images

শিক্ষা

রোজায় যেভাবে চলে এতিমখানা ও মাদরাসার খরচ

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:০৫ পিএম

রমজান শুরু হলেই এতিমখানা ও আবাসিক মাদরাসাগুলোর ব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। সেহরি ও ইফতারের বাড়তি আয়োজন, রাতের তারাবি, তিলাওয়াত, বিদ্যুৎ ও পানির অতিরিক্ত ব্যবহার—সব মিলিয়ে ব্যয়ের চাপ স্পষ্টভাবে বাড়ে। সাধারণ সময়ে সীমিত অনুদান ও সামান্য ফি দিয়ে যে প্রতিষ্ঠানগুলো চলে, রোজায় তাদের হিসাব নতুন করে সাজাতে হয়। যাকাত, ফিতরা ও সদকার অর্থ এ সময় বড় ভরসা হয়ে ওঠে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনুদান বাড়লেও খরচের ধরনও পাল্টে যায়। তাই আগাম পরিকল্পনা না থাকলে মাঝপথে সংকট তৈরি হতে পারে।
 
রাজধানীর অদূরে অবস্থিত দারুস সালাম এতিমখানার শিক্ষক মাওলানা আবদুল হালিম জানান, রমজানে খাদ্য ব্যয় প্রায় দেড়গুণ বেড়ে যায়। প্রতিদিন সেহরিতে ভাত, ডাল, সবজি ও ডিম বা মাংস রাখতে হয়। ইফতারে খেজুর, মুড়ি, ছোলা, বেগুনি ও শরবতের ব্যবস্থা করতে হয় নিয়মিত। অনেক দিন স্থানীয় ব্যবসায়ী বা প্রবাসীরা ইফতার স্পন্সর করেন। কিন্তু প্রতিদিন সমানভাবে সহযোগিতা আসে না। তাই মাসের শুরুতেই সম্ভাব্য ব্যয়ের তালিকা তৈরি করা হয় এবং যাকাতের অর্থ আলাদা হিসাবে সংরক্ষণ করা হয়। 

IMG-03030121452_(4)
এলাকার মানুষ পাশে বসে ইফতার করলে নিজেদের একা মনে হয় না শিক্ষার্থীদের


হেফজ বিভাগের শিক্ষার্থী রায়হান উদ্দিন জানায়, রোজার সময় তাদের দিন শুরু হয় ভোরে। সেহরি খেয়ে ফজরের নামাজ আদায় করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সকালে ক্লাসে বসে। দুপুরের পর ক্লাসের সময় কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হয়। রোজায় শরীর দুর্বল লাগলেও একসঙ্গে ইফতার করার সময় সেই কষ্ট ভুলে যায়। এলাকার মানুষ পাশে বসে ইফতার করলে তাদের একা মনে হয় না।
 
কিতাবখানার শিক্ষার্থী তানভীর হাসান বলেন, রোজার রাতে তারাবির পর মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে অংশ নেয় তারা। এতে এলাকার মানুষও যোগ দেন এবং অনেকে অনুদান দিয়ে যান। দীর্ঘ সময় রোজা রেখে পড়াশোনা করা সহজ নয়, তবে শিক্ষকরা সহানুভূতির সঙ্গে ক্লাস নেন। পরীক্ষার চাপও কিছুটা কম রাখা হয়। রোজায় ধর্মীয় চর্চা বাড়লেও পড়ালেখা পুরোপুরি বন্ধ থাকে না।
 
জামিয়া আরাবিয়া খাদিমুল ইসলাম মসজিদ ও  মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা শহীদুল্লাহ কাসেমী জানান, রমজানে পাঠ্যসূচির গতি কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হয়। হিফজ বিভাগের শিক্ষার্থীরা বেশি সময় কোরআন তিলাওয়াতে দেয়। সাধারণ বিভাগের জন্য সংক্ষিপ্ত ক্লাস নেওয়া হয়। রাতের তারাবির কারণে বিদ্যুৎ খরচ বাড়ে। রান্নাঘরে কাজের চাপও দ্বিগুণ হয়। অনেক সময় অতিরিক্ত সহকারী রাখতে হয়, যা আলাদা ব্যয়ের খাত তৈরি করে।

IMG-03030121452_(7)
রমজানে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইফতারে মিলিত হন বিশিষ্টজনরা

 

এতিমখানার পরিচালনা কমিটির সদস্য হাজী আব্দুল গণি পাটোয়ারী বলেন, সমাজের দারিদ্র-অসহায়, এতিম, মিসকীন ছেলেরা যেন দ্বীনি শিক্ষার সুযোগ লাভে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য তাদের লেখা-পড়ার সাথে সাথে থাকা-খাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ-ঔষধপত্রসহ যাবতীয় ব্যয়ভার জামিয়ার পক্ষ থেকেই বহন করা হয়ে থাকে। এছাড়া সাধারণ দান-অনুদান, রেজিষ্ট্রার সদস্যদের বাৎসরিক চাঁদা, যাকাত, ফেৎরা, মান্নত, কাফ্ফারা, সাদকা ও এককালীন দানের অর্থ দিয়ে চলে তারা। রোজার মাসে দানের পরিমান একটু বাড়ে। 
 
আব্দুল গণি পাটোয়ারী বলেন, রোজার শুরুতে অনুদান বেশি আসে, মাঝামাঝি সময়ে কমে যায়, আবার শেষ দশকে বাড়ে। তাই হিসাব করে খরচ চালাতে হয়। যাকাতের অর্থ নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করা হয় এবং ফিতরার টাকা দিয়ে ঈদের পোশাক ও প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা হয়। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মাস শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা হয়।
 
এলাকার বাসিন্দা শামীমা বেগম বলেন, রমজানে এতিমখানা ও মাদরাসার প্রতি মানুষের সহানুভূতি বাড়ে। অনেকে নিজ হাতে ইফতার পৌঁছে দেন, কেউ চাল-ডাল দেন, কেউ নগদ সহায়তা করেন। তবে শুধু রোজায় নয়, সারা বছর নিয়মিত সহযোগিতা প্রয়োজন। শিশুদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন খরচ থেমে থাকে না।

এএইচ/ক.ম