মাহফুজ উল্লাহ হিমু
১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৫ এএম
সরকারি চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। চূড়ান্ত সুপারিশের তালিকায়ও নাম এসেছে। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের পর এবার বুঝি স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। পরিবারে শুরু হয়েছে আনন্দের প্রস্তুতি। কিন্তু নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর সেই আনন্দই বদলে যায় হতাশায়। মেধাতালিকায় নাম থাকলেও গেজেট বা নিয়োগপত্রে জায়গা হয়নি অনেকের। কেউ মেধাক্রমে প্রথম হয়েও বাদ পড়েছেন, কারও চাকরি আটকে গেছে নিজের বসতভিটা না থাকায়। কেউ আবার অন্য সরকারি চাকরির সুযোগ ছেড়ে শিক্ষক হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত আন্দোলন, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ ও পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের পর তাদের অনেকেই নিয়োগ পেয়েছেন। অনিশ্চয়তার দিন পেরিয়ে এখন তাদের ঘরে ফিরেছে স্বস্তি ও আনন্দ।
সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ এবং ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডারে এমন ঘটনা ঘটেছে। দুই নিয়োগেই চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর বাদ পড়েছিলেন অনেকে। পরে নতুন প্রজ্ঞাপন ও নিয়োগপত্রে তাদের বড় একটি অংশের নাম আসে। তবে কেন প্রথমে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছিল, আর কীভাবে অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই সিদ্ধান্ত বদলে গেল—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও কাউকে বাদ দেওয়ার মানদণ্ড এবং সিদ্ধান্তের কারণ স্পষ্ট করা জরুরি। এতে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ কমবে।
নীলফামারীর কৃষক পরিবারের সন্তান মো. সোহেল রানা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারের ইতিহাস বিষয়ে মেধাক্রমে প্রথম হন। দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও পরিশ্রমের পর সরকারি কলেজের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। তার সাফল্যে খুশি ছিলেন পরিবারের সদস্যরাও। কিন্তু গত ৩০ সেপ্টেম্বর নিয়োগের গেজেট প্রকাশ হলে দেখা যায়, সেখানে তার নাম নেই।
মেধাতালিকায় প্রথম হয়েও নিয়োগের তালিকা থেকে বাদ পড়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি সোহেল। হতাশা প্রকাশ করে ফেসবুকে লেখেন, ‘ধন্যবাদ বাংলাদেশ, ৪৯তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম হয়েও আমাকে গ্যাজেট থেকে বঞ্চিত করার জন্য।’
তার এই পোস্ট ঘিরে শুরু হয় আলোচনা-সামালোচনা। গণমাধ্যমেও উঠে আসে মেধাতালিকায় প্রথম হয়েও নিয়োগ না পাওয়ার ঘটনা। পরে গত ৫ অক্টোবর রাতে বাদ পড়া আরও ৪০ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সেই তালিকায় নাম আসে সোহেলেরও। নিয়োগের পর গণমাধ্যমকে সোহেল বলেন, ‘আমার মায়ের দোয়া ও আপনারা (গণমাধ্যম) যদি সহযোগিতা না করতেন তাহলে আমার এই স্বপ্ন অসম্পূর্ণ হয়ে থাকতো।’
সোহেলের মতোই চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছিলেন ঝিনাইদহের মিশন আচার্য। তবে তার ঘটনা আরও অমানবিক। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হলেও নিজের স্থায়ী বসতভিটা না থাকায় আটকে যায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ।
ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকায় ভাড়া বাসায় মায়ের সঙ্গে থাকেন মিশন। ছোটবেলা থেকেই বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত তিনি। মা ময়না আচার্য অন্যের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করে ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছেন। সেই মিশন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেন। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতও হন।

কিন্তু তার সঙ্গে নির্বাচিত ১৮২ জনের মধ্যে ১৮০ জন নিয়োগপত্র পেলেও মিশনের নাম ছিল না। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় ও জেলা প্রশাসকের দফতরে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, স্থায়ী ঠিকানা যাচাইয়ের জটিলতায় তার নিয়োগ আটকে গেছে। জন্মের পর থেকে ঝিনাইদহে বসবাস করলেও নিজেদের কোনো বাড়ি নেই। ২০২২ সালে তার এক মামা দুই শতক জমি লিখে দিয়েছিলেন। চাকরি পেলে সেখানে ঘর তুলে বসবাসের পরিকল্পনা ছিল তার।
