বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৩ এএম
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি) ক্যাম্পাসে প্রতিদিন এক মানবিক দৃশ্য চোখে পড়ে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর নজর কাড়ে। বাইকের হর্ন বাজার শব্দ কানে পৌঁছানো মাত্রই চারপাশ থেকে ছুটে আসে আট-দশটি কুকুর; যেন তারা আগে থেকেই জানে যে তাদের জন্য খাবার আসছে। এই মানবিক কাজের নেপথ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ডিসিপ্লিনের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জিহাদ কাজী শৈশব।
তিনি প্রতিদিন নিয়ম করে বাসা থেকে খাবার রান্না করে নিয়ে আসেন এবং ক্যাম্পাসের অবলা প্রাণীদের খাওয়ান। শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত জীবনের মাঝেও তিনি সময় বের করে এই কাজটি করে যাচ্ছেন, যা বর্তমানে তার একটি নিয়মিত দায়িত্বে পরিণত হয়েছে এবং ক্যাম্পাসে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
এই কাজের পেছনের গল্প শুরু হয় ২০২৪ সালের রোজার ঈদের চাঁদরাত থেকে। সেদিন খালিশপুরে অবস্থিত তাদের বাসা থেকে হঠাৎ করেই হারিয়ে যায় তার আদরের পোষা কুকুর ‘টেম্পু’। ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে জন্ম নেওয়া টেম্পু ছিল পরিবারের সবার অত্যন্ত প্রিয় এবং তাকে অনেক যত্ন ও ভালোবাসায় লালন-পালন করা হতো। কুকুরটি হারিয়ে যাওয়ার পর শৈশব ও তার পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তারা টেম্পুকে খুঁজে পেতে ছবি ছাপিয়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রচার চালায় এবং ঘোষণা দেয় যে, কেউ টেম্পুর সন্ধান দিতে পারলে তাকে দুই হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
কয়েক মাস পর হঠাৎ করেই একদিন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চের মাঠে টেম্পুকে দেখতে পান শৈশব। দীর্ঘদিন পর নিজের প্রিয় কুকুরটিকে ফিরে পেয়ে তিনি ভীষণ আনন্দিত হন এবং তাকে পুনরায় বাসায় নিয়ে আসেন। কিন্তু দীর্ঘদিন বাইরে থাকার কারণে টেম্পুর আচরণে কিছু পরিবর্তন আসে, যা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছে অস্বস্তিকর মনে হয়। ফলে তারা টেম্পুকে বাসায় রাখতে রাজি হননি। এমতাবস্থায় বাধ্য হয়ে শৈশব আবারও টেম্পুকে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন, যেখানে সে আগে আশ্রয় নিয়েছিল।
এরপর থেকেই শৈশব প্রতিদিন বাসা থেকে টেম্পুর জন্য খাবার নিয়ে আসা শুরু করেন। তিনি বাসায় চাল রান্না করতেন এবং মাছের মাথা দিয়ে বিশেষভাবে খাবার প্রস্তুত করে তা নিয়ে ক্যাম্পাসে যেতেন। ধীরে ধীরে শুধু টেম্পু নয়, আশপাশের আরও ৮ থেকে ১০টি কুকুর তার কাছে খাবারের জন্য জড়ো হতে শুরু করে। কুকুরগুলো যেন তার প্রতি এক ধরনের গভীর আস্থা তৈরি করে ফেলে। এই বিষয়টি তাকে আরও অনুপ্রাণিত করে এবং তিনি নিয়মিতভাবে প্রতিদিন তাদের খাওয়ানো চালিয়ে যেতে থাকেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কুকুরের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং বিষয়টি আরও বড় আকার ধারণ করে।
বিশেষ করে ঈদের ছুটির সময় যখন ক্যাম্পাস ফাঁকা হয়ে যায় এবং অধিকাংশ শিক্ষার্থী বাড়িতে চলে যায়, তখন প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি কুকুর খাবারের অভাবে প্রচণ্ড কষ্ট পেতে থাকে। সেই সংকটময় সময়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ফেসবুক পেজে পোস্ট করে ফান্ড সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। এর মাধ্যমে ছুটির সময়েও কুকুরগুলোর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় এবং তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে তাদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা চালিয়ে যান।
