আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এসেছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন— মন্ত্রী, এমপি, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের মানুষেরা। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমার দুই সন্তানকে একইসঙ্গে মা ও বাবার ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করতে হবে। কিন্তু আমি তো শ্যুটিংয়ে ১৮ ঘণ্টা ব্যস্ত থাকি। এত ব্যস্ততার মাঝে সন্তানদের সময় দিতে পারব না। তাই চলচ্চিত্র থেকে বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তখন একজন সাংবাদিক আমার এই সিদ্ধান্ত শুনে বললেন, ‘ইলিয়াস ভাই, জীবনটা যেহেতু আপনার তাই সিদ্ধান্তটাও আপনার। কিন্তু দেখেন, আজ যখন আমরা সবাই আপনার বাসায় এসেছি, তখন দেশের আরও অনেক মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। আমরা কিন্তু তাদের বাসায় যাইনি। অথচ ওই সাধারণ মানুষগুলোর কারণে আপনি আজকের ইলিয়াস কাঞ্চন হয়েছেন। তাদের জন্য কিছু করুন আপনি। আপনি আপনার স্ত্রী-সন্তানদের ভালোবাসেন। ওদেরকে ভালোবাসেন না? আপনি সড়ক দুর্ঘটনা রোধের জন্য কিছু করেন।’
তার কথাটি আমি ১৫ দিন ভেবেছি। তারপর কাছের মানুষ ও সাংবাদিকদের নিয়ে বসেছিলাম। অনেকে আমাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। আমার কেউ কেউ বলেছিলেন, ‘হিরো, আপনি সুপারস্টার। মানুষ যেমন আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা দেখে। তেমন মানুষ পর্দার দিকে তাকিয়ে আপনাকে দেখে। আপনি তাদের ধরাছোঁয়ার মধ্যে চলে আসেন, তাহলে সেই ইমেজটা থাকবে না।’

তখন আমি একটাই উত্তর দিয়েছিলাম, ‘যে মানুষগুলোর জন্য আমি হিরো হয়েছি, তাদের জন্য প্রয়োজনে জিরো হতেও পিছপা হব না।’
এরপর ওই বছরের ২৯ নভেম্বর একটি সংবাদ সম্মেলন করেছিলাম। যেখানে সংগঠনটির ঘোষণা দিলাম। ১ ডিসেম্বর পদযাত্রা করে প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে ২২ দফা প্রস্তাবনা দিলাম। তবে কাজটি যে এত কঠিন হবে, সেটা আগে ভাবিনি। মানুষ তখন বিশ্বাসই করতে চাইছিলেন না যে, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা যায়। তারা ভাবতেন, সড়ক দুর্ঘটনা নেহায়েত ভাগ্যের দোষ। শুধু তাই নয়, অনেক রাজনৈতিক নেতা আমার দিকে আড়চোখে তাকানো আরম্ভ করেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, আমি হয়ত নতুন কোনো দল গঠন করছি।
আমরা কোনো বিদেশি ফান্ড পাই না। প্রতিষ্ঠার অনেক বছর পর ২০১৬ সালে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ এনজিও হিসেবে নিবন্ধন করি। এনজিও কখনও আমার পছন্দ নয়। এর আগে সামাজিক সংগঠন হিসেবে কাজ করেছি আমরা। তবে পরে এনজিও হিসেবে নিবন্ধনের কারণ হলো, আমার ছেলে যখন লন্ডন থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে আসলো তখন তাকে আমি আমার সংগঠনে কাজ করতে বললাম। কেননা, লোক রেখে সংগঠন পরিচালনার সামর্থ্য আমার নেই। আমার কথামতো সে কাজ আরম্ভ করল। তাকে আন্তর্জাতিক অ্যাফেয়ার্সের দায়িত্ব দেওয়া হলো। সে তখন জাতিসংঘ, আইআরএফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করল। কিন্তু তাদের সঙ্গে কাজ করতে হলে এনজিও রেজিস্ট্রেশন নম্বর বাধ্যতামূলক। সেই প্রয়োজনের তাগিদে আমরা বাধ্য হয়ে এনজিও রেজিস্ট্রেশন করাই।
হিরো থেকে জিরো হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েই আমি এই আন্দোলন শুরু করেছিলাম। আমি বৃহৎ মানুষের স্বার্থে কাজ করতে চাই। সামান্য কিছু মানুষের জন্য তো আমি আমার আন্দোলন থামিয়ে দিতে পারি না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিরাপদ সড়কের জন্য লড়ে যাব।

আমি ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা পেয়েছি চলচ্চিত্র থেকে। সিনেমায় আমার চরিত্রের কাজই ছিল সবসময় মানুষের উপকার করা। বিপদে সাহায্য করা। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। এগুলো কিন্তু আমার জীবনের মধ্যে একাত্ম হয়ে গিয়েছে।
জীবন খুব মূল্যবান জিনিস। জীবন একটাই। এই এক জীবনকে কাজে লাগাতে হবে। কেবল জীবিত থাকাকালীন মানুষ কাজ করতে পারে। আবার জীবনের একটা সময় পর জীবন ভোঁতা হতে থাকে। তখন তাকে অন্যের ওপর নির্ভর হয়ে চলতে হয়। এক জীবনে সুখ থাকে। দুঃখ থাকে। থাকে না পাওয়ার বেদনা।
আরএসও/আরআর