চাকরি পাওয়ার আশায় এত দিন পরিশ্রম করেও শেষ মুহূর্তে এমন পরিস্থিতিতে হতাশ হয়ে পড়েন মিশন। নিজের বসতভিটা না থাকাই চাকরি না পাওয়ার কারণ হওয়ায় ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে আলোচনা শুরু হয়।
রাশেদ খাঁনের হস্তক্ষেপে নিয়োগ পান সেই মিশন
মিশন আচার্যের নিয়োগ আটকে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর তার পাশে দাঁড়ান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন। গত ২ অক্টোবর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে মিশনের ছবি দিয়ে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে কথা বলেছেন।
ফেসবুক পোস্টে রাশেদ খাঁন লেখেন, ‘আমি একটু আগে শিক্ষামন্ত্রীর সাথে কথা বলেছি। বিষয়টি দ্রুতই সমাধান হবে এবং সে শিগগিরই নিয়োগ পাবে। চাকরি প্রত্যাশী ছোট ভাইটি আমার এলাকার হওয়ায় ঝিনাইদহ থেকে অনেকে আমাকে বিষয়টি জানিয়েছিল, তাদেরকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।’
এরপর ৪ অক্টোবর মিশনকে সঙ্গে নিয়ে সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন রাশেদ খাঁন। এর আগে মিশনের নিয়োগের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বরাবর একটি আধা-সরকারি পত্রও দেন তিনি। সাক্ষাৎকালে মিশনের নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন শিক্ষামন্ত্রী।
পরদিন ৫ অক্টোবর মিশনের নিয়োগপত্র প্রকাশ করা হয়। নিজের ফেসবুক পোস্টে বিষয়টি নিশ্চিত করেন রাশেদ খাঁন। পরে ৭ অক্টোবর ঝিনাইদহ পৌর শহরের কলাবাগান এলাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে মিশনের মা ময়না আচার্যের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন তিনি।
যে মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়িয়েছেন, সেই মায়ের হাতেই শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় ছেলের সরকারি চাকরির নিয়োগপত্র। দীর্ঘদিনের সংগ্রাম আর শেষ মুহূর্তের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পান মিশন।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে বাদ পড়াদের অপেক্ষা
মিশনের মতো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও নিয়োগপত্র পাননি আরও অনেকে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ভেরিফিকেশন এবং কাগজপত্রসংক্রান্ত জটিলতায় বিভিন্ন জেলায় আটকে যায় তাদের নিয়োগ। পরে এসব প্রার্থীর কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, কেউ আবার আন্দোলনে নামেন।
তাদের একজন পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার মো. জাহিদ হাসান। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এই তরুণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন। প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় মঠবাড়িয়া উপজেলায় নির্বাচিত ৮৩ জনের মধ্যে তার মেধাক্রম ছিল ৫৪তম।
চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার খবরে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয় জাহিদের পরিবারে। কিন্তু গত ২৪ সেপ্টেম্বর অন্যদের নিয়োগপত্র দেওয়া হলেও তার নাম ছিল না। পরে জানতে পারেন, পুলিশ ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ভেরিফিকেশনের কারণে তার নিয়োগ আটকে গেছে।
এমন খবরে ভেঙে পড়েন জাহিদ। হতাশ হয়ে পড়েন তার মা-বাবাও। গণমাধ্যমকে তিনি জানান, অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা শেষ করেছেন। চাকরি পাওয়ার আশায় ছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিয়োগ না হওয়ায় তার মা কান্না করেছেন, বাবাও স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। কেন তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটিও জানতে পারছিলেন না তিনি।
পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের ফেসবুক গ্রুপে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন জাহিদ। তার পাশে দাঁড়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি নিয়ে সংবাদও প্রকাশিত হয়। অবশেষে পুনরায় যাচাই-বাছাই শেষে গত ২৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নিয়োগের তালিকায় জায়গা পান তিনি।
একই উপজেলার সুমাইয়া আক্তারের অভিজ্ঞতাও অনেকটা এমন। গর্ভকালেও চাকরির প্রস্তুতি চালিয়ে গেছেন তিনি। পরে নবজাতক সন্তানকে রেখে নিয়োগ পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপে অংশ নেন। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হলেও প্রথমে নিয়োগপত্র পাননি। পরে ২৮ সেপ্টেম্বরের নতুন তালিকায় তার নাম আসে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিয়োগ পাওয়ায় স্বস্তি ফেরে তার পরিবারেও।
