Dhaka Mail Logo

শিক্ষা

গুমের বিচারে বাধা ঠেকাতে আইন করা হচ্ছে: তাজুল ইসলাম

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১২ পিএম

গুমের তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত আইনে বাহিনীকে সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

সোমবার (৩১ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরসি মজুমদার মিলনায়তনে ডাকসু আয়োজিত আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের আলোচনা সভায় ‘শুনতে কি পাও’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

তাজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে গুমের ঘটনা নিয়ে তদন্ত করতে গিয়ে এমন ভয়াবহ সব তথ্য পাওয়া গেছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্য এবং বিভিন্ন নথিপত্রে এসব ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তিনি আরও বলেন, গুমের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে না পারলে গুম প্রতিরোধে আইন ও সামাজিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা আমরা বুঝতে পারব না।

গুমের ঘটনায় এক প্রত্যক্ষদর্শীকে দিনের পর দিন জিজ্ঞাসাবাদের একটি ঘটনা তুলে ধরে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ওই ব্যক্তি প্রথম কয়েক দিন কোনো তথ্য দিতে চাননি। পরে গভীর রাতে তিনি তদন্তকারীদের জানান, এতদিন তিনি যা বলেছেন, তা মোট ঘটনার মাত্র এক শতাংশ। এরপর তিনি বিস্তারিত বলতে শুরু করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে তার বক্তব্য টাইপ করার একপর্যায়ে টাইপিস্টের হাতও অবশ হয়ে যায়।

তাজুল ইসলাম বলেন, গুমের পর হত্যার ঘটনায় একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো। বন্দিদের গোপন আটককেন্দ্র থেকে রাতে বের করে বিভিন্ন এলাকায় নেওয়া হতো। পরে গুলি করে বা বিষাক্ত ইনজেকশন প্রয়োগ করে হত্যা করে লাশ নদী, খাল কিংবা নালায় ফেলে দেওয়া হতো।

তিনি জানান, তদন্তে এমন একজন সাবেক র‍্যাব কর্মকর্তার সাক্ষ্য পাওয়া গেছে, যিনি ২০১১ সালে পদ্মা নদীতে একটি অভিযানে তিনজন বন্দিকে হত্যার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা শাখার এক কর্মকর্তা তিন বন্দিকে নিয়ে স্পিডবোটে ওঠেন। পরে নদীর মাঝখানে গিয়ে একজনকে গুলি করে এবং আরেকজনকে বিষাক্ত ইনজেকশন দিয়ে হত্যা করা হয়। তৃতীয় ব্যক্তিকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে লাশগুলো নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ওই কর্মকর্তা এসব ঘটনার প্রতিবাদ করায় পরবর্তী সময়ে তাকে বদলি করা হয়েছিল। তদন্তে তার বদলির তারিখের সঙ্গে মিলিয়ে ওই সময়ের সংবাদপত্রের প্রতিবেদনও খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে একই রাতে ওই এলাকার আশপাশে কয়েকটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া যায়।

গুমের ঘটনায় সাংকেতিক শব্দ ব্যবহারের কথাও তুলে ধরেন তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, বন্দিদের হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়াকে বিভিন্ন সাংকেতিক নামে ডাকা হতো। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ অপরাধ সম্পর্কে জানতে চাইলে তাদেরও চাপ ও হুমকি দেওয়া হতো।

শীতলক্ষ্যা ও বলেশ্বর নদীতে গুমের পর লাশ ফেলার ঘটনাও তুলে ধরেন তিনি। তাজুল ইসলাম বলেন, নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে এক রাতে একাধিক মানুষকে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়ার তথ্য তদন্তে পাওয়া গেছে। বন্দিদের ট্রলারে করে নদীর নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে সিমেন্টের বস্তা দিয়ে শরীর চেপে ধরে মাথায় গুলি করে, পেট কেটে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।

