images

শিক্ষা

থানার ভেতরে ডাকসু নেতাদের ওপর হামলা, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০২ পিএম

  •  সাহায্যে এগিয়ে আসেনি কোনো পুলিশ সদস্য
  • জুবায়ের ডিউটি অফিসারের রুমে ঢুকলেও তাকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ
  • প্রায় এক দেড় ঘণ্টা থানায় অফিসার সদস্যরা কেন অনুপস্থিত?
  • হামলার সময় পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখেছে মাত্র: প্রত্যক্ষদর্শী
  • হামলায় সরাসরি অংশ নেয় অন্তত ৫০ জনের অধিক, ১২ জনের পরিচয় মিলেছে

রাজধানীর শাহবাগ থানার ভেতরে কয়েক দফায় ডাকসু নেতারা ছাড়াও ঢাকা সাংবাদিক সমিতির নেতাদের ওপর হামলার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এই হামলার সময় ভুক্তভোগীদের উদ্ধার তো দূরের কথা তাদের সাহায্যেও এগিয়ে আসেনি থানার ভেতরে ও প্রাঙ্গণে থাকা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। তারা নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিলেন। শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মারধরের ঘটনাগুলোকে দেখেছেন। শেষমেষ অগত্যা বাধ্য হয়ে ভুক্তভোগীদের চাপে কয়েকজনকে থানার পেছন দিক দিয়ে বের করে দেন। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েই দায় সারেন তারা।

গত বৃহস্পতিবার শাহবাগ থানায় প্রধানমন্ত্রী ও তার মেয়েকে নিয়ে ফেসবুকে নোংরা ছবি ছড়ানোর অভিযোগে ঢাবির তিন ছাত্রকে আটকে রাখা হয়েছে; এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে ডাকসুর নেতারা ছুটে যান। তার আধা ঘণ্টা আগে সেখানে যান ঢাবি ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকরা। কিন্তু দুই পক্ষকেই বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে ঢাবি ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। দুই গ্রুপের পক্ষ থেকেই এমন অভিযোগ করা হয়েছে। শুধু কি তাই, তারা বলছেন হামলার সময় পুলিশ সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। তখন ভুক্তভোগীদের মনে হয়েছে হামলাকারীদের হাতে থানাকে লিজ দেওয়া হয়েছিল। যদিও পরে থানায় ছুটে আসেন ওসি, ওসি তদন্ত ও অন্যান্য কর্মকর্তারা। পুরো সময়টা তারা থানায় রহস্যজনক কারণে অনুপস্থিত ছিলেন।

ভিডিও করায় মারধরের শিকার হন সাংবাদিকরা

ঢাবির তিন ছাত্রকে থানায় আটকে রাখা হয়েছে। এ খবর জানার পর বিকেলের দিকে থানায় ছুটে যান বিভিন্ন গণমাধ্যমে ক্যাম্পাস প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত সংবাদকর্মীরা। তারা গিয়ে দেখতে পান ছাত্রদলের নেতারা থানা প্রাঙ্গণে স্লোগান দিচ্ছেন। ওই সময় তাদের একজন ভিডিও করতে চাইলে বাধা দেন একজন নেতা। তখন বিষয়টি তৎক্ষণাৎ ঢাবি সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মাহি ছাত্রদলের সাবেক সহ স্কুল বিষয়ক সম্পাদক শফি ওবায়দুর রহমান সামিদকে জানালে তিনি তখন বলে ওঠেন, তুই চুপ থাক। এরপর মাহি নিজের পরিচয় দিলে তাকে নোংরা ভাষা ব্যবহার করে বলে তুই কিসের সাংবাদিক। এরপর মাহি বিষয়টি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি নাসিরকে বিষয়টি জানালে কিছুক্ষপর পর মব তৈরি করে তাদেরকে পেটানো হয়। এতে অন্তত ১০ জন সাংবাদিক আহত হন।

