images

শিক্ষা / সারাদেশ

ইবি শিক্ষিকা হত্যা: স্ত্রীকে হারিয়ে চার সন্তান নিয়ে পাগলপ্রায় স্বামী

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

০৬ মার্চ ২০২৬, ০৯:২৫ এএম

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে নিজ অফিস কক্ষে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় চার সন্তান নিয়ে পাগলপ্রায় স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান। এছাড়া মা হারা সন্তানরা বারবার ছুটে যাচ্ছে মায়ের মরদেহের কাছে। মাকে দেখার আকুতি ও মায়ের মুখ দেখে কান্না থামছে না তাদের।

জানা যায়, নিহত শিক্ষিকা সাদিয়ার বাবা আশিকুল হক। তার পৈতৃক ভিটা কুষ্টিয়ার ফিলিপনগরের দৌলতপুর ও শ্বশুরবাড়ি কুষ্টিয়ার সদর থানার কমলাপুর ইউনিয়নের বংশীতলা গ্রাম। তার দুই ভাই অয়ন (বড়) ও আলিফ (ছোট)।

সাদিয়ার স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়ন করেন। বর্তমানে তিনি কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। ইমতিয়াজ সুলতানের ভাই শফিকুল ইসলাম (বড়) বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ও শিহাব উদ্দীন কুষ্টিয়া বিআরবি ক্যাবলসে প্রধান অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত আছেন।

সাদিয়া রুনার পরিবারে চার সন্তান। যাদের মধ্যে মেয়ে তাইবা (৯) চতুর্থ শ্রেণি ও তাবাসসুম (৭) দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। ছেলে সাজিদ আবরার (৩) ও মেয়ে আমেনাকে (৭ মাস) রেখেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হন আসমা সাদিয়া।

নিহতের স্বামীর বড় ভাই আবদুর রশিদ বলেন, কর্মস্থলে এমন হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। এ ঘটনায় কিছু রাঘববোয়াল জড়িত আছে, আমরা প্রশাসনের কাছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।

নিহত সাদিয়া স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান বলেন, ওই বিভাগের দুইজন শিক্ষক হাবিব ও শ্যাম দায়ী। কর্মকর্তা, কর্মচারীরা সবাই মিলে খুন করেছে আমার রুনাকে। ওই ডিপার্টমেন্টে কোনো মানুষ নাই, সবাই মিলে খুন করেছে।

আরও পড়ুন

ছুরিকাঘাতে নিহত ইবি শিক্ষিকার দাফন সম্পন্ন

নিহত শিক্ষিকা রুনার বাবা আশিকুল হক বিলাপ করতে করতে বলেন, আমার অনেক স্বপ্ন ছিল মেয়েকে নিয়ে। এই মেয়ে আমার বড় মেয়ে। এখন তার চারটা বাচ্চা এতিম হয়ে গেল। মা ছাড়া এই এতিম বাচ্চাদের কি হবে। কে দেখবে এখন তাদের। ছোট বাচ্চাটা কীভাবে মানুষ হবে মাকে ছাড়া।

এদিকে, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ইমাম হোসেন জানান, এ ঘটনায় অভিযুক্ত কর্মচারী ফজলুর রহমান লিখিত স্টেটমেন্টে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

এছাড়া শিক্ষিকা আসমা সাদিয়া রুনা হত্যা মামলার আসামি সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান বলেছেন, মামলা হয়েছে, আমি বা আমরা কলিগ, মামলা করেছে ম্যাডামের পরিবার। এখন তারা যদি আমার নাম ঢোকায় এখানে, আমার তো কিছু বলার থাকে না। আমি তো এই বিভাগেরই শিক্ষক। যদি বিভাগের কোনো অসন্তুষ্টির বিষয়ে তিনি বাসায় শেয়ার করে থাকেন, তাহলে তিনি কী বলেছেন, তা ম্যাডাম ই ভালো বলতে পারতেন। কিন্তু তিনি তো এখন বেঁচে নেই।

