images

শিক্ষা

ঢাবিতে জমিদারি বিলুপ্ত দিবসে ‘মুক্তি উৎসব’, ব্রিটেনের বিচার দাবি 

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৬ মে ২০২৬, ০৯:০৭ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ঐতিহাসিক বটতলায় এক ব্যতিক্রমী ‘মুক্তি উৎসব’ আয়োজনে ৭৬তম জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত দিবস পালিত হয়েছে। 

বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের উদ্যোগে উৎসবে একদিকে জমিদারী নিপীড়নবিরোধী শহীদ ও বিপ্লবী নেতাদের শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। আরেকদিকে জমিদারী প্রথার প্রবর্তক লর্ড কর্নওয়ালিসের প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছে। জমিদার নিয়োগ করে ভারতীয় উপমহাদেশের সম্পদ লুট ও পাচার করায় ব্রিটেনের বিচার ও তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবি জানানো হয়েছে। 

শুক্রবার (১৫ মে) সকাল থেকেই বটতলা প্রাঙ্গণে এক উৎসবমুখর অথচ গভীর প্রতিবাদের সুর বেজে ওঠে।  অনুষ্ঠানে হাতে রক্তের ছাপ এঁকে জমিদারী নিপীড়ন বিরোধী শহীদদের স্মরণ করা হয়। 

গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয় দুই দশক ব্যাপী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা ও জমিদারী লড়াইয়ের নেতা ফকির মজনু শাহ, পণ্ডিত ভবানীচরণ পাঠক, বাবা তিলকা মাঝি, ফকির করম শাহ, টিপু শাহ, জানকুপাথর, দোবরাজপাথর, সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ, মুহাম্মদ মুহসীনউদ্দীন দুদু মিয়া, খুদি মোল্লা, শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দিন ও মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে।

উৎসবে এক প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে জমিদারী প্রথার প্রবর্তক লর্ড কর্নওয়ালিসের প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপ করা হয়, যা বাংলাদেশের ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও অসম্মতি জ্ঞাপনকে তুলে ধরে।

অনুষ্ঠানস্থলে জমিদারী নিপীড়ন বিষয়ক চিত্র ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এই প্রদর্শনীতে প্রজাদের উপর জমিদারদের চাপানো ১৮ দফা নিপীড়ন এবং এজন্য ব্যবহৃত অস্ত্রের তালিকা তুলে ধরা হয়। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে আসা ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের তাদের শিক্ষকরা চিত্র ও প্ল্যাকার্ডগুলোর ইতিহাস বুঝিয়ে দেন। বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শাসনামলে সাধারণ মানুষের উপর জমিদারদের বর্বর অত্যাচারের করুণ ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। শিক্ষকদের বর্ণনা শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি উপস্থিত দর্শকদের গভীরভাবে নাড়া দেয়।

মুক্তি উৎসবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ১৯০ বছর দীর্ঘ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন ও দুর্ভিক্ষের ইতিহাস স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠ্যক্রমভুক্ত করার আহ্বান। 

এছাড়া বাংলাদেশের জনগণকে নির্যাতনে জড়িত জমিদারদের তালিকা প্রণয়ন করে স্বাধীন দেশে তাদের নামে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থান ও রাস্তাঘাটের নাম বাতিল করার জোর দাবি জানানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দেওয়া হয় কার্জন হল থেকে লর্ড কার্জনের নাম বাদ দেওয়ার।

এদিকে ঔপনিবেশিক শাসন জারি করে হত্যা-নির্যাতনের মাধ্যমে সম্পদ লুট ও জমিদারীর নামে বাংলাদেশের জনগণকে ভয়াবহ নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে ঠেলে দেওয়ার জন্য ব্রিটেনকে বিচারের মুখোমুখি করে ক্ষতিপূরণ আদায়ে সরকারকে আহ্বান জানানো হয়।
 
উৎসবে বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল ওয়াহেদ ও সহকারী সদস্য সচিব মো. আরিফুল ইসলামের পরিচালনায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, নবাব সলিমুল্লাহ একাডেমীর চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার ও জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান। 

কর্মসূচিতে অতিথি ছিলেন জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক সাইয়েদ কুতুব ও সহকারী সদস্য সচিব গালীব ইহসান, সদস্য মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম ও সাইফুল ইসলাম।

ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম বলেন, জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত করার জন্য এ দেশে অনেক আন্দোলন হয়েছে। তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহসহ অনেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সর্বশেষ শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। তাদের সাফল্য থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে যে দেশে চালু হওয়া নব্য জমিদারী প্রথাও বিলুপ্ত হবে। জনপ্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্বসহ কোনো ক্ষেত্রেই জমিদারি চলবে না।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক ও তাদের দোসর জমিদারদেরসহ দেশের অতীতের সব ইতিহাস চর্চার জন্য সরকারের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।

আব্দুল জব্বার বলেন, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণ্য ছিল জমিদারী প্রথার প্রবর্তক লর্ড কর্নওয়ালিস। সে সূর্যাস্ত আইন করে মুসলমান জমিদারদের পথের ফকির বানিয়ে তাদের হিন্দু নায়েব গোমস্তাদের হাতে জমিদারী তুলে দিয়েছিল।
 
খোমেনী ইহসান বলেন, জমিদারী প্রথা ছিল শোষণ নিপীড়ন ও বৈষম্যমূলক। আমাদের পূর্ব পুরুষরা ১৯৩ বছর লড়াই করে এ প্রথা উচ্ছেদ করেছে। একইভাবে চাকরিতে কোটা প্রথাও ছিল বৈষম্যমূলক। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে কোটা প্রথা বাতিল হয়েছে। কিন্তু জনগণ পুরোপুরি বৈষম্য থেকে মুক্তি পায়নি। চূড়ান্ত ইনসাফ ও মুক্তি পেতে হলে বৈষম্যমূলক বর্তমান সংবিধান, ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র ও লুটপাটের অর্থনীতি বদলাতে হবে।

জমিদারদের নিপীড়নে শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনা ও জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় মহান আল্লাহর শোকরিয়া আদায়ে বিশেষ দোয়া মাহফিলের মধ্য দিয়ে ‘মুক্তি উৎসব’ শেষ হয়। 

ক.ম/