Dhaka Mail Logo

শিক্ষা

শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করল কওমি মাদরাসা

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০০ পিএম

কওমি মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে সর্বোচ্চ অথরিইট আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দেশের ছয়টি কওমি মাদরাসা বোর্ড ও তাদের অধিভুক্ত সব মাদরাসায় অবিলম্বে ছাত্র-ছাত্রী সুরক্ষা কমিটি গঠন ও কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসানের নির্দেশে জারি করা এক নির্দেশনায় এসব সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কওমি মাদরাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতন এবং কিছু ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ ও অভিযোগ প্রকাশের প্রেক্ষাপটে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের শাসনের উদ্দেশ্য হবে সংশোধন ও কল্যাণ নিশ্চিত করা; প্রতিশোধ নেওয়া নয়। কোনো শিক্ষক বা শিক্ষিকা রাগের অবস্থায় শিক্ষার্থীকে শাস্তি দিতে পারবেন না। শাসনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে নম্র সতর্কতা, প্রয়োজন হলে মৃদু ভর্ৎসনা ও সতর্ক করার পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সর্বশেষ পর্যায়ে অভিভাবককে ডেকে লিখিতভাবে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে কোনো অবস্থাতেই শাস্তি হিসেবে শিক্ষার্থীকে প্রহার করা যাবে না। লাঠি, বেত বা অন্য কোনো যন্ত্র দিয়ে আঘাত করা, মুখমণ্ডল, মাথা বা স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত করা এবং হাড় ভাঙা, রক্তপাত বা শরীরে দাগ সৃষ্টি হতে পারে—এমন যেকোনো শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রকাশ্যে অপমান, গালমন্দ, কটু ভাষা ব্যবহার, ঘৃণাসূচক নামে ডাকা এবং যেকোনো ধরনের মানসিক নির্যাতন থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা লঙ্ঘনকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে শরিয়ত ও প্রচলিত আইন—উভয় দৃষ্টিতে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে বলে জানানো হয়েছে।

প্রতিটি মাদরাসায় ছাত্র-ছাত্রী সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে তা সক্রিয় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অসদাচরণ, নির্যাতন বা হয়রানির অভিযোগ এই কমিটির কাছে জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

অভিযোগ পাওয়ার পর সাত দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দিতে হবে। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কোনো মাদরাসায় সুরক্ষা কমিটি না থাকা, নিষ্ক্রিয় থাকা কিংবা অভিযোগ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট মাদরাসার ইলহাক স্থগিত বা বাতিলের কারণ হিসেবে বিবেচিত হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের শাসনের সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি প্রতিটি মাদরাসায় শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত ইসলাহি মজলিস আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবনিযুক্ত শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক তারবিয়াতি মজলিস এবং অভিভাবক সমাবেশ আয়োজন বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন

‘কওমি মাদরাসা ধর্মীয় শিক্ষা ও মানুষ গড়ার স্বতন্ত্র এক প্রতিষ্ঠান’

এর মাধ্যমে অভিভাবকদের সঙ্গে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যেকোনো সমস্যা দ্রুত কর্তৃপক্ষের নজরে আনার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।

মাদরাসাবিরোধী অপপ্রচার প্রতিরোধে প্রতিটি কওমি মাদরাসা বোর্ডকে নিজ নিজ অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকির জন্য পৃথক মাদরাসা মনিটরিং সেল গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ গ্রহণের জন্য পৃথক হটলাইন চালুর কথাও বলা হয়েছে।

কোনো অভিযোগ পাওয়ার পর বোর্ড, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও সুরক্ষা কমিটিকে সমন্বিতভাবে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম হয়েছে কওমি মাদরাসা। ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম হয়েছে কওমি মাদরাসা। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে মিথ্যা অপবাদ, ভিত্তিহীন সংবাদ বা মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার নিরপরাধ শিক্ষক, শিক্ষিকা, মুহতামিম বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বোর্ডগুলোর আইনজীবী প্যানেলের মাধ্যমে আইনগত প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

প্রয়োজনে আল-হাইআতুল উলয়ার কেন্দ্রীয় হটলাইন ০১৭০০-৭৬৩১৭৮ (হোয়াটসঅ্যাপ) নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে বলে নির্দেশনায় জানানো হয়েছে।

আল-হাইআতুল উলয়া জানিয়েছে, গত ১২ সেপ্টেম্বর চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আল-হাইআতুল উলয়ার স্থায়ী কমিটির ৬৯তম সভা এবং এর আগে ২৯ জুলাই অনুষ্ঠিত সংশ্লিষ্ট সাবকমিটির সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এ নির্দেশনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

কওমি সনদ কোথায় স্বীকৃত, সংসদে জানালেন প্রধানমন্ত্রী

নির্দেশনা তৈরিতে হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী ও শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলভীসহ উলামায়ে দেওবন্দের তালিম-তারবিয়াতবিষয়ক রচনাবলি এবং প্রসিদ্ধ দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর ফতোয়া অনুসরণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

আল-হাইআতুল উলয়া আরও জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তি অপরাধ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীকে কোনো ধরনের প্রশ্রয় না দেওয়াই তাদের নীতি। একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন ঘটনার দায় পুরো কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী কিংবা আলেমসমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তিসংগত নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসান স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় দেশের ছয়টি কওমি মাদরাসা বোর্ড ও তাদের অধিভুক্ত সব মাদরাসাকে অবিলম্বে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

জেবি