জেলা প্রতিনিধি
২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫৯ পিএম
বাংলাদেশের কৃষি বিপ্লবের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে পরিচিত যশোরের শার্শা উপজেলার উলাসী-যদুনাথপুর খালটি দীর্ঘ পাঁচ দশক পর পুনরায় প্রাণ ফিরে পেতে যাচ্ছে। প্রায় ৫০ বছর আগে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান যেভাবে নিজে কোদাল হাতে এই খালের খনন কাজ শুরু করেছিলেন, ঠিক একইভাবে তার দেখানো পথে হেঁটে আগামী ২৭ এপ্রিল এই মৃতপ্রায় খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর এই আগমনকে কেন্দ্র করে গোটা শার্শাবাসীর মধ্যে এখন আনন্দ-উল্লাস ছড়িয়ে পড়েছে।
ঐতিহাসিক এই প্রকল্পের পটভূমি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। পাঁচ দশক আগে যশোরের শার্শা উপজেলার উলাসী এলাকার বিস্তীর্ণ জমি বছরের অধিকাংশ সময় পানির নিচে তলিয়ে থাকত, ফলে কৃষকরা কোনো ফসল ফলাতে পারতেন না এবং এলাকায় তীব্র দারিদ্র্য বিরাজ করত। এই পরিস্থিতি বদলাতে ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজে কোদাল হাতে নিয়ে খাল খননের সূচনাকরেন। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার মানুষ কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই কেবল দুপুরে গুড়-রুটি খেয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে বেতনা নদীর সংযোগস্থলে প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল খনন সম্পন্ন করেন।
১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি পুনরায় এসে প্রকল্পটি উদ্বোধন করেন, যার ফলে এই অঞ্চলে কৃষি বিপ্লব ঘটে এবং এলাকাটি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে দীর্ঘ সময় সংস্কারের অভাবে বর্তমানে খালটি প্রায় ভরাট হয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। উলাসী ইউনিয়ন ভূমি অফিস প্রাঙ্গণে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে ঐতিহাসিক সেই স্মৃতিস্তম্ভ, যার একপাশে ১৯৭৬ সালের উদ্বোধন এবং অন্যপাশে ১৯৭৭ সালের প্রকল্প সমাপ্তির কথা খোদাই করা আছে। বর্তমানে খালের তলানিতে সামান্য পানি আছে এবং স্মৃতিস্তম্ভের পাশের পুরোনো ভবনটি ঝোপঝাড়ে ঢাকা পড়ে আছে।
এই প্রকল্পের প্রত্যক্ষদর্শী ও উলাসী গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি আবদুল বারিক মণ্ডল স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘খাল খনন কর্মসূচির সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হেলিকপ্টারে করে এসে স্কুল মাঠে অবতরণ করেন। এরপর তিনি হেঁটে এসে নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে ঝুড়িতে ভরেন। সেই ঝুড়িটি তিনি আমার ভাই করিম বকস মণ্ডল মেম্বারের মাথায় তুলে দেন। এমনকি আমার ভাইয়ের মাথার টোকাও (মাথাল) রাষ্ট্রপতি নিজেই পরে নেন। রাষ্ট্রপতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই হাজার হাজার মানুষ কোনো পারিশ্রমিক ছাড়া শুধু দুপুরে রুটি ও গুড় খেয়ে কাজ চালিয়ে যেতেন।’
তিনি আরও জানান, আগে উত্তর শার্শার পাঁচটি বড় বিলের পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় ২২ হাজার একর জমি অনাবাদি থাকত। খাল খননের পর পানি নিষ্কাশন স্বাভাবিক হয় এবং কৃষকরা উপকৃত হন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমান আবার এই খাল খনন করলে এলাকার মানুষের অনেক উপকার হবে।

তৎকালীন ইউপি সদস্য করিম বকস মণ্ডলের ছেলে আবু বক্কর সিদ্দিকী, যিনি বর্তমানে ৬৫ বছর বয়সী, তিনিও সেই স্মৃতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘উদ্বোধনের সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে মাটি কেটে আমার বাবার মাথায় তুলে দিয়েছিলেন। আমার বাবাই প্রথম সেই ঝুড়ি মাথায় করে মাটি সরান। রাষ্ট্রপতি যখন যশোর সফরে এসে এলাকার মানুষের কষ্টের কথা শোনেন এবং জানতে পারেন যে বিলের পানি বের করতে পারলে ২২ হাজার একর জমি আবাদযোগ্য হবে, তখনই তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। উলাসীতে খাল খননের পর সেখানে ইরি ধানের চাষ শুরু হয় এবং প্রায় ২০টি সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছিল।’
গ্রামের আরেক বাসিন্দা আহমদ আলী বলেন, ‘দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় খাল মরে গেছে। পুনরায় খাল কেটে সচল করতে হবে। তাহলে এলাকার মানুষের অনেক উপকার হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছেন; তার বাবার খনন করা খালটি আবার সচল হোক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
প্রশাসনিক প্রস্তুতির বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেন, ‘উলাসী খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন এবং আমরা আশা করছি মৃতপ্রায় খালটি পুনরায় প্রাণ ফিরে পাবে।’
যশোর জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ আশেক হাসান ঢাকা মেইলকে জানান, ‘দীর্ঘ ৫০ বছরে উলাসী-যদুনাথপুর খাল সংস্কার না করায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। সরকার এটি পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে। ৫০ বছর আগে জিয়াউর রহমানের নিজ হাতে খনন করা সেই খালটির উদ্বোধন করতে আগামী ২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসছেন। আমরা তার আগমন উপলক্ষে সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি।’
প্রতিনিধি/একেবি