Dhaka Mail Logo

শিক্ষা

‘গুমের তদন্তে আন্তঃবাহিনী পদ্ধতিতে সত্য বের হবে না’

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২২ পিএম

গুমের ঘটনায় আন্তবাহিনী তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করে আনা কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক প্রধান ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত মানবাধিকার কমিশন আইনের বিভিন্ন দুর্বলতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।

সোমবার (৩১ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরসি মজুমদার মিলনায়তনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ‘শুনতে কি পাও’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

নূর খান লিটন বলেন, অতীতে গুমের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্ত হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসেনি। তাই গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি হাফেজ জাকির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, জাকির মোহাম্মদপুরের বাংলাদেশ গার্ডেনের বিপরীত দিকে একটি মেসে থাকতেন। গভীর রাতে সিভিল পোশাকে একদল ব্যক্তি সেখানে গিয়ে একটি যন্ত্রের মাধ্যমে তার মোবাইলের অবস্থান শনাক্ত করে ওই কক্ষে পৌঁছান। পরে তাকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

তিনি বলেন, নিয়ে যাওয়ার পথে জাকির আটককারীদের কাছে নিজেকে কোরআনের হাফেজ পরিচয় দিয়ে নামাজ পড়ার সুযোগ চান। তাকে আটককারী দলের একজন সদস্যের বক্তব্য থেকেও পরে এ ঘটনার বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। ওই দলের সদস্যরা জানতেন না তারা কাকে আটক করছেন। তাদের শুধু একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে ওই নম্বর ব্যবহারকারীকে নিয়ে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

নূর খান লিটন বলেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ওই দলের একজন সদস্যের মধ্যে অনুশোচনা তৈরি হয়। তার মনে হয়েছিল, তারা একজন কোরআনের হাফেজকে ধরে এনে গায়েব করে দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার বিষয়ে তথ্য নেওয়া হয়।

তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কয়েক দিন মোহাম্মদপুর এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে জাকিরকে যেখান থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়, সেই বাড়িটি শনাক্ত করা হয়। বাড়ির মালিক এরই মধ্যে মারা গেলেও তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ওই সময়ে বাড়ি থেকে একজনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।

ওই বাড়িতে কয়েকটি কোরআন শরিফও পাওয়া গিয়েছিল বলে জানান নূর খান লিটন। পরে জাকিরকে আটককারী দলের আরও দুজন সদস্যকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। হাফেজ জাকিরের মামলাটি বর্তমানে এগিয়ে চলছে বলেও জানান তিনি।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের অপেক্ষার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বজনেরা এখনো প্রিয় মানুষটির ফিরে আসার আশায় অপেক্ষা করছেন। দরজায় কোনো শব্দ হলেই অনেকের মনে হয়, হয়তো নিখোঁজ স্বজন ফিরে এসেছেন।

আলোচনায় সাম্প্রতিক আরেকটি ঘটনার কথাও তুলে ধরা হয়। গত ১০ এপ্রিল বাগেরহাটের মোংলায় মিরাজ শেখ নামে এক মোটরসাইকেলচালক কোস্টগার্ডের হাতে গুমের শিকার হয়েছেন বলে তার পরিবারের অভিযোগ। স্থানীয় এলাকায় অনুসন্ধান এবং মানুষের সঙ্গে কথা বলে এ ঘটনায় গুরুতর প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে বলেও জানান নূর খান লিটন।

তিনি বলেন, একদিকে দীর্ঘদিন ধরে চলা গুমের মতো গুরুতর ঘটনাগুলোর বিচার ও অনুসন্ধানের দাবি রয়েছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য কার্যকর আইন ও প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। কিন্তু প্রস্তাবিত মানবাধিকার কমিশন আইনে তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দুর্বলতা রয়ে গেছে।

প্রস্তাবিত আইনের ১৯ ধারার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, কোনো অভিযোগ পাওয়ার পর মানবাধিকার কমিশন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি দিয়ে তদন্তের প্রতিবেদন চাইতে পারবে। কিন্তু প্রথম দফায় সেই প্রতিবেদন কত দিনের মধ্যে দিতে হবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা রাখা হয়নি।

তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশনের পুরোনো নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১০-১২ বছর আগে পাঠানো চিঠিরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে প্রথম ধাপেই যদি প্রতিবেদন না আসে, তাহলে দ্বিতীয় ধাপে কমিশনের জবাব চাওয়ার ক্ষমতাও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।

প্রস্তাবিত আইনে কোনো বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে অন্য কোনো বাহিনী দিয়ে তদন্তের কথা বলা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে অন্য বাহিনীর তদন্ত কতটা স্বাধীন ও কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

নূর খান লিটনের ভাষ্য, অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আন্তবাহিনী তদন্তে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই গুম বা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষ আশা করছে, ভবিষ্যতে আর কাউকে এভাবে তুলে নিয়ে গায়েব করে দেওয়া হবে না। কিন্তু আইনে যদি এমন দুর্বলতা রাখা হয়, যার কারণে অপরাধের প্রকৃত তদন্ত বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে অতীতের মতো আবারও নিখোঁজ স্বজনদের কান্না শুনতে হতে পারে।

তিনি বলেন, গুমের ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে ঘটুক বা পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হোক—প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অন্যথায় আইন থাকলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অপেক্ষার শেষ হবে না।

এম/এফএ