২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৭ এএম
# নতুন উপাচার্যকে লালকার্ড প্রদর্শন করলেন শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা
# প্রশ্ন উঠেছে, সায়েমে কেন এত ভরসা! শরীফুলে কি সমস্যা?
অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবিতে সর্বাত্নক শাটডাউন কর্মসূচিতে ষষ্ঠ দিনের মতো আজ রোববারও অচল রয়েছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। দিনের শুরুতেই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা।
গত শনিবারের মতো আজও তারা লালকার্ড প্রদর্শন করছেন নতুন উপাচর্য খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিকস, কম্পিউটার অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমের প্রতি। একইসঙ্গে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দেয়ালে রংতুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলছেন প্রতিবাদী গ্রাফিতি ও বৈষম্যবিরোধী নানা চিত্র।
ফলে গত ৫ দিনের মতো আজ রোববারও বন্ধ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব ধরনের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম। চলছে না প্রশাসনিক কার্যক্রমও। তবে শিক্ষকরা বলছেন, তারা অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ করেননি। শিক্ষার্থীরা না আসায় ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়া যাচ্ছে না।
শাটডাউন কর্মসূচির মুখে গত পাঁচদিন ধরে চুয়েট ক্যাম্পাসে যেতে পারেননি নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়া অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমও। একপর্যায়ে গত বৃহস্পতিবার তিনি অনলাইন ও ডাকযোগে নতুন উপাচার্যের যোগদানপত্র পাঠান।
এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আরও উত্তাল হয়ে উঠে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। এই নিয়োগকে সর্বাত্নকভাবে প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন শুরু করেছেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা। এর অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষক সমিতি ও অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন পূর্ণ কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছে।
এ ঘটনায় চট্টগ্রামের সচেতন মহল ও রাজনীতিকদের মাঝে প্রশ্ন উঠেছে, উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমে কেন এত ভরসা চুয়েট শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের। আর এ পদে অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমের কি সমস্যা?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে গত কয়েকদিনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও শাটডাউডন কর্মসূচির সাথে সম্পৃক্ত শিক্ষাথী ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা মেইলের। এর মধ্যে শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, নবনিযুক্ত উপাচার্যের ব্যক্তিগত বা একাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই। মূলত কোনো কারণ ছাড়াই অধ্যাপক সায়েমকে অপসারণের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেই তাদের এই আন্দোলন।
যন্ত্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফারহান হাসনাত আদিব ও শিক্ষার্থী অরিন্দম দেসহ অন্যান্যরা জানান, কোনো ধরনের দৃশ্যমান কারণ বা ব্যাখ্যা ছাড়াই গত ২১ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। যা সম্পুর্ণ বৈষম্য।
স্বল্প সময়ের দায়িত্বে অধ্যাপক সায়েম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন, তার ধারাবাহিকতা রক্ষার্থেই তাকে পুনর্বহাল করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই আন্দোলনকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় দ্বন্দ্বের সঙ্গে না জড়ানোর জোর দাবি জানান তারা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শাটডাউন, গণ-অবস্থান ও প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, উনি (শরীফুল) আমার স্টুডেন্ট ছিলেন। আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। তবে আমি এখানে শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিসেবে একটি ফোরামের প্রতিনিধিত্ব করছি। আমি ফোরামের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারি না।
সূত্র মতে, গত ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। কিন্তু গত ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে পরিবর্তন করে কুয়েটের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এই প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে চুয়েট ক্যাম্পাস। গত মঙ্গলবার থেকে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা। সর্বশেষ রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেও ক্যাম্পাসের শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
