Dhaka Mail Logo

শিক্ষা

শতভাগ সাক্ষরতা যেন অধরা

সেলিম আহমেদ

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৯:৪৭ এএম

শিক্ষার হার বাড়ছে প্রতিনিয়ত, শিক্ষিত হচ্ছে মানুষ। নিরক্ষর মানুষ পাচ্ছে শিক্ষার আলো। তবে কাগজ কলমের হিসাব বলছে ভিন্ন কথা। দেশ স্বাধীন হওয়ার অর্ধশতক বছর পেরিয়ে গেলেও শতভাগ সাক্ষরতার মাইফলক আজও ছুঁতে পারেনি বাংলাদেশ।

খোদ সরকারি হিসাবই বলছে, এখনও দেশের প্রায় পৌনে তিন কোটি মানুষ অক্ষরজ্ঞানহীন। যাদের বয়স ৭ বছরের বেশি। বিপুল এ জনগোষ্ঠীকে স্বাক্ষর জ্ঞান দিতে আপাতত কোনো উদ্যোগ নেই সরকারেরও। এ অবস্থায় দেশ কবে শতভাগ সাক্ষরতা অর্জন করবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না কেউই। অন্যদিকে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে নিরক্ষরমুক্ত দেশ গড়তে চায় বাংলাদেশ। এছাড়া অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও সাক্ষরতা বিষয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু এসব লক্ষ্য অর্জনে দৃশমান কোনো কার্যক্রম নেই।

এ প্রসঙ্গে জানতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল মান্নান ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা যদি শতভাগ বিদ্যুতায়ন করতে পারি তাহলে শতভাগ নিরক্ষরমুক্ত করতে পারব না কেন? এখানে মূল সমস্যা হচ্ছে আমাদের ইচ্ছের। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিরক্ষরমুক্ত দেশ গঠনের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসেও সেই স্বপ্ন অধরা থেকে যাওয়া রাষ্ট্রের জন্য বিরাট ব্যর্থতা। এটা প্রশাসন, আমলাতন্ত্র ও বিভিন্ন সময়ে থাকা সরকারের ব্যর্থতা। কারণ আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া দরকার তা দেওয়া হয়নি। হয়ত এখন দিচ্ছে তবে তা পর্যাপ্ত নয়।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কম দেয় এটা বলব না তবে প্রাথমিক শিক্ষাকে যাদের হাতে দেওয়া হয়েছে তারা যেটাকে গুরুত্ব সহকারে দেয় বলে আমার মনে হয় না। এক সময় গ্রামের পর গ্রামে স্কুল না থাকার কারণে শিশুরা স্কুলে যেতে পারত না। এখন সেই অবস্থা নেই। প্রত্যন্ত চরাঞ্চলেও স্কুল হয়েছে। প্রশাসনের স্থানীয় লেভেল হলো ইউনিয়ন পরিষদ। তাদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল সব শিশুকে স্কুলে আনা নিশ্চিত করা। শিক্ষার্থীকে স্কুলে আনতে উদ্বুদ্ধ করার যে বিষয় আছে সেটাকে আমরা কখনো গুরুত্ব দেইনি। 
 
প্রবীণ এই শিক্ষাবিদ বলেন, পৃথিবীতে যেসব দেশ শিক্ষায় উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে যেসব দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষাকে। বিশ্বে শতভাগ শিক্ষার মডেল হিসেবে ধরা হয় দুটি দেশকে। দেশগুলো হলো- দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইডেন। এই দুই দেশে প্রাথমিক শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি বেতন পায়।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ার প্রধান কারণ হলো আমলাতন্ত্র। মন্ত্রী-এমপিরা নানা ব্যস্ততার কারণে সব কিছু খেয়াল রাখতে পারবেন না। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব হলো আমলাদের। এখন আমাদের দেশের আমলারা হয়ে গেছেন সর্বময় কর্তা। কিন্তু কাজের বেলা কিছুতেই নেই। দেশের সর্বনাশ সবসময় করেছে আমলাতন্ত্র। তবে দেশে আমলা থাকবে। আমলা ছাড়াতো দেশ চলবে না। কিন্তু এসব অকর্মা আমলা রেখে লাভ কী?

