Dhaka Mail Logo

শিক্ষা

‘কওমি মাদরাসা ধর্মীয় শিক্ষা ও মানুষ গড়ার স্বতন্ত্র এক প্রতিষ্ঠান’

নিজস্ব প্রতিবেদক

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৯ পিএম

কওমি মাদরাসাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিনের শিক্ষা, অনুশীলন ও সামাজিকীকরণের মধ্য দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিকতা, আচরণ ও জীবনবোধ গড়ে ওঠে। স্থানীয় সমাজ, অর্থনীতি ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই কওমি মাদরাসাগুলো তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। তবে কওমি মাদরাসার শিক্ষা ও মানুষ তৈরির দর্শন প্রচলিত সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার চেয়ে আলাদা। এখানে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আদব, ঈমান ও আমল-এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবন, আচরণ ও মূল্যবোধ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর পুরান ঢাকার শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজে আয়োজিত ‘ধর্মীয় সামাজিকীকরণে সময়, স্থান ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: একটি এথনোগ্রাফিক গবেষণা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। কলেজের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ধারাবাহিক আয়োজন ‘কানেক্টিং অ্যানথ্রোপলজি’র তৃতীয় পর্ব হিসেবে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়।

সেমিনারে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ নৃবিজ্ঞানী ড. নুরুল মোমেন ভূঁইয়া। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে কওমি মাদরাসার শিক্ষা, ধর্মীয় সামাজিকীকরণ এবং শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া নিয়ে নিজের এথনোগ্রাফিক গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি।

ড. নুরুল মোমেন ভূঁইয়া বলেন, কওমি মাদরাসা আক্ষরিক অর্থেই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে এর শিক্ষা দর্শন ও উদ্দেশ্য সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার মতো নয়। কওমি মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় পরিচয়, বিশ্বাস, আচরণ ও জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে একটি বিশেষ নৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।

তিনি বলেন, ধর্মীয় সামাজিকীকরণ শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্দিষ্ট সময়, স্থান, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে একজন মানুষের মূল্যবোধ, আচরণ ও জীবনযাপন গড়ে ওঠে। কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও এই প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ।

তার গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, ২০০৭ সালে সিলেটের বিশ্বনাথের একটি কওমি মাদরাসায় বিভিন্ন সময়ে প্রায় ১৫ মাস অবস্থান করে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের পর প্রায় তিন বছর ধরে গবেষণাটি নিয়ে কাজ করেন তিনি।

ড. নুরুল মোমেন বলেন, কওমি মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থায় আদব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি শুধু পাঠ্যবিষয়ের অংশ নয়; একজন মানুষ কীভাবে নিজের আচরণ, চলাফেরা ও কথাবার্তা নিয়ন্ত্রণ করবে, সেটিও এর সঙ্গে যুক্ত। একইভাবে ঈমান ও আমল শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবন ও মূল্যবোধের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

কওমি মাদরাসাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার প্রবণতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সমাজ, অর্থনীতি, দাতা, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মানুষের সঙ্গে নানা ধরনের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। বিভিন্ন সময় ও ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যেও স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে কওমি মাদরাসাগুলো টিকে রয়েছে।

আরও পড়ুন

কওমি সনদ কোথায় স্বীকৃত, সংসদে জানালেন প্রধানমন্ত্রী

তার মতে, দীর্ঘ সময় ধরে পরিবর্তিত সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও কওমি মাদরাসাগুলোর টিকে থাকা এ শিক্ষাব্যবস্থার অভিযোজন সক্ষমতারও একটি দিক তুলে ধরে।

কওমি মাদরাসাকে শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে এর ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে স্থানীয় গবেষকদের আরও মাঠপর্যায়ের গবেষণা প্রয়োজন বলেও মত দেন।

কওমি মাদরাসাকে ‘সন্ত্রাসের প্রজননক্ষেত্র’ হিসেবে দেখার প্রবণতার সমালোচনা করে ড. নুরুল মোমেন বলেন, এ ধরনের ধারণা অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সরলীকৃত। তাঁর গবেষণায় দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মাদরাসায় এনে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শে দীক্ষিত করে সন্ত্রাসী বানানোর এমন সরল প্রক্রিয়া তিনি দেখেননি।

তিনি বলেন, ৯/১১, ‘ওয়ার অন টেরর’, লন্ডনের ৭/৭ হামলা এবং বাংলাদেশে ২০০৫ সালের বোমা হামলার পর বিশ্বজুড়ে মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের আগ্রহ ও সন্দেহ বেড়েছে। একই সঙ্গে কওমি মাদরাসাশিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার চাপও বেড়েছে।

Qaumi2

তবে কওমি মাদরাসা সম্পর্কে কোনো পূর্বধারণাকে সত্য ধরে নেওয়ার পরিবর্তে সরাসরি মাঠপর্যায়ে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বাস্তবতা বোঝার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সেমিনারে শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজের অধ্যক্ষ ড. কাজী জুলফিকার আলী বলেন, ধর্মীয় শিক্ষায় যুক্ত মানুষের সঙ্গে সমাজের কিছুটা দূরত্ব রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে অনেকে এই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করেছেন। তবে তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ধর্মীয় শিক্ষার বিকাশে সরকারের আরও সহায়তা ও বরাদ্দ প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ আরমান হোসেন বলেন, কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক পরিসরে যুক্ত হচ্ছেন। ফলে সমাজে তাঁদের প্রভাবও বাড়ছে। এ কারণে কওমি মাদরাসা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি বলেন, ইসলাম ও ধর্ম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া বিভিন্ন নেতিবাচক ধারণার পেছনের কারণও গবেষণার মাধ্যমে বোঝা দরকার।

আরও পড়ুন

কওমি মাদরাসার ভাবমূর্তি রক্ষায় ৬ দফা প্রস্তাব শায়খ আহমাদুল্লাহর

লেখক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট মুসতাইন জহির বলেন, সমাজের বিভিন্ন অংশ একে অপরকে কীভাবে দেখে, সেটিও বোঝা জরুরি। সমাজের বিভাজন ও দ্বন্দ্ব কমাতে প্রচলিত ধারণা ও গবেষণার পূর্বধারণাগুলো নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, নৃবিজ্ঞান মানুষের জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে বোঝার গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্র। ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মাঠপর্যায়ের গবেষণা বাড়লে সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যকার দূরত্ব, ভুল বোঝাবুঝি এবং সামাজিক বিভাজনের কারণগুলো আরও গভীরভাবে বোঝা সম্ভব হবে।

সেমিনারে কলেজের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কলেজের নৃবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. মাহ্ফুজ সরকার।

জেবি