নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ আগস্ট ২০২৬, ০২:৫৪ পিএম
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ১০ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আঁচল ফাউন্ডেশন। একই সঙ্গে আট দফা দাবি তুলে ধরেছে সংগঠনটি।
সংগঠনটি বলছে, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া বা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পর মানসিক চাপে এসব ঘটনা ঘটেছে বলে পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য থেকে জানা গেছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) আঁচল ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক শারমিন আক্তার মীম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩১০, ২০২৩ সালে ৫১৩ এবং ২০২২ সালে ৫৩২ জন। পড়াশোনার চাপ ও পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার অন্যতম নিয়ামক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১০ আগস্ট ফল প্রকাশের পর রাজশাহী, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, শেরপুর, গোপালগঞ্জ, মেহেরপুর, কুমিল্লা ও চুয়াডাঙ্গা থেকে অন্তত ১০ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তাদের মধ্যে সাতজন মেয়ে ও তিনজন ছেলে শিক্ষার্থী।
সংগঠনটি সরকারের প্রতি আট দফা সুপারিশ জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
১. পরিবার থেকে পরীক্ষার সময় এবং ফলাফল প্রকাশের পরবর্তী অন্তত দুই সপ্তাহ শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ ও নজরদারি জোরদার করা।
২. প্রতিটি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতা নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
৩. এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগে ও পরে শিক্ষার্থীদের জন্য হটলাইন বা বিশেষ মানসিক পরামর্শ ও সহায়তা কার্যক্রম চালু করা।
৪. শিক্ষক ও অভিভাবকদের শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকট, আচরণগত পরিবর্তন এবং আত্মহানির সম্ভাব্য ঝুঁকির লক্ষণ শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৫. পরীক্ষার ফল খারাপ হলে শিক্ষার্থীদের অপমান, শাস্তি, ভয় দেখানো এবং অন্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে তুলনা না করার বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে অভিভাবক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা।
৬. শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।
৭. ফলাফল প্রকাশের পর মানসিকভাবে ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের শনাক্ত, পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর সহায়তা ও সংযোগব্যবস্থা চালু করা।
৮. গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মহত্যার ঘটনা প্রচারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল সংবাদ পরিবেশন নিশ্চিত করা এবং অতিরঞ্জিত, চাঞ্চল্যকর বা অনুকরণে উৎসাহিত করতে পারে এমন উপস্থাপন পরিহার করা।
এ ছাড়া গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মহত্যার ঘটনা দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীলভাবে প্রচারের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
শারমিন আক্তার মীম বলেন, একটি কম জিপিএ বা অকৃতকার্য হওয়া জীবনের শেষ নয়। প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ, সহানুভূতিশীল ও মানসিকভাবে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
তিনি বলেন, একটি পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া কোনোভাবেই একজন শিক্ষার্থীর জীবনের মূল্য নির্ধারণ করে না। কিন্তু ফলাফলকে সাফল্য-ব্যর্থতার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখার সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের হতাশা, লজ্জা ও সামাজিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিবার, সমাজ ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিতে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ফলাফল প্রকাশের আগে ও পরে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
এএইচ/এআরএম