Dhaka Mail Logo

শিক্ষা

একাডেমিক উৎকর্ষ ও শতভাগ আবাসিক ক্যাম্পাস গঠন করতে চাই: মেবি উপাচার্য

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

২৬ জুন ২০২৬, ১২:৫০ পিএম

ঐতিহাসিক মেহেরপুর অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাত্রা শুরু করেছে মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের এই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী জেলাটির শিক্ষা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বিকাশে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি বিশ্বমানের বিদ্যাপীঠ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন নবনিযুক্ত উপাচার্য। তার দীর্ঘ তিন দশকের শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি আধুনিক, গবেষণামুখী ও সুশৃঙ্খল ক্যাম্পাস হিসেবে রূপ দেওয়ার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন তিনি।

​সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভিশন, স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের চ্যালেঞ্জ, আসন সংখ্যা, নতুন বিভাগ খোলা এবং শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানসহ নানাবিধ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন নবনিযুক্ত উপাচার্য ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. তোজাম্মেল হোসেন। তার সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাঠকদের জন্য প্রশ্নোত্তর আকারে তুলে ধরেছেন ঢাকা মেইলের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক রাকিব রিফাত।

জমি অধিগ্রহণ ও মাস্টার প্ল্যানই এখন প্রধান লক্ষ্য

​প্রশ্ন: নতুন উপাচার্য হিসেবে মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপনার প্রধান লক্ষ্য ও পরিকল্পনা কী?

উপাচার্য: আমার প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ এবং একটি আধুনিক ‘মাস্টার প্ল্যান’ (মূল পরিকল্পনা) প্রণয়ন করা। এই দুটি মৌলিক কাজ ছাড়া নতুন কোনো পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ইতোমধ্যেই আমরা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সঙ্গে বৈঠক করে মেহেরপুর শহরের নিকটবর্তী একটি এলাকায় ১০০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রাথমিক অনুমোদন পেয়েছি। এখন এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

​প্রশ্ন: স্থায়ী ক্যাম্পাস তৈরি হতে তো সময় লাগবে, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে চলবে?

উপাচার্য: আমরা ক্লাস, ডিন ও চেয়ারম্যানদের অফিস এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে পরিচালনার জন্য একটি ভবন দেখেছি। ভবনের মালিকের সঙ্গেও আমাদের কথা হয়েছে। বর্তমানে ভবনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযোগী করে নতুন করে সাজানোর কাজ চলছে।

২০২৬-২৭ সেশন থেকেই ভর্তি কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা

​প্রশ্ন: মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ভর্তি প্রক্রিয়া কবে নাগাদ শুরু হতে পারে?

উপাচার্য: সরকার ইতোমধ্যেই দুটি বিভাগের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে। বিভাগ দুটি হলো— কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE) এবং ইংরেজি (English)। আমরা যদি আগামী সেশনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ক্লাসরুম, ল্যাব ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারি, তবে ২০২৬-২৭ সেশন থেকেই শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারব। সেই লক্ষ্যেই আমাদের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।

​প্রশ্ন: প্রথম ব্যাচে প্রতি বিভাগে কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতে পারে?

উপাচার্য: নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের আসন সংখ্যা ৪০-এর বেশি দেওয়া হয় না। তবে চূড়ান্ত আসন সংখ্যা কত হবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।

শতভাগ আবাসিক ও আন্তর্জাতিক মানের ক্যাম্পাস

​প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন ও পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

উপাচার্য: আমি মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আদর্শ ‘অ্যাকাডেমিক অ্যান্ড রেসিডেনসিয়াল’ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আমাদের মাস্টার প্ল্যানে শতভাগ আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে, যেন কোনো শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকতে না হয়। শুধু শিক্ষার্থীই নয়; শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্যও ক্যাম্পাসের ভেতরেই আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে।

​প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসটি কোথায় হচ্ছে?

উপাচার্য: অনলাইনে মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস হিসেবে মুজিবনগরের কথা শোনা গেলেও, মূলত শহরের কাছাকাছি এলাকায় এটি স্থাপনের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা এমন একটি স্থান নির্বাচন করছি যা শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়, আবার একবারে শহরের ভেতরেও নয়; যেন শিক্ষার্থীরা সহজে যাতায়াত করতে পারে।

​প্রশ্ন: বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি বা আন্তর্জাতিকীকরণের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

উপাচার্য: যেহেতু এটি একদম নতুন বিশ্ববিদ্যালয় এবং অবকাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি, তাই শুরুতেই আমরা বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির কথা ভাবছি না। বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চমানের নিরাপত্তা ও উন্নত আবাসন নিশ্চিত করা জরুরি। আমাদের নিজস্ব স্থায়ী ভবন এবং আবাসিক হল তৈরি হয়ে গেলে আমরা বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির উদ্যোগ নেব।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ ও মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ

​প্রশ্ন: আধুনিক গবেষণাগার ও লাইব্রেরি নিয়ে আপনার বিশেষ পরিকল্পনা কী?

