images

শিক্ষা

স্মৃতির আয়নায় গ্রামবাংলা, বাকৃবির অনন্য কৃষি জাদুঘর

০৬ মে ২০২৬, ১২:১৫ পিএম

জাদুঘর মানেই ইতিহাস, ঐতিহ্য আর হারিয়ে যাওয়া সময়কে নতুন প্রজন্মের সামনে জীবন্ত করে তোলা। তবে বাংলাদেশের কৃষি ইতিহাস, কৃষকের জীবনসংগ্রাম, প্রাচীন কৃষিযন্ত্র ও গ্রামীণ সংস্কৃতিকে একসঙ্গে ধারণ করার মতো আয়োজন খুব বেশি নেই।

সেই শূন্যতা পূরণ করে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে আছে দেশের প্রথম ও একমাত্র পূর্ণাঙ্গ কৃষি জাদুঘর। সবুজ ছায়াঘেরা দেবদারু গাছের শান্ত পরিবেশে, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) সামনে অবস্থিত এই জাদুঘরে প্রবেশ করলেই ফিরে যেতে হয় বাংলার সেই কৃষিনির্ভর অতীতে; যেখানে কৃষকের ঘাম, মাটির গন্ধ আর গ্রামীণ জীবনের আবেগ মিশে আছে প্রতিটি উপকরণে। শহুরে কোলাহল পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই যেন অনুভূত হয় ঢেঁকির শব্দ, হারিকেনের ম্লান আলো আর হালচাষে ব্যস্ত কৃষকের চিরচেনা জীবনচিত্র।

বাংলার কৃষি সভ্যতার এক জীবন্ত দলিল হয়ে ওঠা এই জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে প্রাচীন কৃষিযন্ত্র, বিরল প্রজাতির ধান, গ্রামীণ সংস্কৃতির উপকরণ, লোকবাদ্য, প্রাণীর কঙ্কাল ও কৃষিজ রোগের নমুনা থেকে শুরু করে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির নানা উপাদান। প্রায় পাঁচ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা অষ্টভুজ আকৃতির দৃষ্টিনন্দন ভবনটি যেন অতীত ও বর্তমান কৃষির এক সেতুবন্ধন। এখানে ঢেঁকি, কুলা, লাঙল, জোয়াল, গরুর গাড়ি, নকশিকাঁথা ও একতারা যেমন গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়, তেমনি পাওয়ার টিলার, সিড ড্রিল ও সয়েল টেস্টিং কিট শোনায় আধুনিক কৃষির অগ্রযাত্রার গল্প। কৃষি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির এই অনন্য সমন্বয় নতুন প্রজন্মকে শেকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি গবেষণা, জ্ঞানচর্চা ও বিনোদনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বুকে কৃষি ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের স্বপ্ন একসময় লালন করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ হোসেন। কৃষিনির্ভর বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের নিদর্শনগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার সেই লক্ষ্য থেকেই শুরু হয় কৃষি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। এর ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালের ২৪ জানুয়ারি তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মু. মুস্তাফিজুর রহমান জাদুঘরটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে ২০০৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করেন। যদিও জনবল সংকট ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু সময়ের জন্য এর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছিল, তবুও সেই মহতী উদ্যোগ থেমে থাকেনি। অবশেষে ২০০৭ সালের ৩০ জুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোশাররফ হোসাইন মিঞার হাত ধরে জাদুঘরটি আবারও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হয়।

ভবনের মাঝখানে রয়েছে একটি উন্মুক্ত বাগান, যেখানে প্রাকৃতিক আলো এসে পুরো পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। জাদুঘরের প্রবেশমুখেই দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায় বাহারি মাছের অ্যাকুরিয়াম এবং কৃষিজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ 'খনার বচন'। দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে কৃষি উন্নয়নে অবদান রাখা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের ছবি।

t

জাদুঘরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রদর্শনী কক্ষে রয়েছে কৃষি ও প্রকৃতিবিষয়ক বিস্ময়কর সংগ্রহ। এখানে দেখা যায় বিভিন্ন অঞ্চলের মাটির নমুনা, দেশি-বিদেশি ধান ও ফসলের বীজ, পাট, ডাল, সরিষা, ভুট্টা, বাদাম, তিসি, কাউন ও শাকসবজির বীজ। প্রতিটি সংগ্রহের পাশে স্থানীয় নাম, বৈজ্ঞানিক নাম, ব্যবহার ও সংগ্রহের উৎস উল্লেখ করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হলো বিরল প্রজাতির ধান—যেমন: গোবিন্দভোগ, চিনিসাগর, কালামানিক, নাজিরশাইল, মধুমালতি ও রাধুনীপাগল।

