বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) একমাত্র ক্যাফেটেরিয়ায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার প্রস্তুতের অভিযোগ উঠেছে। রান্নাঘরের মেঝেতে খাবার প্রস্তুত, খাবার তৈরির কাজে ব্যবহৃত বাসনের ওপর কর্মীদের পা রাখাসহ বিভিন্ন অনিয়মের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা গিয়েছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ওই ছবিতে দেখা যায়, ক্যাফেটেরিয়ার রান্নাঘরের মেঝেতে বড় পাত্রে খাবার প্রস্তুত করা হচ্ছে। একই স্থানে খাবার প্রস্তুতের কাজে ব্যবহৃত বাসনের ওপর পা রেখে কর্মীদের বসে থাকতে দেখা যায়। রান্নার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রীও মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
এমন পরিবেশে খাবার প্রস্তুতের ছবি প্রকাশ্যে আসায় ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যমান ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এই ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের ওপর নির্ভর করেন। ফলে, খাবার প্রস্তুতের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা অতীবও জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে ক্যাফেটেরিয়ার পরিচালক মাসুদ জানান, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত বিব্রতকর। আমার কর্মচারীরা এভাবে খাবার প্রস্তুত করছে। এ ধরনের ঘটনা আগে কখনো দেখিনি। হঠাৎ কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল, সেটিও আমার বোধগম্য নয়। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।
তিনি আরও বলেন, ‘পরবর্তীতে যেন এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি খাবারের মান ও অন্যান্য সমস্যাগুলোও সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।’
বিষয়টি নিয়ে ক্যাফেটেরিয়া কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার কথা জানিয়েছেন জকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক নূর মোহাম্মদ।
তিনি বলেন, ‘বিষয়টি দেখার পর আমরা ক্যাফেটেরিয়ার পরিচালক মাসুদ ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি ঘটনাটিকে অত্যন্ত বিব্রতকর হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং জানিয়েছেন, আগামীকাল থেকে এ ধরনের বিষয় আর দেখা যাবে না। খাবারের মান ও অন্যান্য সমস্যাগুলো সমাধানের বিষয়েও তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।’
নূর মোহাম্মদ আরও বলেন, ‘খাবারের মান আরও উন্নত করার জন্য আমরা ক্রমাগত চেষ্টা করছি। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার সাশ্রয়ী রাখতে গিয়ে বিষয়টি দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। তারপরও আমাদের পক্ষ থেকে চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আজকের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে আমাদের সজাগ দৃষ্টি থাকবে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিটির সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক রিফাত হাসান।
তিনি বলেন, ‘আমরা ছবিটা দেখেছি। তবে সেটি এআই জেনারেটেড কি না, নাকি সত্যি এবং ঘটনাটি বাস্তবে ঘটেছে কি না, এগুলো আমরা আগে তদন্ত করে দেখব। যদি ঘটনাটি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অধ্যাপক রিফাত হাসান আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের একটি খাদ্যের মান ও উন্নয়ন কমিটি রয়েছে। ওই কমিটির মাধ্যমেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। যেভাবে খাবার প্রস্তুত করা হচ্ছে, তা খুবই অস্বাস্থ্যকর।’
ঘটনাটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরাও। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হাসনাত হাবিব বলেন, ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কপালে যেন দুঃখ ছাড়া আর কিছুই নেই। আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাচ্ছি, সেটার মান ও প্রস্তুতপ্রক্রিয়া নিয়ে যদি এমন প্রশ্ন ওঠে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত হতাশাজনক।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ক্যাফেটেরিয়ায় শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। আমরা চাই, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
এদিকে ক্যাফেটেরিয়ার পরিবেশ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মাহাবুবুর রহমান। সম্প্রতি দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘দেখেই বমি আসতেছে! কী খাচ্ছি দৈনিক আমরা জবিয়ানরা?? খাবারের উপর এমনে পা রাখছে ছিহ ছিহ!’
একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের অবনতি হলে এর দায়ভার কে নেবে, এমন প্রশ্ন তুলে ক্যাফেটেরিয়ার খাবার বয়কটের আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ত এলাকার প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে তারা নিয়মিত পড়াশোনা করেন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ক্যাফেটেরিয়ায় খাবার প্রস্তুতের পরিবেশও যদি অস্বাস্থ্যকর হয়, তাহলে তা শিক্ষার্থীদের জন্য আরও উদ্বেগের বিষয়।
তাদের দাবি, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে ক্যাফেটেরিয়ায় খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের পরিবেশ দ্রুত স্বাস্থ্যসম্মত করতে হবে।
একইসঙ্গে খাবারের মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, রান্নাঘরে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণ এবং ক্যাফেটেরিয়ার কার্যক্রমে নিয়মিত তদারকি জোরদার করতে হবে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
এএইচ