উপাচার্য: আমরা এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে রয়েছি। আমাদের শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ও গবেষণাগার গড়ে তোলা হবে। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পাশাপাশি প্রতিটি বিভাগে ছোট লাইব্রেরি থাকবে। একই সঙ্গে আধুনিক বইপুস্তক এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট সম্বলিত ‘ই-লাইব্রেরি’ ব্যবস্থা চালু করা হবে।

​প্রশ্ন: শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আপনারা কোন বিষয়টিকে প্রাধান্য দেবেন?

উপাচার্য: শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার সর্বোচ্চ মানদণ্ড রক্ষা করা হবে। একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান শর্তই হলো ভালো শিক্ষক। অ্যাকাডেমিক স্টাফ যদি মানসম্মত না হয়, তবে কখনোই ভালো শিক্ষার্থী বা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা সম্ভব নয়। আমরা যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দেশের উপযুক্ত এবং বহির্বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী গড়ে তুলব।

​প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণামুখী করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে?

উপাচার্য: বর্তমান সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য বাজেট বাড়াচ্ছে এবং অত্যন্ত আন্তরিক। আমরা সরকারের এই উদ্যোগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করব। শিক্ষার্থীরা যেন দেশ-বিদেশের সমসাময়িক জ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক বিকাশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারে, সেই মানের পরিবেশ তৈরি করা হবে।

কৃষি অনুষদ ও শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান

​প্রশ্ন: মেহেরপুর অঞ্চলের উন্নয়নে এই বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে ভূমিকা রাখবে?

উপাচার্য: মেহেরপুর একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল এবং এখানে প্রচুর শস্য উৎপাদিত হয়। এই অঞ্চলের অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে এবং কৃষি খাতের উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার প্ল্যানে একটি কৃষি অনুষদ (Faculty of Agriculture) খোলার প্রবল ইচ্ছা আমার আছে। এ ছাড়া ঐতিহাসিক মেহেরপুরের যে দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে, তা বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে এই বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করবে।

​প্রশ্ন: শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে কোনো বিশেষ পরিকল্পনা আছে কি?

উপাচার্য: বিশ্ববিদ্যালয় যেন কোনোভাবেই ‘বেকারের কারখানা’ না হয়, সেদিকে আমাদের কড়া নজর থাকবে। আমরা কারিকুলাম এমনভাবে সাজাচ্ছি যেন শিক্ষার্থীরা পড়ার সময়ই চাকরির বাজারের উপযোগী হয়ে ওঠে। পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুর, কারিগরি ট্রেনিং এবং এক্সট্রা-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজের মাধ্যমে তাদের দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে, যাতে পাস করার পর তাদের বেকার বসে থাকতে না হয়।

ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও বিশেষত্ব

​প্রশ্ন: অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষত্ব কোথায় থাকবে?

উপাচার্য: আমার দীর্ঘ তিন দশকের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এই ক্যাম্পাসটিকে একটি সুশৃঙ্খল অ্যাকাডেমিক পরিবেশ ও নয়নাভিরাম রূপ দিতে চাই। আমাদের প্রস্তাবিত ক্যাম্পাসের ভেতর একটি প্রাকৃতিক খাল রয়েছে। এই খালটিকে কেন্দ্র করে আমরা একটি চমৎকার বিনোদন পার্ক বা পর্যটন এলাকা গড়ে তুলব, যা শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান হবে। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশের অন্যতম শীর্ষ ও প্রতিষ্ঠিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখতে চাই।

​প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এমন কী করে যেতে চান, যার জন্য সবাই আপনাকে চিরদিন মনে রাখবে?

​উপাচার্য: আমি মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদম সূচনালগ্নে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। শুরুতেই অত্যন্ত যোগ্য শিক্ষক এবং দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে আমি একটি শক্ত প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভিত্তি তৈরি করতে চাই।

​সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো-ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে একটি নয়নাভিরাম ক্যাম্পাস গড়ে তোলা এবং সবার জন্য শতভাগ আবাসন নিশ্চিত করা। এই রূপরেখা ও পরিকল্পনাগুলো যদি সহিহ-সালামতে বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে এই বিশ্ববিদ্যালয় যতদিন থাকবে, ইনশাআল্লাহ সবাই আমাকে চিরদিন মনে রাখবে।

প্রতিনিধি/এফএ