Dhaka Mail Logo

শিক্ষা

আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

মাহফুজ উল্লাহ হিমু

০৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৬ পিএম

১৬ জুলাই ২০২৪, ঢাকার আকাশে তখনও বর্ষার মেঘ। রংপুর থেকে একের পর এক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মুহূর্ত পরেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ভিডিওটি কয়েক মিনিটের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে হাজারো মোবাইল ফোনে, লাখো মানুষের ফেসবুক নিউজফিডে।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজধানীর বসুন্ধরা, রামপুরা, বাড্ডা, কুড়িল, ধানমন্ডি, সায়েন্সল্যাব, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়কে নেমে আসেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী। তখন পর্যন্ত কোটা সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল মূলত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কিন্তু ওই দিন থেকেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। সেখান থেকেই বদলাতে শুরু করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গতিপথ।

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাত ধরে। জুলাইয়ের প্রথম দুই সপ্তাহ আন্দোলনের মূল কেন্দ্রও ছিল সেসব ক্যাম্পাস। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংহতি জানানো, ছোট পরিসরে মানববন্ধন কিংবা তথ্য প্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন।

তবে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা পরিস্থিতি বদলে দেয়। রাতেই বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাচ গ্রুপ, মেসেঞ্জার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরদিন রাজপথে নামার আহ্বান ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন আবু সাঈদের মৃত্যুর খবর সেই ক্ষোভকে আরও বিস্ফোরিত করে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি), আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (এআইইউবি), ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউল্যাব, স্ট্যামফোর্ড, ইস্ট ওয়েস্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আলাদা কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছাড়াই সড়কে নেমে আসেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন অংশে একযোগে বিক্ষোভ শুরু হয়।

দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন, তারা ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক, সামাজিক আন্দোলনে তেমন সক্রিয় নন। জুলাইয়ের আন্দোলন সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। শুধু সংহতি জানানো নয়, পরবর্তী দিনগুলোতে তারাই আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হন।

8

রামপুরা থেকে কুড়িল: একাধিক ফ্রন্টে আন্দোলন

১৬ জুলাই দুপুরের পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একযোগে অবস্থান নিতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। রামপুরা-বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়কে নামেন। পুলিশ-র‌্যাবসহ তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পেটোয়া বাহিনী ব্যাক ক্যাম্পাসে হামলা চলালে তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসে ইস্ট-ওয়েস্টসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ফলে পালাতে বাধ্য হয় ফ্যাসিস্ট বাহিনী। একই সময়ে বসুন্ধরা ও কুড়িল এলাকায় নর্থ সাউথ, আইইউবি ও এআইইউবির শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেন। ধানমন্ডিতে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল, ইউল্যাব, স্ট্যামফোর্ড ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সায়েন্সল্যাব ও মিরপুর রোড এলাকায় বিক্ষোভ করেন। উত্তরায়ও বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হন।

এতদিন আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল মূলত শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। কিন্তু ১৬ জুলাইয়ের পর রাজধানীর উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম—তিন দিকেই নতুন নতুন প্রতিরোধকেন্দ্র গড়ে ওঠে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একাধিক স্থানে একযোগে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। আন্দোলনও একটি ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক অবস্থান থেকে নগরব্যাপী রূপ নিতে শুরু করে।

রাজধানীর ভৌগোলিক বাস্তবতাও এই বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রামপুরা-বাড্ডা, কুড়িল বিশ্বরোড, ধানমন্ডি-মিরপুর রোড ও উত্তরা—এসব করিডোর ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বড় একটি অংশও এসব এলাকার আশপাশে অবস্থিত। ফলে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশ ও সংযোগপথে একই সময়ে আন্দোলনের উপস্থিতি তৈরি হয়।

১৭ জুলাই থেকে রামপুরা-বাড্ডা করিডোর অন্যতম সংঘর্ষপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ও রামপুরা ব্রিজ এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ব্যবহার করা হয়। হতাহত হয় অসংখ্য ছাত্র-জনতা। একই সময়ে কুড়িল বিশ্বরোডে নর্থ সাউথ, আইইউবি ও এআইইউবির শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়।

এ বিষয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি ও জুলাই গণ-আন্দোলনের রাজপথের অন্যতম নেতা মো. আবু হোরায়রা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘১৪ ও ১৫ জুলাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হামলার পর আন্দোলন অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছিল। তখন বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংগঠনিকভাবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হয়। প্রথম দিন বিভিন্ন ক্যাম্পাসে কয়েক ডজন শিক্ষার্থী কর্মসূচিতে অংশ নিলেও ১৭ জুলাই থেকে সেই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।’

