নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৯ এএম
স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেশে এখনো প্রায় চার কোটি মানুষ নিরক্ষর। দেশের সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ২২ শতাংশের বেশি মানুষ এখনো পড়তে-লিখতে পারেন না। বিদ্যালয়বহির্ভূত ও ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের একটি বড় অংশ এই নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
সাক্ষরতার এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর এবারের প্রতিপাদ্য—‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’। বাংলাদেশেও একই প্রতিপাদ্যে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার গত কয়েক বছরে খুব ধীরগতিতে বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০২২ সালে ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এরপর ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তা ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে স্থির রয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে সাক্ষরতার হার বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাক্ষরতার হার বাড়াতে বিচ্ছিন্ন কিছু কর্মসূচি থাকলেও ধারাবাহিক ও বড় পরিসরের কার্যক্রমের ঘাটতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ঘিরে প্রতিবছর শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হলেও সারা বছর নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে কার্যকর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার চিত্র খুব একটা দেখা যায় না।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২২ লাখ ৮০ হাজার। ওই হিসাবে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ০৯ শতাংশ এবং নিরক্ষর মানুষের হার ২২ দশমিক ৯১ শতাংশ। সাত বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সীদের হিসাবে নিরক্ষর মানুষের সংখ্যা প্রায় পৌনে চার কোটি বলে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর তথ্যে উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যানের সংজ্ঞা ও হিসাবের ভিত্তিতে সংখ্যায় কিছুটা পার্থক্য থাকলেও বিভিন্ন সরকারি তথ্যের সার্বিক চিত্র বলছে—দেশে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ মৌলিক সাক্ষরতার বাইরে রয়েছেন।
নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশু-কিশোর, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী এবং শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ। দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক অনাগ্রহ, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া এবং পর্যাপ্ত শিক্ষার সুযোগের অভাবসহ নানা কারণে এসব মানুষ শিক্ষার মূলধারার বাইরে রয়েছেন।
তবে দেশের কোন এলাকায় কতজন নিরক্ষর, তাঁদের বয়স, লিঙ্গ, পেশা ও আর্থসামাজিক অবস্থার হালনাগাদ তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়। শিক্ষাবিদদের মতে, নিরক্ষরতা দূরীকরণের কার্যকর পরিকল্পনার জন্য প্রথমেই ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক নিরক্ষর মানুষের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন।
নিরক্ষরতা কমানোর পাশাপাশি ঝরে পড়া কিশোর-কিশোরীদের কর্মদক্ষ করে তুলতে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মাধ্যমে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
শতভাগ সাক্ষরতা যেন অধরা
বর্তমানে দেশের ৫৮ জেলার সদর উপজেলায় ‘কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণ (প্রাক্-বৃত্তিমূলক পর্যায়)’ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে প্রতি জেলায় ঝরে পড়া ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী মোট ৪ হাজার ৪৪০ জন কিশোর-কিশোরীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। প্রতিটি কোর্সে ৪৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১০০ ঘণ্টা কার্যকর সাক্ষরতা এবং ৩৬০ ঘণ্টা দক্ষতা প্রশিক্ষণ।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের শিক্ষা থেকে কর্মে উত্তরণের সুযোগ তৈরি করা। বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় নিবন্ধিত ৪ হাজার ৩১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪ হাজার ১৯৮ জন দক্ষ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩ হাজার ৮৮২ জন চাকরি, শিক্ষানবিশ বা উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। সরাসরি কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন ৬০৩ জন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু, ঝরে পড়া কিশোর-কিশোরী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং অনগ্রসর প্রাপ্তবয়স্কদের দ্রুত সাক্ষর ও দক্ষ করে তোলাকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগও রয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে ‘অলটারনেটিভ লার্নিং অপরচুনিটি (এএলও)’ কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলার ৬৪টি নির্বাচিত উপজেলায় ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী ১৯ হাজার ২০০ বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু-কিশোরকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মৌলিক শিক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী আরও ১৯ হাজার ২০০ তরুণকে জীবিকায়ন দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ ছাড়া ‘স্কিল ফোকাসড লিটারেসি ফর আউট অব স্কুল অ্যাডোলেসেন্ট (স্কিলফো)’ কার্যক্রম আরও ১৬ জেলায় সম্প্রসারণ করে তিন বছরে এক লাখ কিশোর-কিশোরীকে দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
চলতি অর্থবছরে বিশেষ কার্যক্রমের দ্বিতীয় ধাপে ৫০ জেলায় আরও ৪ হাজার কিশোর-কিশোরীকে প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রাপ্তবয়স্ক নিরক্ষরদের জন্যও পরিকল্পনা রয়েছে। ‘অ্যাডাল্ট লিটারেসি অ্যান্ড ফাংশনাল অ্যাবিলিটি (আলফা) এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম’-এর পাইলট পর্যায়ে ৪০ জেলার ৪০টি উপজেলায় ৩৫ হাজার নারী-পুরুষকে প্রায়োগিক সাক্ষরতা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লাখ নিরক্ষর নারী-পুরুষকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে সরকারি পরিকল্পনার বিপরীতে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রমের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জানা গেছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের সাক্ষরতার জন্য একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল মাত্র ৬ হাজার ৮০৫ জন।
এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত প্রাক-বৃত্তিমূলক বিশেষ কার্যক্রমে ছিল ৪ হাজার ১৯৮ জন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত প্রকল্প ও কার্যক্রম না থাকায় মাঠপর্যায়ে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসকে কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি পালন করে নিরক্ষরতা দূর করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, ধারাবাহিক ও জাতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, দেশে সাক্ষরতার হার বাড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা ধারাবাহিক ও কার্যকর কর্মসূচির ঘাটতি। নিরক্ষর ও বিদ্যালয়বহির্ভূত জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে তাঁদের জন্য নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। দারিদ্র্য, ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহও নিরক্ষরতা কমানোর পথে বড় বাধা।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী মনে করেন, নিরক্ষরতা দূরীকরণকে কোনো নির্দিষ্ট দিবসের কর্মসূচি বা স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক নিরক্ষর মানুষের তালিকা তৈরি করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবীদের সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি ‘সাক্ষরতা অভিযান’ পরিচালনা করা প্রয়োজন।
জেবি