ক্যাম্পাস খোলা থাকলে শৈশব সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত খরচে প্রতিদিন প্রায় ১৫টি কুকুরকে খাবার খাওয়ান। তার এই কাজের পেছনে তার বাবারও বড় অবদান রয়েছে, যিনি এই মহৎ উদ্যোগের জন্য তাকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। শুধু খাবার দেওয়া নয়, ক্যাম্পাসের কুকুর ও বিড়াল অসুস্থ হলে তিনি তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করেন। এই কাজে তাকে সহযোগিতা করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্নেহ টেইল’ নামের একটি সামাজিক প্রাণীকল্যাণমূলক সংগঠন।
একজন সিনিয়র আপুর মাধ্যমে তিনি এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে সেখানে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে শুরু করেন। ক্যাম্পাস বন্ধ থাকলে তিনি ‘স্নেহ টেইল’ সংগঠনের মাধ্যমে কুকুর ও বিড়ালদের জন্য খাবার বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। আর ক্যাম্পাস খোলা থাকলে নিজের অর্থ ব্যয় করে প্রতিদিন খাবার নিয়ে আসেন। একই সঙ্গে অসুস্থ প্রাণীদের চিকিৎসার জন্যও তিনি কাজ করেন এবং প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে তার কাজ আরও সংগঠিত ও বিস্তৃত হয়েছে, যা প্রাণীদের জন্য এক বিশাল সহায়তায় পরিণত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে একসময় কুকুরের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয় এবং এ নিয়ে নানা সমালোচনাও শুরু হয়েছিল। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শৈশব ও তার সংগঠন বিশেষ উদ্যোগ নেয়। ‘ফারি ফ্রেন্ডস’ নামের একটি প্রাণীকল্যাণ সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে কুকুরগুলোর বন্ধ্যাকরণ কার্যক্রম চালু করে। ‘স্নেহ টেইল’-এর মাধ্যমে এই কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়, যার ফলে কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ক্যাম্পাসের পরিবেশ পুনরায় স্বাভাবিক হতে থাকে। কেবল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই নয়, খুলনা শহরেও শৈশবের এই সেবামূলক কাজ বিস্তৃত। তিনি ‘গার্ডিয়ান্স অফ পজ অ্যান্ড ক্লজ (জিপিসি)’ নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে ২০২১ সাল থেকে যুক্ত রয়েছেন।
এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি শহরের অসুস্থ ও অবহেলিত কুকুরদের চিকিৎসাসেবা ও সহায়তা প্রদান করেন। ফলে তার কাজ এখন আর শুধু ক্যাম্পাসের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং পুরো শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যা তাকে একজন নিবেদিতপ্রাণ প্রাণীপ্রেমী হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে।
এই কাজ করতে গিয়ে শৈশবকে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্যও সহ্য করতে হয়েছে। অনেকেই মনে করেন কুকুরদের খাবার দিলে তাদের উৎপাত বাড়ে এবং তারা আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। অনেক সময় তাকে খাবার না দেওয়ার জন্যও নিরুৎসাহিত করা হয়। তবে এর বিপরীতে অনেক মানুষ তার এই কাজকে ইতিবাচকভাবে দেখেন এবং তাকে নিয়মিত উৎসাহ প্রদান করেন। বিশেষ করে তার বন্ধুরা তাকে সবসময় সহযোগিতা করে, খাবার বিতরণে সরাসরি সাহায্য করে এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহেও পাশে দাঁড়ায়।
এ প্রসঙ্গে শৈশব বলেন, প্রাণীগুলো তখনই হিংস্র হয়ে ওঠে যখন তারা ক্ষুধার্ত থাকে। যদি নিয়মিতভাবে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা যায়, তবে তারা শান্ত থাকে এবং মানুষের জন্য কোনো হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায় না। তিনি আরও মনে করেন যে, আমাদের বাসা-বাড়ি ও রেস্টুরেন্টে প্রতিদিন প্রচুর খাবার নষ্ট হয়, যা সঠিকভাবে সংগ্রহ করে যদি নির্দিষ্ট স্থানে রাখা যায়, তাহলে এই প্রাণীগুলোর খাবারের অভাব অনেকটাই দূর করা সম্ভব। ভবিষ্যতে শৈশব একটি বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে চান। তিনি অবলা প্রাণীদের জন্য একটি স্থায়ী ‘শেল্টার হোম’ গড়ে তুলতে চান, যেখানে অসুস্থ ও অবহেলিত প্রাণীদের সুচিকিৎসা ও খাবারের সুব্যবস্থা থাকবে। তার একমাত্র স্বপ্ন হলো যেন কোনো প্রাণী খাদ্যের অভাবে কিংবা বিনাচিকিৎসায় মারা না যায়।
প্রতিনিধি/একেবি