এই ছাত্রনেতা বলেন, ‘১৮ জুলাই উত্তরা, কুড়িল, বসুন্ধরা, নতুন বাজার থেকে রামপুরা পর্যন্ত হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসে। তখনই আন্দোলনের কেন্দ্র ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে।’

এর মধ্যেই আন্দোলনের চরিত্রে আরেকটি পরিবর্তন দেখা যায়। রাজপথে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই ছিলেন না; বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষও তাদের পাশে দাঁড়াতে শুরু করেন। অনেকেই আহতদের আশ্রয় দেন, খাবার ও পানি পৌঁছে দেন। ছাত্র আন্দোলন ধীরে ধীরে বৃহত্তর সামাজিক সমর্থন পেতে শুরু করে।

দিনের রাজপথ, রাতের আতঙ্ক

১৭ জুলাইয়ের পর আন্দোলন শুধু দিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। দিনের বেলায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, মিছিল ও সড়ক অবরোধ চললেও রাত নামলেই শুরু হতো আরেক বাস্তবতা। গভীর রাতে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মেস, বাসা ও আবাসিক ভবনগুলোতে চালানো হতো ‘ব্লক রেইড’। সক্রিয় আন্দোলনকারীদের খুঁজে বের করা, গ্রেফতার কিংবা পরিবারের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা চলত বলে অভিযোগ করেন তারা।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান সমন্বয়ক আয়াতুল্লাহ বেহেশতী বলেন, ‘ব্লক রেইডের কথা আমরা প্রথম শুনেছিলাম কাশ্মীরের ঘটনাগুলোতে। পরে একই ধরনের অভিযান এখানে চালানো হয়। আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের ছবি সংগ্রহ করা হতো। কারও পরিবারের সদস্য পুলিশ, সেনাবাহিনী বা অন্য কোনো সরকারি বাহিনীতে থাকলে তাদের মাধ্যমে চাপ দেওয়া হতো। ওপর মহল থেকে ফোন করে বলা হতো, আপনার ছেলে বা ভাই আন্দোলনে আছে, তাকে সাবধান করুন।’

তার ভাষ্য, প্রতিদিনই ছিল চাপ, নজরদারি ও অনিশ্চয়তা। অনেক শিক্ষার্থী রাতে এক জায়গায় না থেকে বারবার আশ্রয় পরিবর্তন করেছেন। কেউ মেসে থাকেননি, কেউ পরিচিতজনের বাসায় রাত কাটিয়েছেন। তবু পরদিন আবারও রাজপথে ফিরেছেন।

'ভয় ছিল, কিন্তু আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার কথা ভাবিনি,' বলেন আয়াতুল্লাহ বেহেশতী।
আত্মগোপনে থেকেই আন্দোলনের সমন্বয় করার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন ছাত্রদল নেতা আবু হোরায়রা বলেন, ‘ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার পর যোগাযোগ রক্ষা করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নজরদারি এড়াতে একাধিক সিম ও সাধারণ বাটন ফোন ব্যবহার করছি। কয়েক কিলোমিটার পরপর অবস্থান বদলে কিংবা নির্জন এলাকায় গিয়ে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি।’ গ্রেফতার এড়িয়ে আন্দোলনের সমন্বয় চালিয়ে যাওয়াই তখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল বলেও জানান এই জুলাইযোদ্ধা।

বিকেন্দ্রীভূত নেতৃত্বে নতুন গতি

১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো খালি হয়ে যাওয়ার পর আন্দোলনের ধরনেও পরিবর্তন আসে বলে মনে করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কারীরা। তাদের মতে, নেতৃত্ব তখন একটি নির্দিষ্ট ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে।

আয়াতুল্লাহ বেহেশতী বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল খালি হওয়ার পর আন্দোলনের নেতৃত্ব অনেকটাই বিকেন্দ্রীভূত হয়ে যায়। প্রতিটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় একেকটি প্রতিরোধকেন্দ্রে পরিণত হয়। এই বিকেন্দ্রীভূত কাঠামো আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’
রামপুরা, বাড্ডা, বসুন্ধরা, কুড়িল, ধানমন্ডি ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ উদ্যোগে কর্মসূচি সমন্বয় করছিলেন। কোথাও কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশনার অপেক্ষা ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেঞ্জার গ্রুপ ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো কোথায় অবস্থান হবে, কোথায় মিছিল যাবে কিংবা কোথায় সহায়তা প্রয়োজন।

‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ও আন্দোলনের বিস্তার

১৮ জুলাই ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে একই সময়ে অবস্থান নেওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থায় বড় প্রভাব পড়ে। প্রশাসনকে একাধিক স্থানে সমান্তরালভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়।

এই পর্যায়ে আন্দোলনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততাও বাড়তে থাকে। বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা আন্দোলনকারীদের জন্য খাবার, পানি ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। আহতদের আশ্রয় দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। ফলে আন্দোলনটি কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর সামাজিক সমর্থন পেতে শুরু করে।

কেন নেমেছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর সরকারি চাকরির কোটাব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্টতা ছিল না। তবু তারা রাজপথে নেমেছিলেন।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘পুসাব’-এর নেতারা বলেন, তাদের অংশগ্রহণের পেছনে ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের প্রশ্ন ছিল না। নাগরিক দায়িত্ববোধ, ন্যায়বিচারের দাবি এবং সহিংসতার প্রতিবাদ থেকেই তারা আন্দোলনে যুক্ত হন।

তারা বলেন, আমরা কোটার সুবিধাভোগী ছিলাম না। কিন্তু সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে সহিংসতার প্রতিবাদ জানানো নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব ছিল।

আবু হোরায়রার মতে, ১৮ জুলাইয়ের পর আন্দোলন আর কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজধানীর বিভিন্ন জোনের পাশাপাশি রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও সিলেটেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামেন। এতে আন্দোলনের ভৌগোলিক বিস্তার যেমন বাড়ে, তেমনি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও বাড়তে থাকে।

এই অংশগ্রহণই আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তিকে আরও বিস্তৃত করে। পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাজন পেরিয়ে শিক্ষার্থীরা একটি অভিন্ন পরিচয়ে রাজপথে দাঁড়ান প্রতিবাদী নাগরিক হিসেবে।

জুলাই গণআন্দোলনের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম নেতা আবু হোরায়রা বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার পরই আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায়।’ 

আন্দোলনের মোড় কেন ঘুরেছিল

জুলাই আন্দোলনের গতিপথে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণকে কেন টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখা হয়, এ প্রশ্নে আন্দোলনসংশ্লিষ্টদের মূল্যায়নে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে।
প্রথমত, আন্দোলনের ভৌগোলিক বিস্তার। এর আগে কর্মসূচির প্রধান কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকা। ১৬ জুলাইয়ের পর রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা, বসুন্ধরা, কুড়িল, ধানমন্ডি, উত্তরাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ করিডোরে একই সময়ে আন্দোলন গড়ে ওঠে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভিন্ন স্থানে একযোগে মোতায়েন হতে হয়।

দ্বিতীয়ত, আন্দোলনের নেতৃত্ব বিকেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে কর্মসূচি পরিচালনা করেন। ফলে কোনো একটি কেন্দ্রকে বিচ্ছিন্ন করে আন্দোলন থামিয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে ওঠে।

তৃতীয়ত, আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি বিস্তৃত হয়। পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে রাজপথে নামায় অভিভাবক, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের সমর্থনও বাড়তে থাকে। একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের বিভিন্ন ছবি, ভিডিও ও তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা দেশ-বিদেশে ঘটনাপ্রবাহের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

দুই বছর পরের মূল্যায়ন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা অনেক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, আন্দোলনের সময় তাদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেই অবদানের প্রতিফলন দেখা যায়নি।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান সমন্বয়ক আয়াতুল্লাহ বেহেশতী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ ছাড়া এই আন্দোলন সফল হতো না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে সেই অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।’

একই ধরনের মূল্যায়ন করেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) সাবেক সমন্বয়ক ওয়াসিফ তাজওয়ার। তিনি বলেন, ‘কিছু ব্যক্তি পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু রাজনীতির মৌলিক সংস্কৃতি খুব একটা বদলায়নি। জুলাই আন্দোলনের সময় যে সংস্কার ও রাষ্ট্র পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলাম, তার বড় অংশই এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।’

তবে আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই মনে করেন, জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল একটি নতুন নাগরিক চেতনার জন্ম। সরকারি কিংবা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় ছাপিয়ে শিক্ষার্থীরা একটি অভিন্ন দাবিতে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন।

এমএইচ/জেবি