বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
২০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৬ এএম
বিশ্বের ৩৭টি দেশের কয়েকশত দলকে পেছনে ফেলে জাতিসংঘের গ্লোবাল এআই হ্যাকাথনে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশের দল ‘zAI BD’। প্রতিযোগিতার লক্ষ্য ছিল এমন ওপেন-সোর্স এআই প্রযুক্তি তৈরি করা, যা বিভিন্ন দেশের ডিজিটাল বাণিজ্যবিষয়ক আইন ও বিধিমালা বিশ্লেষণ করে জাতিসংঘের ‘রিজিওনাল ডিজিটাল ট্রেড ইন্টিগ্রেশন ইনডেক্স’ (আরডিটিআইআই) তৈরির কাজে সহায়তা করবে।
‘ইউনাইটেড নেশনস গ্লোবাল হ্যাকাথন ২০২৬: ইউজিং এআই ফর ডিজিটাল ট্রেড রেগুলেটরি অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক এই প্রতিযোগিতার আয়োজক ইউনাইটেড নেশনস ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে জাতিসংঘ সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত গ্র্যান্ড ফাইনালে আন্তর্জাতিক বিচারকমণ্ডলী দলটিকে বিজয়ী ঘোষণা করেন।
পাঁচ মাস ধরে চলা কয়েক ধাপের বাছাই শেষে চূড়ান্ত পর্বে ওঠে ইউএসএ, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের পাঁচটি দল। গত আগস্টে বাংলাদেশের দলটি সেরা পাঁচে জায়গা করে নেয়। ফাইনালের দিন সকালে প্রতিটি দলকে আগে থেকে না জানানো একটি দেশ ও বিষয়ের ওপর সরাসরি ‘লাইভ স্ট্রেস টেস্ট’ দিতে হয়। এরপর বিচারকরা নিজেরা প্রতিটি দলের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেখেন। বিকেলে মঞ্চে উপস্থাপনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়।
দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিডিরেনের ব্যবস্থাপক (ইনোভেশন) ও এআই প্রকৌশলী আবু নাছের মুহা. নাফিউ। দলের অন্য সদস্যরা হলেন– বিডিরেনের সিনিয়র ডেভেলপার ও এআই প্রকৌশলী পুনম চৌধুরী, বিডিরেনের এআই প্রকৌশলী মো. সানিউল বাসির সাজ এবং আইনি পর্যালোচক মো. ইনসাফুল রহমান তুষার।
দলটির তৈরি প্ল্যাটফর্মের নাম ‘ক্লজচেইন’। এটি বিভিন্ন দেশের সরকারি পোর্টাল ও গেজেট থেকে আইন সংগ্রহ ও স্ক্যান করে নথি পড়ে নেয় এবং আইনকে ধারা-উপধারা ধরে সাজায়। এরপর এআই প্রতিটি ধারাকে আরডিটিআইআই সূচকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। ক্লজচেইনের মূল বিশেষত্ব এর নির্ভুলতা যাচাই। এআইয়ের দেওয়া প্রতিটি উদ্ধৃতি সরকারি মূল নথির সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে দেখা হয়। আইনটি বর্তমানে কার্যকর কি না এবং উৎসটি সরকারি কি না, তাও যাচাই করা হয়। নয়টি স্বয়ংক্রিয় যাচাই-ধাপের যেকোনোটিতে ব্যর্থ হলে তথ্যটি বাদ পড়ে। প্রতিটি তথ্যের পাশে মূল আইনের পাতায় সংশ্লিষ্ট অংশটি একবারে চিহ্নিত করে দেখানো হয়। ফলে একজন নীতিনির্ধারক নিজেই মিলিয়ে নিতে পারেন। বর্তমানে প্ল্যাটফর্মটি ১১টি দেশের আইন বিশ্লেষণ করতে পারে: অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও পূর্ব তিমুর। এ জন্য ১ হাজার ৪৯টি সরকারি উৎস থেকে ৭৪৬টি আইন ও বিধিমালা সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো থেকে ১ লাখ ৫৪ হাজারের বেশি আইনি ধারা প্রক্রিয়াজাত হয়েছে। থাই, লাও, রুশ, মঙ্গোলীয়, চীনা, ইন্দোনেশীয় ও পর্তুগিজ ভাষার আইন মূল ভাষাতেই উদ্ধৃত হয়, পাশে থাকে ইংরেজি অনুবাদ। প্ল্যাটফর্মটি সম্পূর্ণ ওপেন-সোর্স।