এই কক্ষগুলোতে আরও রয়েছে ফসলের বিভিন্ন রোগের নমুনা, তেলবীজ, ওষুধি গাছ, মসলা এবং ফরমালিনে সংরক্ষিত মাছের সংগ্রহ। তেলাপিয়া, বোয়াল, আইড়, পাবদা, গলদা চিংড়ি থেকে শুরু করে বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন মাছ এখানে সংরক্ষিত। এছাড়া অজগর সাপের কঙ্কাল, প্লাটিপাস, হরিণের শিং, মহিষের শিং, গুইসাপ, কচ্ছপের খোলস ও বিশালাকৃতির শকুনের সংরক্ষিত মডেল দর্শনার্থীদের বিস্মিত করে।

তৃতীয় প্রদর্শনী কক্ষে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে বাংলার হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ জীবন। এখানে সাজানো রয়েছে ঢেঁকি, কুলা, হুক্কা, পানের ডাবর, হারিকেন, কুপি বাতি, গরুর গাড়ির মডেল, শীতল পাটি, হোগলা পাটি এবং গ্রামীণ বাদ্যযন্ত্র—একতারা, দোতারা, বেহালা, তবলা, করতাল ও হারমোনিয়াম। এই কক্ষেই রয়েছে গিলা, আদুরী, ডামা ও নাতকের মতো বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত গ্রামীণ উপকরণ।

চতুর্থ কক্ষে স্থান পেয়েছে কৃষিকাজে ব্যবহৃত প্রাচীন ও আধুনিক যন্ত্রপাতি। দা, কোদাল, লাঙল, জোয়াল, মই, শাবল, ধনুক-তীরের পাশাপাশি রয়েছে পুরোনো মাইক্রোকম্পিউটার, টাইপরাইটার ও ইপিস্কোপ। পঞ্চম প্রদর্শনী কক্ষটি যেন একটি 'ক্ষুদ্র গ্রামবাংলা'। এখানে কৃষকের বসতবাড়ির পূর্ণাঙ্গ মডেল, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, লাঙল দিয়ে হালচাষ, ধান মাড়াই, পালকি ও গরুর গাড়ির দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে।

ষষ্ঠ ও শেষ প্রদর্শনী কক্ষে রয়েছে আধুনিক কৃষিযন্ত্র ও প্রযুক্তির সমাহার। পাওয়ার টিলার, ধান মাড়াই যন্ত্র, স্প্রে মেশিন, সিড ড্রিল ও সয়েল টেস্টিং কিটের পাশাপাশি প্রদর্শিত হয়েছে নকশিকাঁথা, গারো সম্প্রদায়ের পোশাক ও ঐতিহ্যবাহী ঘানি। বাঁশ, বেত, কাঠ, লোহা, তামা ও মাটির তৈরি প্রায় সাত শতাধিক উপকরণ এখানে সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষিত।

ইতিহাস আর ঐতিহ্যের এমন এক বিশাল ভাণ্ডারে প্রবেশ করতে দর্শনার্থীদের কোনো প্রবেশমূল্য দিতে হয় না। সপ্তাহের কর্মদিবসগুলোতে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাদুঘরটি সবার জন্য খোলা থাকে।

জাদুঘর ঘুরতে আসা দর্শনার্থী তাজিয়া আহমেদ বলেন, ‘এখানে এসে মনে হয়েছে যেন বইয়ের পাতার পুরোনো গ্রামবাংলা বাস্তবে চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শহরে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের জন্য এই জাদুঘর খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ বাকৃবির কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী জয় বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তির এই সময়ে অনেক প্রাচীন কৃষিযন্ত্র এখন আর চোখে দেখা যায় না। এখানে সেগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ হওয়ায় কৃষির অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটা বাস্তব সংযোগ তৈরি হয়েছে।’

krishi-musiam-2

প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকতার এই দ্রুত বদলে যাওয়া সময়ে বাকৃবির কৃষি জাদুঘর যেন শেকড়ে ফেরার এক নীরব আহ্বান। এটি আজ শুধু একটি প্রদর্শনশালা নয়, বরং বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গ্রামবাংলার আত্মার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

প্রতিনিধি/একেবি