নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:১৫ পিএম
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ধারণাকে ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপ দিতে স্টার্টআপ ইনকিউবেটর প্রতিষ্ঠায় সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কৌশলগত অনুদান দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার, যৌথ গবেষণায় অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতেও কাজ করছে সংস্থাটি।
রোববার (৮ নভেম্বর) চট্টগ্রামের ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রামে (আইআইইউসি) তিন দিনব্যাপী ‘পঞ্চম ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন ইনোভেশনস ইন সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব উদ্যোগের কথা জানান ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা শুধু গবেষণাপত্র লেখা, পর্যালোচনা কিংবা প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। গবেষণার ফলাফল বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ধারণাকে ব্যবসায়িক উদ্যোগে পরিণত করার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান জানান, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্টার্টআপ ইনকিউবেটর গড়ে তুলতে কৌশলগত অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নতুন ধারণা বাস্তবায়ন, তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন প্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও পরামর্শসেবার জন্য এখনো অনেকাংশে বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। অথচ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক ও গবেষকদের মধ্যেই এসব সমস্যার দেশীয় সমাধান উদ্ভাবনের সক্ষমতা রয়েছে।
এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের সরবরাহব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার, তৈরি পোশাক কারখানায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর মতো ক্ষেত্রগুলোর উদাহরণ দেন তিনি।

ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে গবেষকদেরও গবেষণাগারের বাইরে গিয়ে শিল্পকারখানার বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী প্রযুক্তিগত সমাধান উদ্ভাবন করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সরাসরি উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখতে পারবে।
এ জন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত ব্যবহারিক গবেষণায় অর্থায়ন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার ও বৈশ্বিক গবেষণা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশের উন্নত গবেষণা, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে তা ব্যবহারের সুযোগ তৈরিতে প্রযুক্তি হস্তান্তর কার্যালয় বা টেকনোলজি ট্রান্সফার অফিস (টিটিও) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব কার্যালয়ের মাধ্যমে গবেষণালব্ধ প্রযুক্তির পেটেন্ট গ্রহণ, মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
গবেষণার সাফল্য মূল্যায়নের প্রচলিত পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, গবেষণার মান শুধু প্রকাশিত গবেষণাপত্র কিংবা উদ্ধৃতির সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কার্যকর নমুনা প্রযুক্তি বা প্রোটোটাইপ তৈরি এবং মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলোকেও মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।
দেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা এবং আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং জীবপ্রযুক্তির মতো সম্ভাবনাময় খাতে গবেষণা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় উদ্ভাবন নীতির দিকনির্দেশনা অনুসরণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন।
আইআইইউসির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী আজাদীর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাসমত আলী, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, নেপালের কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সুদান ঝা এবং মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি সেইন্স ইসলাম মালয়েশিয়ার ড. আজনি হাসিলিজান বিনতে আবি হালিম।
এ ছাড়াও বক্তব্য দেন আইইইই বাংলাদেশ সেকশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. এম ইমামুল হাসান ভূঁইয়া, আইআইইউসির অধ্যাপক ড. ইঞ্জিনিয়ার মো. রাজু আহমেদ, অধ্যাপক ড. শিকদার সানবিম ইসলাম এবং অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামসুল আলম।
তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলনে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নিচ্ছেন। সম্মেলনের আয়োজক কমিটির শিক্ষক ও কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
এমএইচ/এফএ