মাহফুজ উল্লাহ হিমু
২৮ আগস্ট ২০২৬, ১০:০১ পিএম
নোয়াখালীর লর্ড লিওনার্ড চেশায়ার উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী শিক্ষক মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াছিন। ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে অবসরে যাওয়ার দুই দিন পর স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী অবস্থায় রয়েছেন। অসুস্থতাজনিত কারণে অপরাগ হওয়ায় মাওলানা ইয়াছিনের পক্ষে তার বড় ছেলে এক বছর পর ২০২২ সালের এপ্রিলে অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের প্রাপ্য অর্থের জন্য আবেদন করেন। ইতোমধ্যে কল্যাণ ট্রাস্টের সব অর্থ পেলেও চার বছরেও পাননি অবসরকালীন সুবিধার অর্থ। তার দুই ছেলে একাধিকবার রাজধানীর ব্যানবেইস ও বর্তমানে বেইলি রোডে অবস্থিত সংস্থা দুটির কার্যালয়ে যাতায়াত করলেও কোনো সুরাহা হয়নি।
মুহাম্মদ ইয়াছিনের মতো লক্ষাধিক শিক্ষক অবসরের পর তাদের পাওনা অর্থের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। এ অবস্থায় শিক্ষকদের ভোগান্তি লাঘবে গত ১৫ আগস্ট বিএনপি সরকারের উদ্যোগে প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের ৭০ হাজার ১৯ জন শিক্ষককে অবসর ভাতা এবং ৫৩ হাজার শিক্ষককে কল্যাণ ভাতা দেওয়া শুরু হয়। এর আওতায় এসেছেন চেশায়ার উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক মুহাম্মদ ইয়াছিনও। তবে চার বছরের অপেক্ষা শেষে তার প্রাপ্ত অর্থ মাত্র ১ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯০ টাকা।
সরকারের উদ্যোগে পাওনা টাকার বিষয়ে আশাবাদী শিক্ষকদের প্রায় সবার অবস্থাই মাওলানা ইয়াছিনের মতো। ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলার আওলিয়াপাড়া দাখিল মাদরাসার সাবেক ইবতেদায়ি প্রধান সাইদুজ্জামান পেয়েছেন ৯৯ হাজার টাকা। একই প্রতিষ্ঠানের অবসরে যাওয়া পিওন ছালাম মিয়া পেয়েছেন ৫৫ হাজার টাকা।
২০২৫ সালে অবসরে যাওয়া সাইদুজ্জামান অর্থ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পেনশন ও কল্যাণ ট্রাস্টের পাওনা থেকে প্রায় এক লাখ টাকা পেয়েছি। এটিও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ ব্যবস্থাপনায় যে টাকা দেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে।’
তবে মোট কত টাকা পাওয়ার কথা, বিশেষ করে পেনশন ও কল্যাণ ট্রাস্ট মিলিয়ে কত পাবেন, সেটি এখনো পরিষ্কারভাবে জানেন না এই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জিজ্ঞেস করেও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাইনি। অফিসে যাওয়া-আসা করলেও পুরো টাকা কবে নাগাদ পাব, সেটাও নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেনি।’
সারা জীবন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মানুষ করা শিক্ষকদের ভোগান্তি দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি বেসরকারি শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসরকালীন সুবিধা সংস্থার কার্যালয়ে সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ পর্যন্ত অবসরে যাওয়া শিক্ষকরা বছরের পর বছর সংস্থাগুলোর বারান্দায় ঘুরপাক খাচ্ছেন। ২০২৩ সালের আগে অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের একাংশ কল্যাণ ও অবসরের টাকা পেলেও এরপর অবসরে যাওয়া বেসরকারি শিক্ষকরা পাওনা অর্থের জন্য দিন গুনছেন।
এর মাঝে সরকারের বিশেষ উদ্যোগের আওতায় এসেছেন চলতি বছরে অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীরাও। তেমনই একজন কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার লুলিকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মেনু শিকদার। ২০২৬ সালের মার্চে অবসরে যাওয়া এই শিক্ষক মোট ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৫০৬ টাকা পেয়েছেন। আবেদন ও টাকা পাওয়ার বিষয়ে ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘আমি ২০২৬ সালের এপ্রিলে আবেদন করেছিলাম। এর মধ্যে একাধিকবার অফিসে যোগাযোগ করলেও কোনো সদুত্তর পাইনি। সরকারের বিশেষ উদ্যোগে এই টাকা পেয়েছি।’
তবে অন্য অনেক শিক্ষকের মতো মেনু শিকদারও জানেন না তিনি মোট কত টাকা পাবেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মোট কত পাবো জানি না। তবে শুনেছি এবার মোট টাকার ১০ শতাংশ দিয়েছে।’
মেনু শিকদার ১০ শতাংশ টাকা পাওয়ার ধারণা করলেও আসলে ঠিক কোন হিসেবে টাকা দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও তাদের স্বজনদের। তিনি সাড়ে তিন লাখ টাকা পেলেও তার এক বছর আগে অবসরে যাওয়া সাইদুজ্জামান পেয়েছেন ৯৯ হাজার টাকা। আবার ২০২১ সালে অবসরে যাওয়া মুহাম্মদ ইয়ছিন পেয়েছেন প্রায় দুই লাখ টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব ইউসূফ আলী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সর্বশেষ যে উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা দেওয়া হয়েছে, সেখানে সবাইকে আওতায় আনা হয়েছে। একজন শিক্ষক কত টাকা পাবেন, সেটা তার স্কেল অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, তিনি যখন অবসরে গেছেন, তখন তার যে স্কেল ছিল, সেই অনুযায়ীই তিনি টাকা পেয়েছেন।’
