বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০৮ পিএম
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হলেও অগ্নি নিরাপত্তার চরম অব্যবস্থাপনায় কার্যত ঝুঁকির মুখে পুরো ক্যাম্পাস। আবাসিক হল থেকে শুরু করে একাডেমিক ভবন অধিকাংশ স্থাপনাতেই নেই কার্যকর অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কিংবা নিয়মিত ফায়ার ড্রিল। ফলে যেকোনো সময় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির শঙ্কা তৈরি হয়েছে; ঝুঁকিতে রয়েছেন প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী।
আবাসিক হল, একাডেমিক ভবন ও কোয়ার্টারসহ অর্ধশতাধিক ভবনের এই বিশাল ক্যাম্পাসে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার এমন দুর্বলতা শুধু অব্যবস্থাপনাই নয়, বরং বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ৩ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের একটি কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পুরো ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা জনসমক্ষে নিয়ে আসে। সে সময় উপস্থিত দর্শন বিভাগের ৫৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জোবায়ের আহমেদ বলেন, ‘ঘটনার পরপরই আমি বিভাগ, রেজিস্টার বিল্ডিং ও নতুন হলসহ বিভিন্ন স্থানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের জন্য ছুটোছুটি করি। কিন্তু এক দপ্তর থেকে অন্য দফতরে ঘুরেও কোথাও কোনো যন্ত্র খুঁজে পাইনি, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’
অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম না থাকায় শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরাই নিজস্ব প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এই ঘটনাই পুরো ক্যাম্পাসের অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মীর মশাররফ হোসেন হল, আ ফ ম কামাল উদ্দিন হল, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল, শহীদ সালাম-বরকত হল, আল বেরুনী হল, মাওলানা ভাসানী হল, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হল এবং শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক হলসহ অধিকাংশ আবাসিক হল ও অনুষদে কোনো অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বা ফায়ার ড্রিলের ব্যবস্থা নেই।
অন্যদিকে নবাব সলিমুল্লাহ হল, বীর প্রতীক তারামন বিবি হলসহ কয়েকটি ছাত্রী হল ও প্রশাসনিক ভবনে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলেও সেগুলোর নিয়মিত রিফিল করা হয় না। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভবন, যেখানে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনের সব অর্জন (নথি) রক্ষিত থাকে, সেই পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে থাকা ছয়টি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩ সালেই।
ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বর্ণনা করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের (ইপিজেড, সাভার) সিনিয়র স্টেশন অফিসার প্রণব চৌধুরী বলেন, ‘প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম না থাকলে আগুন লাগার পর তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে এবং প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।’
প্রশাসনের গাফিলতির অভিযোগ তুলে রোকেয়া হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) তাসনিম খন্দকার বলেন, ‘আমাদের হলটি ১০ তলা বিশিষ্ট হলেও বর্তমানে মাত্র পাঁচটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। ফলে শিক্ষার্থীরা চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অন্যান্য হলগুলোতেও একই চিত্র, যা মূলত প্রশাসনের চরম গাফিলতি।’
ভয়াবহতার বিষয়টি উল্লেখ করে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) মোহা. সিফাতুল্লাহ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত হলে কোনো অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নেই। এত বড় একটি ভবনে এটি অত্যন্ত আতঙ্কের বিষয়। ভবনের শুরু থেকেই এই ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল। আমরা হল প্রশাসনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছি। প্রশাসনের উচিত এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।’
সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম এই সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের পুরাতন ভবনে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নেই। তবে নির্মাণাধীন নতুন ভবনে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র না থাকলে প্রাথমিক পর্যায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। বিষয়টি জরুরি হওয়া সত্ত্বেও এখনো অনেক ভবনে এই ব্যবস্থা নেই।’
এ বিষয়ে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যালয়ের পরিচালক প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন জানান, ‘২০২৩ সালের মার্চে ভবনগুলো হস্তান্তর করা হয় এবং ২০২৪ সাল থেকে শিক্ষার্থীরা সেখানে বসবাস শুরু করে। সে সময় দ্রুত আবাসন নিশ্চিত করাই অগ্রাধিকার ছিল, ফলে ফায়ার ফাইটিং ও ফায়ার ডিটেকশন ব্যবস্থার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে সীমিত পরিসরে কিছু যন্ত্র দেওয়া হয়েছে। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে।’
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) ও প্রকৌশল অফিসের প্রধান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. সোহেল আহমেদ বলেন, ‘নতুন ভবনগুলোতে প্রকল্পের আওতায় ধাপে ধাপে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র স্থাপন করা হবে। বর্তমানে কিছু নির্দিষ্ট স্থানে এই ব্যবস্থা রয়েছে এবং আরও কিছু পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেই কাজ সম্পন্ন হবে। তবে পুরনো ভবনগুলোতে এখনো এই সংকট রয়েছে। আমরা ইউজিসির কাছে প্রয়োজনীয় বরাদ্দের জন্য অনুরোধ জানিয়েছি। চাহিদা এলে বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অবহেলার চিত্র আর সীমাবদ্ধ উদ্যোগের এই বাস্তবতায় ক্যাম্পাসের অগ্নি নিরাপত্তা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে যেকোনো সময় বড় ধরনের ট্র্যাজেডির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
প্রতিনিধি/একেবি