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আমিনুল ইসলাম খান বলেন, বয়স্কদের সাক্ষরতা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আমরা নতুন করে ভাবছি। দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহের অবকাঠামো ব্যবহার করে ব্যাপক পরিসরে এ কার্যক্রম চালানো যায় কি না এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে।

দেশে নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরজ্ঞান দেওয়ার কার্যক্রম সর্ম্পকে জানতে চাইলে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্বে) মু. নুরুজ্জামান শরীফ বলেন, সার্বিক সাক্ষরতা প্রকল্প দুই ভাগে বিভক্ত। ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের সাক্ষরতা প্রদানের প্রকল্প চলতি বছরের জুন মাসে শেষ হয়েছে। এখন আপাতত কোনো কার্যক্রম নেই। আর ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের জন্য একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২০-২৫) করার সময় দেশে বয়স্ক নিরক্ষর জনগোষ্ঠী ছিল ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৯০ হাজার। ২০২৫ সালের জুন মাসের মধ্যে এই সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরজ্ঞান দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু করোনা সংক্রমণের কারণে গত দুই বছর সাক্ষরজ্ঞান দেওয়ার কর্মসূচিতে তেমন গতি ছিল না। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো হিসাব করে দেখেছে, দেশে এখনো প্রায় পৌনে তিন কোটি মানুষ নিরক্ষর।
 
তিনি আরও বলেন, করোনার কারণে সাক্ষরতা কার্যক্রমে স্থবিরতা আসায় দেশে নিরক্ষর মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এখনই যদি যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তাহলে এ সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। আর এতে এসডিজির লক্ষ্য অর্জন এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। 

এমন বাস্তবতায় আগামীকাল ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হবে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হলো- ‘ট্রান্সফরমিং লিটারেসি লানিং স্পেস’ (সাক্ষরতা শিখন ক্ষেত্রের প্রসার)।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ১৯৪০ সালের দিকে পড়ালেখার দক্ষতাকে সাক্ষরতা বলে অভিহিত করা হতো। পরে ষাটের দশকে দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে সহজ হিসাব-নিকাশের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষই স্বাক্ষর মানুষ হিসেবে পরিগণিত হতো। আশির দশকে লেখাপড়া ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি সচেতনতা ও দৃশ্যমান বস্তুসামগ্রী পঠনের ক্ষমতা সাক্ষরতার দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃত হয়। বর্তমানে এ সাক্ষরতার সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা, ক্ষমতায়নের দক্ষতা, জীবন নির্বাহী দক্ষতা, প্রতিরক্ষায় দক্ষতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাও সংযোজিত হয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৯৭১ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ১৬ দশমিক ৮ ভাগ। ১৯৯১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ দশমিক ৩। অর্থাৎ বিগত ২০ বছরে সাক্ষরতার হার বেড়েছিল ১৮ দশমিক ২৩। আর ২০০১ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ বিগত ২০ বছরে সাক্ষরতার হার বেড়েছিল ১১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ২০০৮ সালে ৪৮ দশমিক ৮ ভাগ আর ২০০৯ সালের হিসাবে ৫৩ ভাগ। ২০০১ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সাক্ষরতার হার বেড়েছিল ৫ দশমিক ১ শতাংশ। ২০০৯ থেকে ২০২০ এই ১১ বছরে শিক্ষার হার বেড়েছে ২১ দশমিক ৭ শতাংশ।

তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জনশুমারী ও গৃহগননা ২০২২ এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ (৭ বছর ও তদূর্ধ্ব)। সেই হিসেবে নিরক্ষর ২৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ মানুষ। 

এসএএস/এএস