Dhaka Mail Logo

শিক্ষা

সব ধরনের ক্লাস থেকে অব্যাহতি ঢাবি অধ্যাপক তাসনিমকে

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫০ পিএম

নেকাব পরা এক ছাত্রীকে ‘মৌলবাদী’ ও ‘সন্ত্রাসী’ বলে কটাক্ষ করার অভিযোগ ওঠার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে সব ধরনের ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের পর বিভাগের জরুরি একাডেমিক কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বুধবার (৭ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১৫তম ব্যাচের (২০১৯-২০ সেশন) একটি ক্লাসে ওই ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তারা বিষয়টি বিভাগীয় চেয়ারম্যানকে জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে তার কোর্সগুলো থেকে অব্যাহতি দিয়ে সেগুলো অন্য শিক্ষকদের মধ্যে পুনর্বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেয় বিভাগ।

ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তাজিন আজিজ চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের একটি লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা হয়েছে। সভায় শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একটি রেজুলেশন নেওয়া হয়েছে। সেই রেজুলেশনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে বর্তমানে তার কোর্সগুলো থেকে পুনর্বণ্টন করা হয়েছে এবং কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। বিভাগীয় চেয়ারম্যান বা একাডেমিক কমিটির এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই।

অধ্যাপক তাজিন আজিজ চৌধুরী আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের বিষয়ে উপাচার্য, একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেট প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে। বিভাগ থেকে ঘটনাটি তাদের অবহিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হবে।

ক্লাসে যা ঘটেছিল

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মল্লিকার দাবি, বুধবার তাসনিম সিরাজ মাহবুবের একটি কোর্সের ক্লাস চলাকালে তিনি শিক্ষকের ডেস্কের বাঁ পাশে বসেছিলেন। কয়েকবার চোখাচোখি হওয়ার পর শিক্ষক তাকে সেখানে বসে থাকায় ‘আনকমফোর্টেবল’ ও ‘আনসেফ’ বোধ করছেন বলে জানান এবং অন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে গিয়ে বসতে বলেন।

মল্লিকা বলেন, শিক্ষক তাকে প্রশ্ন করেন, কেন তিনি এভাবে পোশাক পরেছেন, এটি কোন ফিকহে আছে এবং ইসলামের কোথায় এভাবে পোশাক পরার কথা বলা হয়েছে। এ সময় শিক্ষক নিজে হজ করে এসেছেন এবং হজের সময় মুখ খোলা রাখা যায়—এমন বক্তব্যও দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, শিক্ষক তাকে বারবার নিজের পোশাক ও নেকাব নিয়ে প্রশ্ন করায় তিনি একপর্যায়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে যান।

এর আগেও একই ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ করেন ওই শিক্ষার্থী। তার দাবি, আগের একটি ক্লাসে শিক্ষক তাকে এভাবে মুখ ঢেকে চললে নেকাব খুলে দেওয়া হবে বলেছিলেন।

মল্লিকা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভাগে পরিচয় শনাক্তকরণ নিয়ে কোনো সমস্যা না থাকলেও শিক্ষক তার নেকাব নিয়ে বারবার আপত্তি তুলেছেন। তিনি শিক্ষককে অফিস সময়ে দেখা করে পরিচয় নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

তার ভাষ্য, বিষয়টি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; নেকাব ও পর্দা নিয়ে শিক্ষকের আপত্তি ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে।

ইংরেজি বিভাগের ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাইসা মণি সুমি অভিযোগ করেন, ওই শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে ক্লাসে ইসলাম ও পর্দা নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তার দাবি, বুধবারের ক্লাসেও নেকাব পরা শিক্ষার্থীর পোশাক নিয়ে আলোচনা শুরু হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেন।

সুমি বলেন, তিনি শিক্ষককে জানান যে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী একটি নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণ করেন এবং সে অনুযায়ী পর্দা করেন। এ সময় শিক্ষক ক্ষুব্ধ হয়ে কোনো মাযহাব মানার প্রয়োজন নেই—এমন বক্তব্য দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সুমির দাবি, তিনি পোশাক নিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে সমর্থন করলে শিক্ষক তাকে প্রশ্ন করেন, তিনি কীভাবে ওই শিক্ষার্থীকে সমর্থন করতে পারেন।

একপর্যায়ে ওই শিক্ষার্থীকে ‘জঙ্গি’ এবং তিনি ‘বোমা মারতে পারেন’—এমন মন্তব্যও শিক্ষক করেছেন বলে অভিযোগ করেন সুমি।

তিনি বলেন, পোশাকের ধরন নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে শিক্ষক তাদের বিভিন্নভাবে প্রশ্ন করেন এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেখানোর চেষ্টা করেন বলে তার মনে হয়েছে। পরে শিক্ষকের বক্তব্যে অস্বস্তি বোধ করে কয়েকজন শিক্ষার্থী ক্লাস থেকে বের হয়ে যান।

সুমি আরও অভিযোগ করেন, শিক্ষক নিজেকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দাবি করে শিক্ষার্থীদের হুমকিও দিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বুধবার (৭ অক্টোবর) বলেন, বিভাগের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে একটি অভিযোগ মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব। আগামীকাল জরুরি একাডেমিক কমিটির সভায় এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’

এর পরদিন বিভাগের জরুরি একাডেমিক কমিটির সভায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে তার কোর্সগুলো থেকে পুনর্বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করার কথা জানিয়েছে বিভাগ।

এম/এআরএম