এদিকে ময়মনসিংহে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে বাদ পড়া প্রার্থীদের অপেক্ষা গড়ায় আন্দোলন পর্যন্ত। জেলায় সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন ২৫৯ জন। তাদের মধ্যে ১৮ জন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেননি। বাকি ২৪১ জনের মধ্যে প্রথম দুই দফায় নিয়োগপত্র দেওয়া হয় ২১৯ জনকে। আটকে যায় ২২ জনের নিয়োগ।
বাদ পড়াদের কয়েকজন অন্য সরকারি চাকরিতে সুপারিশ পেয়েও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার আশায় সেখানে যোগ দেননি। ফলে শেষ মুহূর্তে নিয়োগ আটকে যাওয়ায় আরও বিপাকে পড়েন তারা।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর নিয়োগের দাবিতে ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের সামনে কাফনের কাপড় নিয়ে অনশনে বসেন ২২ প্রার্থী। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে তাদের কর্মসূচি। শেষ পর্যন্ত মধ্যরাতে ২০ জনের নিয়োগপত্র প্রকাশ করা হয়। তবে দুজন তখনও নিয়োগ পাননি।
নিয়োগপত্র পাওয়ার পর ফুলপুর উপজেলার কাজী অনিক বলেন, ‘মধ্যরাতে ওয়েবসাইটে নিয়োগপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। নিয়োগপত্র পেয়ে আমরা খুশি। আজই যোগদান করব।’
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ২০ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। তাদের কাগজপত্র ও ভেরিফিকেশনসংক্রান্ত বিষয়গুলো পুনরায় যাচাই করা হয়েছে। তবে বাকি দুজনের নিয়োগের বিষয়ে তখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে বাদ পড়াদের এমন অভিজ্ঞতা শুধু ময়মনসিংহ বা পিরোজপুরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন জেলায় নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের অভিযোগ সামনে আসে। পরে তাদের অনেকের নিয়োগের জটিলতা নিরসন হলেও কেউ কেউ এখনো নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছেন।
বিসিএসেও বাদ পড়াদের নিয়োগ
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের মতো ৪৯তম বিশেষ বিসিএসেও চূড়ান্ত সুপারিশের পর নিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সরকারি কলেজে শিক্ষক নিয়োগের জন্য অনুষ্ঠিত এই বিসিএসে ৬৮৩টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন তিন লাখের বেশি প্রার্থী। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এক হাজার ২১৯ জন। পরে মৌখিক পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে ৬৬৮ জনকে সাময়িকভাবে মনোনীত করার তথ্য প্রকাশিত হয়।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত ৩০ সেপ্টেম্বর নিয়োগের প্রথম প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু সেখানে নিয়োগ পান ৬১১ জন। প্রাথমিক হিসাবে ৫৭ জন বাদ পড়েছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
বাদ পড়াদের মধ্যে বিষয়ভিত্তিক মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জনকারীও ছিলেন। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের হতাশা প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও কেন গেজেটে নাম আসেনি, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাননি।
এই প্রার্থীদের একজন গোপালগঞ্জের বুশরা জাহান ঐশী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে ইংরেজি বিষয়ে মেধাক্রমে ১৪তম হয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম গেজেটে তার আগের ও পরের মেধাক্রমের প্রার্থীদের নাম থাকলেও তার নাম ছিল না।
হতাশ হয়ে ফেসবুকে বুশরা লেখেন, ‘৪৯তম (বিশেষ) বিসিএসের গেজেট থেকে বঞ্চিত হলাম। ইংরেজিতে আমার মেধাক্রম ১৪তম। গেজেটে ১৩তম আছে, ১৫তমও আছে, কিন্তু ১৪ নেই।’
আরেক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আল্লাহ তাআলা সাক্ষী, আমি বা আমার পরিবারের কেউ রাজনীতি করি নাই কোনো দিন। সারাজীবন একনিষ্ঠভাবে লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী ছিলাম। তবু আমাকে কেন গেজেট বঞ্চিত করা হয়েছে, রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন রেখে গেলাম। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন, আল্লাহ আমার সহায়।’
