Dhaka Mail Logo

শিক্ষা

৫০০ টাকার টিউশন থেকে অনলাইনভিত্তিক শিক্ষার উদ্যোক্তা ইবির নোমান

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৯ পিএম

করোনাভাইরাস মহামারি যখন গোটা বিশ্বকে থমকে দিয়েছিল, তখন অনেকের জীবনে নেমে এসেছিল অনিশ্চয়তা ও সংকট। তবে সেই সংকটই কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল নোমানের জীবনে হয়ে ওঠে নতুন সম্ভাবনার দরজা। টিউশন বন্ধ হয়ে শিক্ষাব্যয় নিয়ে যখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটছিল, তখন অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেন তিনি। সেই উদ্যোগের নাম ‘তাদিলুল উম্মাহ একাডেমি’।

২০২১ সালের শুরুর দিকে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দেশের বাইরে বসবাসরত প্রবাসীদের সন্তানদের কোরআন, আরবি, বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা দিচ্ছে। শুরুতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাড়া কম থাকলেও নিরলস প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে পরিধি বাড়তে থাকে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। নোমানসহ সাতজন শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং একজন আইটি সাপোর্টার প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। উদ্যোক্তার দাবি, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মাসিক আয় দেড় লাখ টাকারও বেশি।

আব্দুল্লাহ আল নোমান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায়। তবে এই অবস্থানে পৌঁছানোর পথটি তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না।

২০১৫ সালে পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে তার পড়াশোনা প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তার বাবা মসজিদে ইমামতি করলেও সেই আয় দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন ছিল। একপর্যায়ে পরিবার থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, আর পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব নয়। তখন মাত্র ৫০০ টাকা মাসিক বেতনে টিউশন শুরু করেন নোমান। 

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তাদিলুল উম্মাহ একাডেমির উদ্যোক্তা আব্দুল্লাহ আল নোমান
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তাদিলুল উম্মাহ একাডেমির উদ্যোক্তা আব্দুল্লাহ আল নোমান

নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে শিক্ষাব্যয় চালাতে থাকেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে ২০১৯ সালে ঋণ করে তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসায় ভর্তি হন তিনি। পড়াশোনা, টিউশনি এবং আর্থিক সংকট- সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করেই এগিয়ে চলেন। এরপর করোনা মহামারির সময় যখন টিউশন বন্ধ হয়ে যায়, তখন নতুন কিছু করার চিন্তা থেকে অনলাইন শিক্ষার উদ্যোগ নেন।

প্রথম দিকে খুব বেশি শিক্ষার্থী না পেলেও থেমে থাকেননি নোমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, পরিচিতদের মাধ্যমে যোগাযোগ এবং শিক্ষার মান ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে তার উদ্যোগে দৃশ্যমান সাফল্য আসতে শুরু করে। একে একে যুক্ত হতে থাকেন প্রবাসী পরিবারের সন্তানরা।

নোমান বলেন, ‘একসময় মনে হয়েছিল পড়াশোনা হয়ত আর চালিয়ে যেতে পারব না। ৫০০ টাকা দিয়ে টিউশন শুরু করেছিলাম। করোনা আমার টিউশন বন্ধ করে দিলেও সেই সময়টিই আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। অনলাইন শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে কিছু করার চেষ্টা করি। শুরুতে সাড়া কম ছিল, কিন্তু হাল ছাড়িনি। ধীরে ধীরে অভিভাবকদের আস্থা তৈরি হয়েছে।’

আরও পড়ুন: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫ শিক্ষকের নিয়োগ

তিনি আরও বলেন, ‘আমার লক্ষ্য শুধু নিজের আয় করা নয়। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আরও মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই। বিশেষ করে যারা পড়াশোনা শেষ করেও কাজ পাচ্ছে না, তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে চাই।’

ইতালি থেকে শিক্ষার্থী শাফিন বলেন, ‘নোমানের উদ্যোগ প্রবাসী পরিবারের সন্তানদের জন্য অনলাইন শিক্ষার এই ব্যবস্থা তাদের পড়াশোনায়ও নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।’

শিক্ষার্থীদের একজন আয়ান বলেন, ‘অনলাইনে ক্লাস হওয়ায় বাসায় থেকেই নিয়মিত পড়তে পারি। শিক্ষকরা বুঝিয়ে পড়ান এবং কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে আবার বুঝিয়ে দেন। কোরআনের পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজিও শেখানো হয়।’