মারধরের শিকার সাংবাদিক মানজুর মাহী ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা সামিদের সঙ্গে বিষয়টি মিটিয়ে থানার প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আছি। এর ১০ মিনিট পর আবারো সামিদ আমাদের কাছে আসে। তখন সে আমাদের বিষয়টি চেপে যাওয়ার জন্য বলে এবং ক্ষমা চায়। কিন্তু এরই মধ্যে হাজী মুহাম্মদ মহসিন হলের ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবু জর গিফারি ইফাত আমাদের সদস্যদের কাছে ডেকে বলতে শুরু করছে, এই ভাইকে মারছে; ভাইকে মারছে। এরপর তারা আমাদের বেধড়ক মারধর শুরু করে।

মাহি বলেন, ওই সময় থানার ভেতরে পুলিশ সদস্যরা থাকলেও কেউ এগিয়ে আসেননি। এমনকি হামলাকারীদের কাউকে ধরা বা বাধাও দেননি।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আদনান নামে এক ঢাবি ছাত্র ঢাকা মেইলকে বলেন, ওই সময় পুলিশ ছিল নীরব দর্শক। তারা সব কিছু দেখছিল কিন্তু সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। 

এ হামলায় সাংবাদিক সমিতির নবনির্বাচিত সভাপতি মানজুর হোসাইন মাহি, সাধারণ সম্পাদক লিটন ইসলাম, ঢাকা ট্রিবিউনের বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার শামসুদ্দৌজা নবাব, ঢাকা মেইলের মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন সিফাত, নয়া দিগন্তের হারুন ইসলাম, মানবজমিনের আসাদুজ্জামান খান, ডেইলি অবজারভারের নাইমুর রহমান ইমন এবং দেশ রূপান্তরের খালিদ হাসানসহ অন্তত ১০ জন সাংবাদিক গুরুতর আহত হন।

এ ঘটনার পর আজ শুক্রবার হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা, তাদের ছাত্রত্ব বাতিল, স্থায়ী বহিষ্কার ও সাবেক ছাত্রনেতা যারা হামলায় অংশ নিয়েছে তাদের সার্টিফিকেট বাতিলসহ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য ডুজা’র (ডিইউজেএ) পক্ষ থেকে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। এতেও সাড়া না দিলে তারা কঠোর আন্দোলনে নামবেন বলে জানা গেছে।

হামলায় শনাক্ত ১২ জন

জানা গেছে, সাংবাদিক ও ডাকসুর নেতাদের ওপর হামলার ঘটনার সময় প্রায় অর্ধ শত নেতা অংশ নেন। তার মধ্যে ১২ জনের নাম ও পরিচয় খুঁজে পাওয়া গেছে। তারা হলেন— ঢাবি’র হাজী মুহম্মদ মহসিন হলের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের (শিক্ষাবর্ষ: ২০১৮-১৯, রেজি: ২০১৮১২৪৮৯৫) ছাত্র আবু জর গিফারি ইফাত, একই হলের  জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের (শিক্ষাবর্ষ: ২০১৮-১৯, রেজি: ২০১৮২২৭৩৯৬) মনসুর রাফি, জিয়াউর রহমান হলের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের (শিক্ষাবর্ষ: ২০২৩-২৪, রেজি: ২০২৩২১৪০০৬) কারিব চৌধুরী, একই হলের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের (শিক্ষাবর্ষ: ২০২১-২২, রেজি: ২০২১৬১৩১৭৭) জহিন ফেরদৌস জামি, শেখ মুজিবুর রহমান হলের  ক্রিমিনোলজি বিভাগের (শিক্ষাবর্ষ: ২০২২-২৩, রেজি: ২০২২৭১২৮১৫) মমিতর রহমান পিয়াল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইন্সটিটিউটের লেদার প্রোডাক্ট (শিক্ষাবর্ষ: ২০২২-২৩, রেজি: ২০২২৬১৭৭৪৯) সানিন সায়েদ, বিজয় একাত্তর হলের আইন বিভাগের (শিক্ষাবর্ষ: ২০২২-২৩, রেজি: ২০২২২১২০৯০) সোলাইমান হোসাইন রবি, ড. মোহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের ইইই এর (শিক্ষাবর্ষ: ২০১৩-১৪, রেজি: ২০১৩৪১২৩৮৬) ইমাম আল নাসের মিশুক, বিজয় একাত্তর হলের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের (শিক্ষাবর্ষ: ২০১৮-১৯, রেজি: ২০১৮৭২৪৯৪৩) সাজ্জাদ হোসেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের ইইই বিভাগের (শিক্ষাবর্ষ: ২০২২-২৩, রেজি: ২০২২১১৬০৩৩) জুনায়েদ আবরার, বিজয় একাত্তর হলের সংস্কৃত বিভাগের (শিক্ষাবর্ষ: ২০২২-২৩, রেজি: ২০২২১১৭৬১৮) সাঈদ হাসান সাদ এবং মাস্টারদা সূর্যসেন হলের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজের (শিক্ষাবর্ষ: ২০১৮-১৯, রেজি: ২০১৮২২৩০৬৬) মনোয়ার হোসেন প্রান্ত।

তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে, এই হামলায় অর্ধশত নেতা অংশ নেন। সাংবাদিকদের হামলার সময় নেতৃত্ব দেন সামিদ এবং ডাকসুর নেতাদের ওপর হামলার সময় নেতৃত্ব দেন ঢাবি ছাত্রদল সেক্রেটারি নাহিদুজ্জামান শিপন।

ডাকসুর নেতাদের ওপর হামলার সময়ও পুলিশ ছিল নীরব

সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনার আধা ঘণ্টা পর রাত ৮টার দিকে হামলার শিকার হন ডাকসুর নেতারা। ডাকসুর পক্ষ থেকে ১০ জন থানায় গিয়েছিলেন। কিন্তু তারা থানার গেট অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করতেই তাদের ওপর চড়াও হয় ছাত্রদলের নেতারা। তারা তাদেরকে ধরে মারধর করেন।

ডাকসুর নেতা জুবায়ের ও মুছাদ্দিকের ওপর হামলার আগে গেট দিয়ে ঢুকছিলেন কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে ছালমাসহ ১০ হন। তারা ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। তার আগেই জুবায়ের ও মুছাদ্দিকসহ অন্যদের ওপর হামলে পড়ে ছাত্রদলের নেতারা। এ হামলায় ডাকসু নেতা জুবায়ের ও মুছাদ্দিক ছাড়াও ছয়জন আহত হন। যারা প্রত্যেকে ডাকসুর বিভিন্ন হলের দায়িত্বে আছেন।  

ডাকসু নেত্রী সালমা ঢাকা মেইলকে বলছিলেন, আমরা তখন কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি ও জুমা দৌড়ে থানার ওসির রুমে ঢুকে পড়ি। পরে রুমে মুছাদ্দিক আসে। তার আধা ঘণ্টা পর আসে জুবায়ের। তারা জুবায়ের ও মুছাদ্দিককে বেশি মেরেছিল। অন্যরাও আহত। ওই সময় ওসির রুমে বসা ছিল ঢাবি ছাত্রদল সভাপতি গণেশ। সে আমাদের দুইজনকে বলছিল, আপনারা বাইরে যাইয়েন না। আপনাদেরও মারবে! তখন বলেছিলাম, আপনারা কেমন নেতা যে কর্মীরা হামলা করবে কিনা তা ভরসা পান না। এরপর পুরো সময়ে আমরা পুলিশের সহযোগিতা পাওয়ার জন্য বারবার ওসিসহ অন্যরা কোথায় জানতে চেয়েছি কিন্তু বলা হয়েছে তারা পাশেই আছে আসতেছে। এরপর এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর তারা থানায় এসে হাজির হন।

তিনি অভিযোগ করেন, থানায় ডাকসুর নেতাদের ওপর যখন হামলা করা হয় তখন পুরো থানায় এত পুলিশ থাকা সত্ত্বেও কেউ এগিয়ে আসেনি। এমনকি তারা হামলায় বাধাও দেয়নি। বিষয়টি আজব লেগেছে। থানায় যদি এমন অবস্থা হয় তাহলে আমরা কোথায় নিরাপদ?

হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের এজিএস আবদুল মজিদ ঢাকা মেইলকে বলেন, এই হামলার সময় পুলিশ ছিল একেবারে নীরব। জুবায়ের ভাইয়ের জিডি করেন যিনি, তার রুমে গিয়ে সাহায্য চেয়েও পাননি। তাকে তিনি এক প্রকার জোর করে বের করে দিয়েছেন।   

সূর্যসেন হলের জিএস মোখলেছুর রহমান জাবির ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা মনে করছি এই হামলা পরিকল্পিত ছিল। হামলার ধরন এবং পুলিশের সাহায্যে এগিয়ে না আসায় মনে হয়েছে, ওই সময় থানা চত্বর ছাত্রদলের নেতাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তা না হলে কেন ওসিসহ অন্যরা প্রায় দেড় ঘণ্টা পর থানায় আসলো। আবার দেখেন যখন ছাত্রদল নেতা রাকিব আসলেন তখন তারা আসলো। বিষয়টি তো রহস্যজনক। তার মনে তারা পরিকল্পিতভাবে আমাদের ওপর হামলা করেছে।

সেখানে ওই সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত মাল্টিমিডিয়ার সাংবাদিকরাও জানিয়েছেন, পুলিশ হামলার সময় সাহায্যে এগিয়ে না এসে থানার এক কোণায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারা শুধু দেখেছেন কিন্তু টু শব্দও করেননি।

ডাকসু নেতাদের ওপর হামলার নেপথ্যে যা যা মনে করা হচ্ছে

ডাকসুর একাধিক নেতা জানিয়েছে, তারা বুধবার ক্যাম্পাসে একটি  প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেছিলেন। ঢাবির বিভিন্ন হলে ছাত্রদলের ২৬ জন পুরোনো ব্যাচের ছাত্রদের হলে সিট দেওয়ার প্রতিবাদে। এতে জুবায়ের ও মুছাদ্দিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এটাই তাদের জন্য কাল হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

হামলার সময় আশপাশে উপস্থিত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান হলের ছাত্র মাসুদ। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা মনে করছি ২৬ জন পুরোনো ছাত্রের সিট বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিবাদ করায় জুবায়ের ও মুছাদ্দিকসহ অন্যদের ওপর হামলা করা হয়েছে।

তার মতোই মনে করেন ডাকসুর সূর্যসেন হলের জিএস মোখলেছুর রহমান জাবিরও। তিনি বলেন, এই হামলা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। ছাত্রদল মব তৈরি করে তাদেরকে মারধর করেছে। আমরা এ হামলার বিচার চাই।

প্রশাসন যা বলছে

থানা চত্বরে হামলাকারীদের কোনো বাধা দেয়নি পুলিশ। তারা ছিল নীরব দর্শক। এমন অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য রমনার ডিসি মাসুদ আলম ও শাহবাগ থানার ওসি মনিরুজ্জামান মনিরকে কল করা হলেও তাদেরকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

তার আগে বিকেলে থানায় সরাসরি গিয়ে শাহবাগ থানার ওসি (তদন্ত) জাহাঙ্গীর আলমকে পাওয়া যায়। তিনি জানান, এমন অভিযোগ কেউ করেনি। আর তারা হামলার সময় থানার বাইরে ছিলেন। 

গতকালের ঘটনার পর শুক্রবার সকাল থেকে থানার ভেতরে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তারা যারাই আসছেন তাদের নজর রাখছেন। তবে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত থানায় হামলার শিকার ডাকসুর নেতারাসহ কেউই  অভিযোগ দেয়নি বলে জানা গেছে। তবে ডুজা’র নেতারা মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। 

এমআইকে/এফএ