নিজস্ব প্রতিবেদক
০২ জুন ২০২৬, ০৯:০৬ পিএম
মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা, সৃজনশীলতা ও গবেষণামুখী দক্ষতা বিকাশে শুরু হচ্ছে জাতীয় পর্যায়ের স্টার্টআপ, বিজ্ঞান প্রকল্প ও ইনোভেশন আইডিয়া প্রতিযোগিতা।
দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার গণ্ডি থেকে বের করে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা ও উদ্ভাবনী দক্ষতা বিকাশের লক্ষ্যে স্কুল-কলেজে শুরু হতে যাচ্ছে ‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট ও ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং’ প্রতিযোগিতা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অধীন ‘এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিম’-এর উদ্যোগে আগামী ১২ জুন থেকে দেশব্যাপী মাঠপর্যায়ে এ মেধা অন্বেষণ কার্যক্রম শুরু হবে।
ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বাছাই শেষে নির্বাচিত সেরা দলগুলো ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় পর্যায়ের মূল পর্বে অংশ নেবে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থেকে সেরা ১০টি দলকে বিশেষ পুরস্কার প্রদান করবেন।
মঙ্গলবার (২ জুন) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উন্নয়ন-১ শাখা থেকে সিনিয়র সহকারী সচিব জাবের মো. সোয়াইব স্বাক্ষরিত এক সরকারি পরিপত্রে কর্মসূচির নির্দেশনা সংশোধন ও অধিকতর স্পষ্ট করা হয়েছে।
পরিপত্র অনুযায়ী, দেশের সব উপজেলা এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা মহানগরীর আওতাধীন শিক্ষা থানাগুলোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—স্কুল, স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কলেজ ও মাদরাসা—এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির যে কোনো শিক্ষার্থী এতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।
আগামী ১২ জুন দেশব্যাপী উপজেলা ও মহানগরীর শিক্ষা থানা পর্যায়ে এবং ১৪ জুন জেলা পর্যায়ে শোকেসিং প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তিনজন শিক্ষার্থী ও দুইজন শিক্ষকের সমন্বয়ে এক বা একাধিক দল গঠন করে স্টার্টআপ, বিজ্ঞান প্রকল্প কিংবা ইনোভেশন আইডিয়া—এই তিনটি ক্যাটাগরির যেকোনো একটিতে নিজেদের প্রকল্প উপস্থাপন করতে পারবে।
জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে বিচারকদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সেরা ১০টি দল সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বিশেষ পুরস্কার গ্রহণ করবে। তবে পুরস্কারের পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীদের জন্য আর্থিক প্রণোদনাও রাখা হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেওয়া প্রত্যেক শিক্ষার্থী ‘উদ্ভাবনী মেধাবী শিক্ষার্থী পুরস্কার’ হিসেবে সনদপত্রের পাশাপাশি এককালীন ২০ হাজার টাকা পাবে, যা সরাসরি তাদের ব্যাংক হিসাব নম্বরে পাঠানো হবে।
একইভাবে, উপজেলা পর্যায় থেকে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেওয়া প্রতিটি শিক্ষক ‘সুশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষক পুরস্কার’ হিসেবে সনদপত্র ও নগদ ৩০ হাজার টাকা পাবেন।
প্রতিযোগিতার কাঠামো অনুযায়ী, উপজেলা বা থানা পর্যায়ের নির্ধারিত কমিটি প্রথমে প্রদর্শিত প্রকল্পগুলোর মধ্য থেকে সেরা তিনটি দলকে পুরস্কৃত করবে। এরপর প্রতি উপজেলা থেকে প্রথম স্থান অধিকারী একটি দল এবং চার মহানগরীর ২৫টি শিক্ষা থানার প্রতিটির প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দুটি করে দল জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে।
১৪ জুন অনুষ্ঠিত জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান নির্ধারণ করে পুরস্কার দেওয়া হবে। জেলা পর্যায়ে প্রথম স্থান অধিকারী দল জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। তবে বিশেষ বিবেচনায় রংপুর, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ, বগুড়া, পাবনা, দিনাজপুর, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা ও যশোর জেলা থেকে সেরা দুটি করে দল এবং ঢাকা মহানগরী থেকে ১৬টি, চট্টগ্রাম থেকে পাঁচটি এবং রাজশাহী ও খুলনা মহানগরী থেকে দুটি করে দল সরাসরি জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করবে।
