নিজস্ব প্রতিবেদক
০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত দুই বছরে এসব এলাকার ৯৬ শতাংশ শিশু অন্তত একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। দুর্যোগ কিংবা তাপপ্রবাহের পর অসুস্থ হয়েছে ৮০ শতাংশ শিশু। আর গত এক বছরে দুর্যোগ বা প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বিদ্যালয়ে পড়ুয়া ৪৯ শতাংশ শিশুর স্কুলে যাওয়া বন্ধ ছিল। নিরাপদ পানীয় জল পেতেও সমস্যায় পড়েছে অর্ধেকের বেশি শিশু।
আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার বিষয়ক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের সহায়তায় পরিচালিত শিশু-নেতৃত্বাধীন এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১ সামনে রেখে প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জরিপের ফলাফল তুলে ধরে সংস্থাটি।
জরিপটি পরিচালনা করেছে ন্যাশনাল চিলড্রেন’স টাস্ক ফোর্স (এনসিটিএফ)। গত ৯ থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত সংগঠনটির ১৭২ জন শিশু গবেষক দেশের ৩৮টি জেলার ১০৪টি উপজেলার ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী এক হাজার ৩৭৫ শিশুর সাক্ষাৎকার নেয়। জরিপের আওতায় ছিল উপকূলীয় গ্রাম, নদীবেষ্টিত চর, হাওর, পার্বত্য অঞ্চল, চা-বাগান ও শহরের বস্তিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বিভিন্ন এলাকা।
জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ গত দুই বছরে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং ৪২ শতাংশ বন্যার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। দুর্যোগ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও পড়াশোনায়।
জরিপ অনুযায়ী, গত এক বছরে দুর্যোগ বা আবহাওয়াজনিত কারণে বিদ্যালয়ে পড়ুয়া ৪৯ শতাংশ শিশুর স্কুলে যাওয়া বন্ধ ছিল। অনুপস্থিতির হিসাব দেওয়া ৬১৭ শিশু সম্মিলিতভাবে সাত হাজার ৫৬৭ শিক্ষাদিবস হারিয়েছে। অথচ দুর্যোগের সময় কী করতে হবে, সেসব বিষয়ে বিদ্যালয় থেকে প্রশিক্ষণ বা নির্দেশনা পাওয়ার কথা জানিয়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশ শিশু।
শুধু শিক্ষা নয়, দুর্যোগের পর শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৮০ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, দুর্যোগ বা তাপপ্রবাহের পর তারা অসুস্থ হয়েছে। অন্যদিকে ৫৩ শতাংশ শিশু নিরাপদ পানীয় জল সংগ্রহ করতে সমস্যায় পড়েছে।
দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা শিশুদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি পাওয়া গেছে। সর্বশেষ দুর্যোগের আগে মাত্র ২৫ শতাংশ শিশু আগাম সতর্কবার্তা পেয়েছে এবং তা বুঝতে পেরেছে। বিপরীতে ৪৮ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, তারা কোনো সতর্কবার্তাই পায়নি।
জরিপে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। অংশ নেওয়া ৩৭ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, দুর্যোগের পর তাদের এলাকায় বাল্যবিবাহ বেড়েছে। উপকূলীয় এলাকার শিশুদের মধ্যে এ ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে ৭২ শতাংশ। তবে এগুলো শিশুদের নিজ নিজ এলাকার পর্যবেক্ষণ, বাল্যবিবাহ বৃদ্ধির পরিমাপ করা হার নয়।
এ ছাড়া দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবহার করা ৫৬১ শিশুর মধ্যে ৬৩ শতাংশ জানিয়েছে, সেখানে মেয়েদের জন্য আলাদা শৌচাগার কিংবা নিরাপদ জায়গার ব্যবস্থা ছিল না।
জলবায়ু পরিবর্তন শিশুদের মানসিক অবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলছে। জরিপে ৬৪ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কথা ভাবলে তাদের ভয় লাগে। বিপরীতে মাত্র চার শতাংশ শিশু ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী।
জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনায় শিশুদের মতামত নেওয়ার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৮১ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, বিদ্যালয় কিংবা স্থানীয় সরকার কখনো দুর্যোগ পরিকল্পনা নিয়ে তাদের মতামত জানতে চায়নি। অথচ সমানসংখ্যক শিশু নিজেরা জলবায়ু কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অর্থায়নের দাবি জানিয়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সব শিশুর ওপর সমানভাবে পড়ছে না। নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার ৮৩ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, দুর্যোগের পর তাদের পরিবারের আয় কমেছে। অন্যদিকে প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এ ধরনের ঝুঁকির হার প্রতিবন্ধী শিশুদের ক্ষেত্রে ৫৪ শতাংশ, যেখানে তুলনামূলক হিসাবে সব শিশুর ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ।
কপ-৩১ এ শিশুদের সুরক্ষা ও অর্থায়নের দাবি
আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনাতোলিয়ায় অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১ সামনে রেখে শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মতামতকে জলবায়ু আলোচনার কেন্দ্রে রাখার আহ্বান জানিয়েছে সেভ দ্য চিলড্রেন।
সংস্থাটি বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শিশুদের জন্য পৃথক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অভিযোজন কার্যক্রমে শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, জলবায়ু-সহনশীল বিদ্যালয় নির্মাণ এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের জন্য সরাসরি অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
সেভ দ্য চিলড্রেনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রধান বহুপক্ষীয় জলবায়ু তহবিলের মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থায়ন শিশু-সংবেদনশীল উদ্যোগে সহায়তা করেছে। এ ধরনের অর্থায়ন অন্তত দ্বিগুণ করার পাশাপাশি শিশু ও তরুণদের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগের জন্য বিশেষ অর্থায়নের সুযোগ তৈরির দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ সরকারের প্রতিও বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তীব্র তাপপ্রবাহকে দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, জলবায়ু-সহনশীল বিদ্যালয় গড়ে তোলা, দুর্যোগের পর শিশুদের স্বাস্থ্য ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ।
পাশাপাশি দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা শিশুদের বোধগম্য করে পৌঁছে দেওয়া, আশ্রয়কেন্দ্রে মেয়েদের জন্য আলাদা শৌচাগার ও নিরাপদ স্থান নিশ্চিত করা এবং বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুসন্তান রয়েছে এমন পরিবারগুলোকে সাত দিনের মধ্যে নগদ অর্থ বা খাদ্যসহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও চেয়েছে সংস্থাটি।
সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সুমন সেনগুপ্ত বলেন, বাংলাদেশের শিশুরা এই সংকট সৃষ্টির জন্য কোনোভাবেই দায়ী নয়, অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি ভুগছে। জরিপে তাদের সুনির্দিষ্ট চাহিদাগুলো উঠে এসেছে; এসব চাহিদা ও সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, গত দুই বছরে জরিপে অংশ নেওয়া ৯৬ শতাংশ শিশুর অন্তত একটি দুর্যোগের অভিজ্ঞতা হওয়াই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
সুমন সেনগুপ্ত বলেন, কপ-৩১ এমন একটি মঞ্চ, যেখানে জাতীয় বাস্তবতাগুলো বিবেচনায় নিয়ে শিশুদের চাহিদাকে বৈশ্বিক অঙ্গীকারের অংশ করতে হবে। জলবায়ু ও অর্থায়ন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের সুফল যেন কার্যকরভাবে শিশুদের কাছে পৌঁছায়, সেটি নিশ্চিত করা আবশ্যক।
এদিকে শিশুদের অগ্রাধিকার সরকারি পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করার কথা জানিয়েছে সেভ দ্য চিলড্রেন। সংস্থাটির সহায়তায় পরিচালিত ‘ক্লাইমেট স্মার্ট এডুকেশন সিস্টেমস ইনিশিয়েটিভ’ এর আওতায় ২২টির বেশি মন্ত্রণালয় ও সংস্থা জলবায়ু ও শিক্ষা নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা করছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, জরিপে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা এলাকার শিশুদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। ফলে এসব পরিসংখ্যানকে বাংলাদেশের সব শিশুর সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
এমএইচ/এফএ