আরেক শিক্ষার্থী জান্নাতুল বাকি জানান, আগে নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ পাওয়া কঠিন ছিল। এখানে ক্লাসের সময় নির্দিষ্ট থাকে। শিক্ষকরা পড়া নেওয়ার পাশাপাশি ভুলগুলোও ঠিক করে দেন। ফলে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে।

অভিভাবকদের আস্থার জায়গা

প্রবাসে বসবাসরত এক অভিভাবক বলেন, ‘বিদেশে থাকার কারণে সন্তানকে নিয়মিত বাংলা ও কুরআন শেখানোর সুযোগ তৈরি করা আমাদের জন্য কঠিন ছিল। তাদিলুল উম্মাহ একাডেমির মাধ্যমে সে নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারছে। শিক্ষকরা সন্তানের পড়াশোনার বিষয়ে অভিভাবকদেরও নিয়মিত অবহিত করেন- এটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’

আরেক অভিভাবক সোনিয়া ইসলাম বলেন, ‘অনলাইনে অনেক ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম থাকলেও সন্তানের জন্য উপযুক্ত শিক্ষক ও নিয়মিত ক্লাস পাওয়া সহজ নয়। এখানে শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় এবং সন্তানের অগ্রগতিও জানা যায়। এ কারণে আমরা আস্থা পেয়েছি।’

শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা প্রতিষ্ঠানটির একজন শিক্ষক রাকিব হাসান বলেন, ‘নোমান নিজে একজন শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষা কার্যক্রমকে পেশাগতভাবে পরিচালনার চেষ্টা করছে। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী ক্লাস নেওয়া, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো সমন্বয় করা- সবকিছুতেই সে গুরুত্ব দেয়।’

আরেক শিক্ষক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রবাসী শিক্ষার্থীদের পড়ানোর ক্ষেত্রে সময়ের পার্থক্যসহ নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তারপরও সমন্বিতভাবে কাজ করায় কার্যক্রমটি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।’

সরকারের সহযোগিতা চান তাদিলুল উম্মাহ একাডেমির উদ্যোক্তা আব্দুল্লাহ আল নোমানের। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি জানাস, দেশের তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ থাকলেও অর্থ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে অনেকেই এগিয়ে যেতে পারেন না। তাই সরকারের কাছে তার কয়েকটি দাবি রয়েছে।

নোমান বলেন, ‘সরকার যদি ক্ষুদ্র ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির ব্যবস্থা করে, তাহলে আমাদের মতো অনেক তরুণ আরও বড় পরিসরে কাজ করতে পারবে। অনলাইন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি কার্যকর সহায়তা কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শুধু নিজেদের জন্য কাজ করছি না। আমাদের সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষক ও আইটি সাপোর্টার কাজ করছেন। প্রতিষ্ঠানটি বড় হলে আরও অনেক তরুণের কর্মসংস্থান হবে। সরকার যদি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও সহজ অর্থায়নের সুযোগ দেয়, তাহলে আমরা দেশের বাইরের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দেশের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদেরও আরও বড় পরিসরে শিক্ষা দিতে পারব।’

স্বপ্ন আরও বড়

নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নোমান বলেন, ‘আমি একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তরুণদের কর্মসংস্থান হবে এবং শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা পাবে। পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডের পরিধিও বাড়াতে চাই।’

তরুণদের উদ্দেশ্যে তার পরামর্শ, ‘কোনো পরিস্থিতিকে জীবনের শেষ মনে করা যাবে না। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই কোনো না কোনো সম্ভাবনা আছে। নিজের সামর্থ্যকে চিহ্নিত করে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। সুযোগ না থাকলে নতুন সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করতে হবে। পরিশ্রম ও ধৈর্য ধরে এগিয়ে গেলে সফলতা আসবেই, ইনশাআল্লাহ।’

করোনার সংকটে যখন থমকে গিয়েছিল তার আয়ের পথ, সেই সময়কেই নতুন সম্ভাবনায় রূপ দিয়েছেন নোমান। একটি ফেসবুক পেজ থেকে শুরু হওয়া উদ্যোগ এখন কয়েকজন শিক্ষকের কর্মসংস্থান এবং অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীর শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর গল্প তাই শুধু একজন তরুণের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নয়; বরং সংকটকে কাজে লাগিয়ে নতুন কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগ তৈরিরও একটি উদাহরণ।

প্রতিনিধি/এএম