টাকা পাওয়ায় শিক্ষদের মধ্যে স্বস্তি থাকলেও টাকার পরিমাণ ও বাকি টাকা কবে নাগাদ পাবেন তা নিয়ে রয়েছে হতাশা। অবসরের পর থেকে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকা মুহাম্মদ ইয়াছিনের ছেলে আমির সোহেল ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘চার বছরের অপেক্ষার পর মাত্র দুই লাখ টাকা পেয়েছি। বাকি টাকা কবে পাবো জানি না। প্রত্যেক মানুষের অবসরের টাকা দিয়ে কিছু করার পরিকল্পনা থাকে। কেউ পাকা ঘর বানাবেন, কেউ বা ছেলে মেয়েদের বিয়ে দেবেন। এমন অসংখ্য পরিকল্পনা থাকে মানুষদের। কিন্তু এভাবে অল্প অল্প টাকা দিলে তা কোনো কাজেই লাগে না। আর বাকি টাকা কবে নাগাদ পাবো তার অনিশ্চয়তা তো আছেই।’
কবে নাগাদ পুরো টাকা পাবেন শিক্ষকরা এ বিষয়ে জানতে চাইলে কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব বলেন, ‘আমরা সদ্য দায়িত্ব নিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষকদের টাকা পরিপূর্ণভাবে পরিশোধ করা। সরকারও এই বিষয়ে আন্তরিক।’
বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনও। গত ১৫ আগস্ট সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘শিক্ষকদের বকেয়া অর্থের পুরোটা একবারে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করছেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন কথা লিখছেন। পর্যায়ক্রমে বাকি অর্থ পরিশোধ করা হবে।’
একইসঙ্গে এ সমস্যার জন্য ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর দায় চাপান তিনি।
এদিকে মরহুম সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিনে একযোগে অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষকদের কল্যাণ ও অবসরের টাকা পরিশোধ করায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারকে প্রসংশায় ভাসাতে দেখা যায়। তবে বিপরীতে নানা প্রশ্নও তুলেছেন বেসরকারি শিক্ষক ও তাদের স্বজনেরা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল এক পোস্টে একাধিক শিক্ষক তাদের বেতন থেকে কেটে রাখা টাকার গন্তব্য নিয়ে জানতে চান। একাধিক পোস্টে নানা প্রশ্ন তুলে বলা হয়, প্রতি মাসে সাড়ে ৫ লাখের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর মূল বেতন থেকে অবসর ও কল্যাণ সুবিধার জন্য ১০ শতাংশ টাকা কেটে নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের দাবি অনুযায়ী, এ বাবদ মাসে প্রায় ২০০ থেকে ২১০ কোটি টাকা তহবিলে জমা হওয়ার কথা। সেই হিসাবে ছয় মাসে জমা হয় প্রায় ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা এবং দুই বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ৪০ কোটি টাকা।
শিক্ষকদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, নিয়মিত এত বিপুল অর্থ তহবিলে জমা হওয়ার পরও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা কেন হচ্ছে। তাদের দাবি, সংগৃহীত অর্থের পাশাপাশি এর মাধ্যমে অর্জিত সুদের হিসাবও প্রকাশ করা প্রয়োজন। ছয় মাসের প্রায় ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা ৯ থেকে ১০ শতাংশ সুদে রাখা হলে আনুমানিক ৫৬ থেকে ৬৩ কোটি টাকা সুদ আসতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় অবসর ও কল্যাণ তহবিলের পূর্ণাঙ্গ অডিট, গত ২৪ মাসে সংগৃহীত অর্থ ও অর্জিত সুদের হিসাব প্রকাশ এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বকেয়া পাওনা দ্রুত এককালীন পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব ইউসূফ আলী নতুন দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানিয়ে পরে বিস্তারিত আলাপের কথা জানান। অপরদিকে অবসর সুবিধা বোর্ডের সচিব মো. মোশাররফ হোসেনের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে এ বিষয়ে কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, বিগত সরকার এই খাত থেকে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা অর্থের একটি অংশ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও কম। তবে সরকারি ব্যাংকে থাকা কিছু অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষকরা যে ৬ শতাংশ ও ৪ শতাংশ অনুদান দিয়ে আসছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বন্ডসহ ট্রাস্টের প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকার বন্ড সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদ থেকে পাওয়া আয় কাজে লাগিয়ে অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের সুবিধাভোগীদের বাকি অর্থ পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা হবে।
এমএইচ/জেবি