নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম
পরনে সাদা জুব্বা, মাথায় সাদা পাগড়ি। শ্রেণিকক্ষে কোরআন-হাদিস ও ইসলামি শিক্ষার পাঠ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। আবার বিজ্ঞানাগারে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান নিয়ে চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কেউ কম্পিউটারে কাজ করছে, কেউ শিখছে গ্রাফিকস ডিজাইন, ভিডিও সম্পাদনা ও ডিজিটাল বিপণন। আবার কেউ নিচ্ছে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনার ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ।
রাজধানীর অদূরে তুষারধারায় জামিয়া কাশিফুল উলূম ঢাকায় দেখা যায় এমন চিত্র।
ধর্মীয় অনুশাসন, সুন্নাহর অনুসরণ ও আমল-আখলাকের চর্চার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনের এই উদ্যোগ কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় সমন্বিত শিক্ষার একটি দৃষ্টান্ত। এখানে দরসে নেজামির পাঠের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রম অনুসরণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবহারিক বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
কওমি মাদরাসার প্রচলিত শিক্ষাধারায় কোরআন-হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও ইসলামি জ্ঞানচর্চা প্রধান হলেও সাধারণ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার সুযোগ তৈরির উদ্যোগও রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। জামিয়া কাশিফুল উলুম ঢাকা ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে এসব ধারাকে যুক্ত করে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, নৈতিকতা ও দক্ষতার সমন্বয়ে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থীরা দরসে নেজামির পাঠের পাশাপাশি স্কুল বিভাগের বিজ্ঞান শাখায় পড়াশোনা করে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটির এসএসসি পরীক্ষার্থীরা সবাই উত্তীর্ণ হয়েছে। দিনের বেলায় মাদরাসার নিয়মিত পাঠদান এবং রাতে স্কুল ও কলেজ বিভাগের ক্লাস পরিচালনার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা একই প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার পাঠ্যক্রম অনুসরণের সুযোগ পাচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দেখা যায়, ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য রয়েছে বিজ্ঞানাগার ও কম্পিউটার ল্যাব। নিয়মিত পাঠ্যক্রমের বাইরে কম্পিউটার গ্রাফিকস ডিজাইন, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল বিপণন ও ভিডিও সম্পাদনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। লাইটিং ও ক্যামেরা পরিচালনার পাশাপাশি বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ব্যবহারিক শিক্ষারও ব্যবস্থা রয়েছে।
ভাষাশিক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ব্যবহারিক দক্ষতায়। আরবি ভাষা শিক্ষায় মাদানি নেসাব অনুসরণ করে পড়া, লেখা ও বলার অনুশীলন করানো হয়। পাশাপাশি রয়েছে আরবি কথোপকথনের চর্চা। ইংরেজিতে দক্ষতা বাড়াতে চালু করা হয়েছে ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ ক্লাব।
পাঠ্যবইয়ের বাইরেও শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশে রয়েছে নানা আয়োজন। তাদের উদ্যোগে বাংলা ও আরবি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করা হয়। রয়েছে চিত্রাঙ্কন ও ক্যালিগ্রাফি বিভাগ। শারীরিক সক্ষমতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবোধ তৈরিতে মার্শাল আর্টসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
প্রতিষ্ঠানটির দৈনন্দিন কার্যক্রমে ধর্মীয় অনুশীলন ও নৈতিক শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সুন্নাহর অনুসরণ, আমল-আখলাকের চর্চা এবং দাওয়াহভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় অনুশীলনের পাশাপাশি উন্নত চরিত্র গঠনে উৎসাহিত করা হয়।

সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরিতেও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহে এক দিন শিক্ষার্থীরা পথশিশুদের জন্য খাবার রান্না করে। ‘পথশিশুদের মক্তব’ কর্মসূচির মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের খাবার দেওয়ার পাশাপাশি ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষাও দেওয়া হয়। জাতীয় দিবস পালন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমেও অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা।
জামিয়া কাশিফুল উলূম ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক লেখক ও গবেষক মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ। কওমি মাদরাসার সিলেবাস ও পাঠ্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন তিনি। তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি প্রশিক্ষণ যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এই সমন্বিত শিক্ষাপদ্ধতিকে যুগোপযোগী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ বলেন, ‘একটি মুসলিম দেশের নতুন প্রজন্মকে কোরআন ও হাদিসের শিক্ষার পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আধুনিক মননচর্চায় দক্ষ করে গড়ে তোলা সময়ের দাবি। আমরা এমন শিক্ষার্থী তৈরি করতে চাই, যারা দীনের জ্ঞান ধারণের পাশাপাশি আধুনিক বিশ্ব সম্পর্কেও জানবে এবং দেশ ও সমাজের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। আমরা নতুন কিছু চালু করিনি; বরং ইসলামের সোনালি যুগের সমন্বিত শিক্ষাধারায় আবার ফিরে যেতে চাই।’
আনোয়ার আব্দুল্লাহ বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের শুধু সনদনির্ভর শিক্ষায় সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। তারা যেন জ্ঞান, চরিত্র ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ হয় এবং ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে একজন আদর্শ দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, সে বিষয়গুলো আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে। আমরা চাই, একজন আলেম হয়েও শিক্ষার্থীরা বিসিএস ক্যাডার, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানী হতে পারবে।’
জেবি