Dhaka Mail Logo

শিক্ষা / সারাদেশ

সবুজ অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৮ পিএম

জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক সম্পদের অপরিকল্পিত ব্যবহারে বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই বাস্তবতায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশগত ভারসাম্য একসঙ্গে নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সবুজ অর্থনীতির ধারণা। একই সঙ্গে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো দেশের সুস্বাস্থ্য ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। ফলে সবুজ অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা এখন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুর‍্যান্স সেলের (আইকিউএসি) নবনিযুক্ত পরিচালক, মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক এবং খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক ড. মোছা. মিনারা খাতুন বলেছেন, সবুজ অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) ঢাকা মেইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. মিনারা খাতুন বলেন, সবুজ অর্থনীতি এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা পরিবেশবান্ধব, নিম্ন-কার্বনভিত্তিক ও সম্পদ-সাশ্রয়ী উন্নয়নের ওপর গড়ে ওঠে। এর মূল লক্ষ্য প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এ অর্থনীতি গুরুত্ব দেয়। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।

খাদ্য নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের প্রতিটি ধাপে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই খাদ্য নিরাপত্তার মূল কথা। ক্ষতিকর রাসায়নিক, রোগজীবাণু ও অন্যান্য দূষণমুক্ত খাদ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এর অন্যতম উদ্দেশ্য। নিরাপদ খাদ্য মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপুষ্টি, খাদ্যবাহিত রোগ ও জনস্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা শুধু খাদ্যের প্রাপ্যতার বিষয় নয়, এর গুণগত মান ও নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

Aug_21,_2026,_12_27_28_PM

বর্তমান বিশ্বের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে ড. মিনারা খাতুন বলেন, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশদূষণ ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা মানবজাতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা প্রায় ৯.৭ বিলিয়নে পৌঁছাতে পারে। ফলে খাদ্যের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সময়ে খরা, বন্যা, লবণাক্ততা, তাপমাত্রার পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষি উৎপাদনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব কৃষি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে জৈব সার, জৈব কীটনাশক ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করলে খাদ্যের গুণগত মান বাড়ে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে। একই সঙ্গে মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে কৃষির উৎপাদনশীলতা বজায় রাখা সম্ভব।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবুজ অর্থনীতির অবদান সম্পর্কে তিনি বলেন, জৈব কৃষির প্রসারের মাধ্যমে রাসায়নিক দূষণ কমিয়ে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন সম্ভব। আধুনিক সবুজ প্রযুক্তি ও উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা ব্যবহার করে খাদ্য অপচয় কমানো যায়। পরিবেশবান্ধব খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে খাদ্যবাহিত ঝুঁকিও অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

5fda0364-11d7-4df3-8968-ffae10e48d30

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, কৃষিনির্ভর এই দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা ও খরায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার, সৌরশক্তির সম্প্রসারণ ও পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি গ্রহণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য আইন বাস্তবায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

তবে এ পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন এই গবেষক। তার মতে, কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার খাদ্য ও পরিবেশ—দুইয়ের জন্যই হুমকি। অনেক কৃষকের মধ্যে টেকসই কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব রয়েছে। খাদ্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেও অপচয় ও দূষণের ঝুঁকি বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি উৎপাদনের অনিশ্চয়তা এবং সবুজ প্রযুক্তি ও গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের ঘাটতিও বড় বাধা।

Aug_21,_2026,_12_27_26_PM

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি জৈব ও টেকসই কৃষি পদ্ধতিকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি কৃষকদের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, নিরাপদ খাদ্য আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার, জলবায়ু-সহনশীল ফসল উদ্ভাবন এবং সবুজ প্রযুক্তি ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।

সবুজ অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে ড. মিনারা খাতুন বলেন, ‘সবুজ অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা পরস্পর নির্ভরশীল দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যা টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি। পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমন্বিত প্রচেষ্টাই একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘সবুজ অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং আমাদের টিকে থাকার লড়াই। পরিবেশ রক্ষা করে নিরাপদ খাদ্যের জোগান দিতে না পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্থহীন হয়ে পড়বে। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষক, খাদ্য উৎপাদনকারী, বেসরকারি সংস্থা ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।’

প্রতিনিধি/এসএস