তিনি আরও বলেন, আমাকে ৪ নম্বর আসামি দিক আর ১ নম্বর দিক, সেটা বিষয় নয়। ম্যাডাম তো নেই আমাদের মাঝে, এটাই সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয়। যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড হয়েছে প্রকাশ্যে, তার সঠিক ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক। যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তা প্রকাশ্য দিবালোকে, এখানে তো আড়ালের কিছু নাই। আমি একজন অভিভাবক এবং একজন মানুষ হিসেবে বলতে চাই যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড হয়েছে তার সঠিক ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং প্রকাশ্যে বিচার হোক। যদি আমি জড়িত থাকি তাহলে আমারও বিচার হোক।

বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ফজলুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে সমাজকল্যাণ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। পরে বেতন বৃদ্ধি নিয়ে মাসখানেক আগে তার সঙ্গে ওই শিক্ষকের বাগ্‌বিতণ্ডা সৃষ্টি হয়। পরে তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। এ ঘটনার ক্ষোভের জেরে আজকের ঘটনা ঘটতে পারে ধারণা করছেন পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া সাবরিনা বলেন, আমরা ম্যামের হত্যাকারীর ফাঁসির দাবিতে এখানে এসেছি। ম্যাম আমাদের বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন। একজন কর্মচারী কতটা উগ্র হলে রুমে ঢুকে তাকে হত্যা করতে পারে! এই ঘটনার সাক্ষী অনেকেই আছেন, তাই আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানাই।

আরও পড়ুন

ইবি শিক্ষক খুনের কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা, দুই শিক্ষকসহ ৪ জনের নামে মামলা

সমাবেশে সমাজকল্যাণ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী জোবেন বলেন, ম্যামকে কালকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু এর আগে এক বছর ধরে ম্যামকে তিলে তিলে শেষ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘এই অন্তঃকোন্দল আজকের না। আমাদের ম্যাম যখন দায়িত্ব নেওয়া শুরু করেছেন, তখন থেকে তাকে ব্যর্থ-অকার্যকর চেয়ারম্যান হিসেবে প্রমাণ করার জন্য আমাদের কর্মচারী, আমাদের গুটিকয়েক শিক্ষক জড়িত ছিলেন। স্পষ্ট কথা এটা। আজকে সাধারণ ফজলুর থেকে খুনি ফজলুর হওয়ার পেছনে আমাদের কর্মচারীরা জড়িত আছেন। কারণ, আমাদের সামনেই অনেকবার কর্মচারীদের বলেছেন, আপনারা একটা চেয়ারের সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারেন না। আমরা রিকুয়েস্ট করেছি, আমরা ধমক দিয়ে কথা বলেছি, কিন্তু আমাদের কথা গ্রাহ্য করে নাই।’

শিক্ষার্থীরা আরও জানান, বিভাগের সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস ম্যামের সঙ্গে অসদাচরণ করতেন। শিক্ষকদের কোনো কথাই শুনতেন না। শিক্ষার্থীরা কিছু বললে তেড়ে আসতেন। এছাড়া তিনি কম্পিউটারে লেখালেখি করতে গেলে প্রচুর বানান ভুল করতেন। তাই বিভাগের উন্নতির স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বিভাগ থেকে তাকে অন্যত্র স্থানান্তর করে।

ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুদ রানা জানান, নিহতের স্বামীর পক্ষ থেকে ৪ জনের নাম উল্লেখ করে একটি অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সকালে নিহত শিক্ষিকার স্বামী মো. ইমতিয়াজ সুলতান বাদী হয়ে ইবি থানায় এ অভিযোগ দায়ের করেন। মামলার আসামিরা হলেন- ফজলুর রহমান (ঘাতক কর্মচারী), বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস (সমাজকল্যাণ বিভাগের সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার), শ্যামসুন্দর সরকার (সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক), মো. হাবিবুর রহমান (সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক)।

জানাজার সময় এমপি মুফতি আমির হামজা বলেন, আমরা সরকারের কাছে এই হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাই। আমরা আর এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেখতে চাই না। যদি অতিদ্রুত এই হত্যার বিচার না হয় তাহলে এরকম ঘটনা আরও ঘটবে।

প্রতিনিধি/এসএস