সরকারের প্রতি দাবি মেনে নিয়ে ক্যাম্পাস সচল করার অনুরোধ করে খোলা চিঠিতে শান্তির বার্তা লিখে পায়রা উড়িয়ে দেন তারা। এর আগে মানববন্ধন ও মশাল মিছিলের কর্মসূচিও পালন করেছেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত না হয়ে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত সর্বাত্নক শাটডাউন চালিয়ে যাবার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকেও মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধনে সংহতি জানানো হয়েছে। সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পর গত মঙ্গলবার রাতে খুলনা থেকে চট্টগ্রামে আসেন অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। বৃহস্পতিবার দুপুরে মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, আমি ইচ্ছে করলে যে কোনোভাবে জয়েন করতে পারি। কিন্তু জয়েন করাটা তো বড় বিষয় না। আমি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।
সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টি দেখছে বলেও জানান তিনি। আন্দোলনের স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলেও জানান তিনি। আর এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার তিনি ক্যাম্পাসে সশরীরে উপস্থিত না হয়ে রাষ্ট্রপতি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লিখিত যোগদানপত্র পাঠান। পরবর্তীতে অনলাইনে প্রশাসনিকভাবে তার এই যোগদান সম্পন্ন হওয়ার খবর জানাজানি হলে ক্যাম্পাসে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। এর প্রতিবাদে ওইদিন রাতে জুম প্ল্যাটফর্মে জরুরি সভা ডেকে সর্বাত্নক কর্মবিরতির ডাক দেয় চুয়েট শিক্ষক সমিতি।
অধ্যাপক মো. আহসানউল্লাহ আরও বলেন, অধ্যাপক সায়েমকে স্বপদে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত আবাসিক হল ও জরুরি পরিষেবা বাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড স্থগিত থাকবে। একই সঙ্গে সমিতির সদস্যদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্য প্রচারের তীব্র নিন্দা জানান তিনি।
শিক্ষকদের ধারাবাহিকতায় জরুরি সাধারণ সভা করে চুয়েট অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন এই আন্দোলন কর্মসূচিতে একাত্নতা ঘোষণা করে। সংগঠনের সভাপতি প্রকৌশলী সৈয়দ মোহাম্মদ ইকরাম এবং সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. মকবুল হোসেন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শিক্ষক সমিতির দাবির প্রতি একাত্নতা প্রকাশ করে অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনও কর্মবিরতি পালন করবে, তবে জরুরি সেবা কার্যক্রম এর আওতামুক্ত থাকবে।
এদিকে অনলাইন যোগদানকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন জোরদার করেছেন শিক্ষার্থীরাও। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আকরাম হোসেন সুজন বলেন, অনলাইনে ডাকযোগে উপাচার্য হিসেবে যোগদানপত্র পাঠানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার্থীরা এই নিয়োগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাবে।

যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাহিদুর রহমান ওসমানী বলেন, নতুন উপাচার্য নজিরবিহীনভাবে অনলাইনে যোগদান করেছেন। এছাড়া উনি গণমাধ্যমে যে কথা বলেছেন তা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই আমরা রেড কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শরীফুল আলম বলেন, বিক্ষোভে ৩০ থেকে ৩৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে ক্যাম্পাসের তালা খুলে দিয়ে তাকে সাদরে ক্যাম্পাসে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। শিক্ষক সমিতিতে সিনিয়র যারা আছেন তারা কেউ এ আন্দোলনের সঙ্গে একমত নন। জুনিয়র কিছু টিচার করছে।
তিনি বলেন, আমি শিক্ষক সমিতির সভাপতির সঙ্গে কথা বলেছি। ইলেকট্রিক্যালের ডিন অধ্যাপক দোলন, সায়েন্স ফ্যাকাল্টির অধ্যাপক আবু কাউছারের সঙ্গে কথা বলেছি। ক্লাস-পরীক্ষা যেন বন্ধ না থাকে সেটা বলেছি। কারণ এটার জবাবদিহি কিন্তু পরে শিক্ষকদেরই করতে হবে। নিরাপত্তা শাখাকে বলেছি ক্যাম্পাস যেন অনিরাপদ না থাকে।
অধ্যাপক শরীফুল আরও বলেন, আন্দোলন করার অধিকার তাদের আছে। তবে নেগোসিয়েশনের পথ খোলা না রেখে আন্দোলন কাম্য নয়। আমি কুয়েটের টিচার। এজন্য চুয়েটে আমার নিয়োগ তো অবৈধ হতে পারে না। চুয়েট দেশের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। আমি নিজেও চুয়েটের ছাত্র। সরকার আমাকে যোগ্য মনে করেছে বলেই নিয়োগ দিয়েছে। আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধন আছে বলেও মন্তব্য করেন অধ্যাপক শরীফুল। যা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খতিয়ে দেখছে।
চুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. কাজী দেলোয়ার হোসেন বলেন, উনি (শরীফুল) আমাকে কল করেছিলেন। ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে আমরা কী করতে পারি ! আমরা তো এটা বন্ধ করিনি। ছাত্রছাত্রীরা যদি ক্লাসে না আসে আমরা কী করতে পারি! আলোচনার একটা পথ তৈরি করতে হবে। সেটা তো আমি পারব না। যারা দায়িত্বে আছেন তারা পারবেন।
চুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল। তবে অনিরাপদ নয়। হোস্টেলগুলোর কার্যক্রম ঠিকঠাকভাবে চলছে। আমরা শিক্ষকরা তো ক্লাসে যাচ্ছি। গত বৃহস্পতিবার দুপুরেও পরীক্ষার হলে শিক্ষকরা গেছেন। কিন্তু স্টুডেন্টরা বলছেন দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা ক্লাসে ফিরবেন না।
এআরএম