জেলা কমিটির বাজেট থেকে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর ঢাকায় যাতায়াত ভাতা প্রদান করা হবে। অন্যদিকে, জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীদের আবাসন ও আনুষঙ্গিক ব্যয় বহন করবে কেন্দ্রীয় স্কিম। জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরসহ চূড়ান্ত বিজয়ী দলগুলোর তথ্য আগামী ১৬ জুনের মধ্যে নির্ধারিত ই-মেইল ঠিকানায় পাঠাতে বলা হয়েছে।
প্রতিযোগিতার ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের ছোট-বড় সমস্যার সমাধানভিত্তিক টেকসই ও কার্যকর ধারণা তৈরিতে উৎসাহিত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
‘স্টার্টআপ’ ক্যাটাগরিতে শিক্ষার্থীরা স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে লাভজনক ও সমাজ-সহায়ক ব্যবসায়িক মডেল উপস্থাপন করবে। উদাহরণ হিসেবে হাওর অঞ্চলের ধান কাটার যন্ত্র, বই বিনিময় অ্যাপ কিংবা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
‘বিজ্ঞান প্রকল্প’ ক্যাটাগরিতে পাঠ্যবইয়ের তত্ত্বের ব্যবহারিক প্রয়োগ ও প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। এর মধ্যে কম খরচে পানি পরিশোধন যন্ত্র বা দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের মডেল অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
অন্যদিকে, ‘ইনোভেশন আইডিয়া’ ক্যাটাগরিতে মানুষের কষ্ট ও শ্রম কমাতে সক্ষম সহজ, সৃজনশীল এবং বাস্তবায়নযোগ্য ধারণা উপস্থাপন করতে হবে। পরিবেশবান্ধব প্লাস্টিকের বিকল্প কিংবা ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এ ধরনের উদ্ভাবনের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল উপকরণের পরিবর্তে বর্জ্য বা সহজলভ্য সামগ্রী ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিচারকদের সামনে এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যে প্রকল্পের মূল ধারণা স্পষ্টভাবে উপস্থাপনের প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে।
কারা থাকছেন কমিটিতে, কেমন বাজেট?
প্রতিযোগিতা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে তিন স্তরের কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সভাপতি এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সভাপতি এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সদস্য সচিব থাকবেন।
চার মহানগরীর থানা পর্যায়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের আঞ্চলিক উপপরিচালক (কলেজ) সভাপতি এবং থানা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটিতে স্থানীয় সরকারি কলেজ ও স্কুলের শিক্ষক এবং শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদেরও সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রয়োজনীয় অর্থ সরাসরি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হবে। বাজেট অনুযায়ী, প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ের প্রোগ্রামের জন্য এক লাখ টাকা এবং মহানগরী থানা পর্যায়ের জন্য এক লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
জেলা পর্যায়ের বাজেটে ঢাকার জন্য ২ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা, চট্টগ্রামের জন্য ২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা, রাজশাহী ও খুলনার জন্য ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫০০ টাকা এবং অন্যান্য জেলার জন্য আকারভেদে ১ লাখ ৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই অর্থ থেকে আপ্যায়ন, মধ্যাহ্নভোজ, ভেন্যু ব্যবস্থাপনা, স্টল নির্মাণ, ট্রফি ও ক্রেস্ট প্রদান এবং অংশগ্রহণকারীদের যাতায়াত ভাতার ব্যয় নির্বাহ করা হবে।
চূড়ান্ত পর্বে ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মূল অনুষ্ঠানের আগের দিন বিকেলে শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীদের প্রকল্প প্রদর্শনীর মহড়া অনুষ্ঠিত হবে। আর মূল অনুষ্ঠানের দিন প্রধানমন্ত্রী নিজে এসব উদ্ভাবনী প্রকল্প পরিদর্শন করবেন বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এম/এএইচ