তবে বুশরার অপেক্ষা দীর্ঘ হয়নি। গত ৫ অক্টোবর নতুন করে আরও ৪০ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলে সেখানে তার নামও আসে।
পরে গণমাধ্যমকে বুশরা জানান, গোপালগঞ্জের বাসিন্দা হওয়ার কারণে বাদ পড়েছেন বলে প্রথমে তার যে ধারণা হয়েছিল, সেটি ভুল ছিল। তার পরিচিত একই জেলার অন্য প্রার্থীরাও গেজেটভুক্ত হয়েছেন।
দ্রুত নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়ে বুশরা বলেন, ‘আমার দুইটা মাস, কেন দুইটা দিনও অপেক্ষা করতে হয়নি।’
এদিকে প্রথম প্রজ্ঞাপনে বাদ পড়াদের নিয়ে আলোচনা শুরু হলে গত ২ অক্টোবর সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর প্রকৃত সংখ্যা ৬৬৫। প্রয়োজনীয় সনদ জমা দিতে না পারায় তিনজনের বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে বিবেচনায় আসেনি। এ ছাড়া আটজন স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উপস্থিত হননি। ফলে নিয়োগের জন্য বিবেচনায় ছিলেন ৬৫৭ জন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, তাদের মধ্যে ৬১১ জনের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন ইতোমধ্যে জারি হয়েছে। বাকি ৪৬ জনের নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কারও প্রতি বৈষম্য করা হবে না বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
এরপর গত ৫ অক্টোবর রাতে আরও ৪০ জনকে নিয়োগ দিয়ে দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এতে দুই দফায় মোট ৬৫১ জনের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। নতুন প্রজ্ঞাপনে নিয়োগপ্রাপ্তদের আগামী ১২ অক্টোবরের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের নির্ধারিত কার্যালয়ে যোগ দিতে বলা হয়েছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী বিবেচনাধীন ৬৫৭ জনের মধ্যে অবশিষ্ট ছয়জনের নিয়োগের বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
নিয়োগে স্বচ্ছতা জরুরি, বলছেন শিক্ষাবিদ
চূড়ান্ত সুপারিশের পরও নিয়োগ আটকে যাওয়া এবং পরে অনেককে নিয়োগ দেওয়ার এসব ঘটনা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির অধ্যাপক ড. বি এম মাইনুল হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এটি আসলে নির্ভর করে কী কারণে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে, তার ওপর। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা প্রয়োজন। সরকার নিশ্চয়ই কোনো না কোনো মানদণ্ড বা নির্দিষ্ট ভিত্তির ওপর তাদের বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু সেই মানদণ্ডটি স্বচ্ছ হওয়া উচিত।’
নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ভেরিফিকেশনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নিয়োগের বিষয়টি এমন কিছু নয় যে সবকিছু গোপন রাখতে হবে। ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হলো কিংবা বাদ দেওয়া হলো, সেটি জানার অধিকার জনগণের রয়েছে।’
কোনো প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের কারণ স্পষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘বিষয়টি পরিষ্কার থাকা উচিত। কেন একজন প্রার্থী বাদ পড়লেন, সেটি স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন।’
তবে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে কাউকে বাদ দেওয়ার সুযোগ একেবারেই রাখা যাবে না, এমন অবস্থানের সঙ্গেও একমত নন তিনি। বলেন, ‘এখন যদি বলা হয়, ভেরিফিকেশন করে কাউকে বাদ দেওয়া যাবে না, তাহলে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়াটি রাখার প্রয়োজন কী? যেহেতু নিয়োগের একটি ধাপ হিসেবে ভেরিফিকেশন রয়েছে, সেহেতু নিশ্চয়ই এর মাধ্যমে কোনো বিষয় যাচাই করা হয় এবং প্রয়োজনে কাউকে বাদ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।’
অধ্যাপক মাইনুল হোসেন বলেন, ‘কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কোন কারণে এবং কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে কাউকে বাদ দেওয়া হচ্ছে? সেই বিষয়টি স্বচ্ছ হওয়া জরুরি। কেন একজন প্রার্থী বাদ পড়লেন, কী ধরনের যাচাইয়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, এসব বিষয় পরিষ্কার করতে হবে। ভেরিফিকেশন থাকা বা না থাকাই মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হচ্ছে, পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ হওয়া এবং সিদ্ধান্তের ভিত্তি স্পষ্ট থাকা।’
এমএইচ/জেবি