তিনি আরও বলেন, হত্যার সময় বন্দিদের মাথার বিশেষ টুপি খুলে দেওয়া হতো, যাতে মাথায় গুলি সরাসরি করা যায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট নৌকার মাঝিদের কাছ থেকেও এ ধরনের ঘটনার সাক্ষ্য পাওয়া গেছে। গুলি করার সময় রক্ত ও মগজ ছিটকে পড়া ঠেকাতে বালিশ ব্যবহার করা হতো বলেও সাক্ষ্য পাওয়া গেছে।

বলেশ্বর নদীর ঘটনায় প্রায় ২০ থেকে ২২ জন সাক্ষীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে জানিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, তাদের কয়েকজন ইতোমধ্যে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, এই যে অজস্র কাহিনী, এটা সিস্টেমেটিক উপায়ে গোটা রাষ্ট্রকে একটা ভয়ের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছিল।

প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ আইন নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে ওই বাহিনী ছাড়া অন্য বাহিনী তদন্ত করবে। কিন্তু বাস্তবে একটি গুমের ঘটনায় একাধিক বাহিনী যুক্ত থাকায় কোন বাহিনী মূল অপরাধ করেছে, তা নির্ধারণ করাই কঠিন।

তাজুল ইসলাম বলেন, আপনি কীভাবে আইডেন্টিফাই করবেন যে কোন বাহিনী অপহরণটা করেছে? কারণ আমরা যে মামলাগুলো তদন্ত করেছি, সেখানে দেখা গেছে এক বাহিনী অপহরণ করে, আরেক বাহিনীর হাতে দেয়, অন্য একটি গ্রুপ বন্দি রাখে এবং হত্যার সময় আবার আরেক গ্রুপের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

এ কারণে প্রস্তাবিত আইনকে ‘অকার্যকর ও অদ্ভুত’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাজুল ইসলাম। তার অভিযোগ, গুমের অভিযোগের তদন্ত সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ওপর ছেড়ে দিলে অভিযুক্ত বাহিনীই নিজেদের বিরুদ্ধে তদন্ত করবে। এতে আলামত নষ্ট কিংবা তদন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তাজুল ইসলাম বলেন, যিনি গুম করে মানুষ মেরে ফেলছেন, তার কাছে সুপারিশ করা হচ্ছে— অনুগ্রহ করে আপনি সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করুন। এই আইনের প্রস্তাবটা কাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য?

তিনি আরও বলেন, কোনো বাহিনীকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ওই বাহিনীর সদস্যদেরই আরও বড় বিপদের মুখে ফেলতে পারে। কারণ অপরাধ গোপন করার চেষ্টা পরবর্তী সময়ে আলাদা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং বিচ্ছিন্ন গুমের ঘটনা ব্যাপক আকার ধারণ করলে তা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে যেতে পারে।

এই আইনজীবী বলেন, গোপন করে কেউ কোনোদিন রক্ষা পায় না। জিয়াউল হাসানও মনে করেছিল গোপন করে সে রক্ষা পাবে। কিন্তু দুই কাঁধে দুই ফেরেশতা সব লিখে রাখছে।

বর্তমান সরকারের প্রতি গুমের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, জনগণ বর্তমান সরকারকে একটি বড় সুযোগ দিয়েছে। সঠিকভাবে আইন প্রণয়ন ও বিচার নিশ্চিত করতে পারলে জনগণ ভবিষ্যতেও তাদের সমর্থন করবে।

তিনি আরও বলেন, প্রয়োজন হলে আমরা ফিফটি-ফিফটি দিব আপনাদের। আপনাকেই ভোট দিব। ঠিকমতো আইনগুলো করেন, ঠিকমতো বিচারগুলো করেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সংঘাতের বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের জনগণ নতুন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছে। এই পরিবেশকে আবার সংঘাত ও অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়।

তিনি আরও বলেন, আপনারা আবার কেন অন্ধকারের দিকে যেতে চান? আপনাদের জনগণ ক্ষমতায় বসিয়েছে। সরকারি দল-বিরোধী দল আপনারা কেউ যদি আপনাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, এই জনগণ কিন্তু আগের জনগণ না। যারা ৩৬ জুলাইয়ে বিপ্লব করতে পেরেছে, তারা আপনাদেরকেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবে।

এম/এফএ