দলটির এ সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন নেটওয়ার্ক (বিডিরেন)। বিডিরেন তাদের ডেটা সেন্টারে স্থাপিত এনভিডিয়া ডিজিএক্স স্পার্ক সুপারকম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ দেয়। এই সার্ভারেই দলটি নিজস্বভাবে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল, টেক্সট-বিশ্লেষণ মডেল ও ওসিআর চালিয়েছে। ফলে বিদেশি বাণিজ্যিক এআই সেবার ওপর নির্ভর না করে, কোনো এপিআই খরচ ছাড়াই, দেশের অবকাঠামোতে বসে পুরো বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিযোগিতার মূল্যায়নে এই সক্ষমতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। একই সাথে দলটি গবেষণা তত্ত্বাবধানের জন্য যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নওশিন আমিন শেখের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে।
জাতিসংঘের এই বৈশ্বিক উদ্যোগে অংশীদার হিসেবে সহযোগী ছিল থাইল্যান্ডের কিং মংকুটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, ইউএনসিটিএডি, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও), বিশ্বব্যাংক, সিএমকেএল ইউনিভার্সিটি, সিঙ্গাপুর ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটি এবং ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়। বিজয়ী এই প্ল্যাটফর্মের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে আয়োজক সংস্থাও। ইউএনএসকাপের ট্রেড পলিসি অ্যান্ড ফ্যাসিলিটেশন সেকশন ক্লজচেইনকে আরও উন্নত করে একটি পূর্ণাঙ্গ পণ্য হিসেবে ব্যবহারের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
দলনেতা আবু নাছের মুহা. নাফিউ বলেন, আমাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যার প্রতিটি তথ্য মূল সরকারি নথি পর্যন্ত যাচাই করা যায়। বিডিরেনের ডেটা সেন্টারের ডিজিএক্স স্পার্ক আমাদের দেখিয়েছে, বাংলাদেশের নিজস্ব অবকাঠামোতেই বিশ্বমানের এআই চালানো সম্ভব। এই অর্জন পুরো বাংলাদেশের।
কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নওশিন আমিন শেখ বলেন, জাতিসংঘ ও থাইল্যান্ডের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় KMITL-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা 'ইউনাইটেড নেশনস গ্লোবাল হ্যাকাথন ২০২৬: ইউজিং এআই ফর ডিজিটাল ট্রেড রেগুলেটরি অ্যানালাইসিস'-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী দল 'Team zAI BD' বিজয়ী হওয়ার গৌরব অর্জন করায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। এই গ্লোবাল হ্যাকাথনে জাতিসংঘের 'রিজিওনাল ডিজিটাল ট্রেড ইন্টিগ্রেশন ইনডেক্স' (আরডিটিআইআই) ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল বাণিজ্যের আইনি ও নীতিগত বিশ্লেষণ ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা ছিল মূল লক্ষ্য। বিশ্বের বহু দেশের মেধাবী টিমগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করে বাংলাদেশের মেধাবী তরুণেরা তাদের এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ প্রমাণ করেছে।
তিনি আরও বলেন, বিজয়ী দলের অন্যতম সদস্য মো. সানিউল বশির সাজ-এর একাডেমিক সুপারভাইজার হিসেবে তার এই বিশ্বমঞ্চের অর্জনে আমি দারুণ উচ্ছ্বসিত। সানিউল শুরু থেকেই গবেষণা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর প্রযুক্তিগত সমাধানে অত্যন্ত মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করে আসছে। একাডেমিক সুপারভাইজার হিসেবে আমরা তাকে প্রতিনিয়ত উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যেতে সর্বাত্মক অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করছি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করে সে এআই ও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও নতুন নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। আমি 'Team zAI BD'-এর সকল সদস্য এবং বিশেষ করে আমার শিক্ষার্থী মো. সানিউল বশির সাজ-এর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।
প্রতিনিধি/এলএ