বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:১০ এএম
আওয়ামী আমলে প্রশাসনের সহযোগিতায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) দুই মেধাবী শিক্ষার্থী ও শিবির নেতা ওয়ালিউল্লাহ ও মুকাদ্দাসের গুম হওয়ার দীর্ঘ ১৪ বছর পার হয়ে গেলেও খোঁজ মেলেনি তাদের। নিখোঁজ এই দুই শিক্ষার্থীর সন্ধান দাবিতে মানববন্ধন করেছে ইবি শিক্ষার্থীরা।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুর আড়াইটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে মানববন্ধন করে শিক্ষার্থীরা। এতে শাখা শিবিরের সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম রাফিসহ বিভিন্ন বিভাগের দুই শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
গুম হওয়া দুই শিক্ষার্থী হলেন— ইবির দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ওয়ালিউল্লাহ্ এবং আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগের আল মুকাদ্দাস। তারা উভয়ই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সদস্য ছিলেন। ওয়ালিউল্লাহ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তৎকালীন অর্থ সম্পাদক এবং মুকাদ্দাস সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে দায়িত্বরত ছিলেন।
জানা যায়, ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মধ্য রাতে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়াগামী হানিফ এন্টারপ্রাইজের ৩৭৫০ নম্বর গাড়িতে ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে আশুলিয়ার নবীনগর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ওয়ালিউল্লাহ ও মোকাদ্দাসকে গ্রেফতার করা হয়।
মানববন্ধনে শিক্ষার্থীদের ‘ওলি ভাই ফিরবে কবে, গুম কমিশন জবাব দে’; ‘মোকাদ্দাস ভাই ফিরবে কবে, ইন্টেরিম জবাব চাই’; ‘অলি ভাই ফিরবে কবে, ইন্টেরিম জবাব চাই’; ‘আমার ভাইকে ফেরত দাও, দিতে হবে দিয়ে দাও’; ‘ইবিয়ানকে ফেরত দাও, দিতে হবে দিয়ে দাও’; ‘আমার ভাইয়ের সন্ধান চাই, ইন্টেরিম জবাব চাই’; ‘মায়ের বুক খালি কেন?, প্রশাসন জবাব চাই’; সহ নানান স্লোগান দিতে দেখা যায়।
মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা বলেন, প্রায় এক যুগের অধিক সময় আগে ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা থেকে ক্যাম্পাসে ফেরার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে প্রশাসনের কর্মী পরিচয়ে গ্রেফতার করা হয়। তাদের আমরা এখনো ফিরে পাইনি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় আছে। আমরা ইন্টেরিম সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, আমাদের ভাইদের দ্রুত সন্ধান দিন; সন্ধান দিতে ব্যার্থ হলে! গুমের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করুন।
তারা আরও বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে নির্যাতিতদের মাঝে মজলুম ওয়ালিউল্লাহ ও মুকাদ্দাস অন্যতম। অনেক শহীদ পরিবার অন্তত তাদের সন্তানদের লাশ পেয়েছে, করব জেয়ারতের সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু আমরা জানিনা ভাইরা বেঁচে আছে কিনা। মারা গেলে লাশ কোথায়? তাদের কবর কোথায়? খুনি কারা? আমরা এর সুস্পষ্ট বিচার চাই।
মানববন্ধনে শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম রাফি বলেন, ২০১২ সালে গুম হওয়ার পর থেকে ভাইয়েরা আজও ফিরে আসেনি। ৫ আগস্টের পরে ভেবেছিলাম তারা ফিরে আসবে। কিন্তু সেই অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। তবুও আমাদের ভাইয়েরা ফিরে আসছে না। প্রশাসনকে বলতে চাই আমাদের ভাইদের সন্ধান দিন। তারা কোন অবস্থায় আছে তা আমাদেরকে জানান। যারা এই গুমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল তাদের যথাযথ বিচারের মুখোমুখি করে জনগণকে জানিয়ে দিন যাতে আর কোনো গুমের ঘটনা না ঘটে।
প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মুহাম্মাদ ওয়ালিউল্লাহ এবং আল ফিকহ অ্যান্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আল-মুকাদ্দাস ঢাকা থেকে কুষ্টিয়াগামী ‘হানিফ এন্টারপ্রাইজ’র ৩৭৫০ নম্বর গাড়িতে করে ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন। পথে রাত ১২টার পর আশুলিয়ার নবীনগর গাড়ি থামিয়ে র্যাব পরিচয়ে তাদের অপহরণ করা হয়। পরে পুলিশ প্রশাসন গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করে।
এদিকে, আল-মুকাদ্দাস পিরোজপুর জেলার সদর থানার ২নং কদমতলি ইউনিয়নের খানাকুনিয়ারী গ্রামের সন্তান, তার পিতার নাম মাওলানা আব্দুল হালিম। ওয়ালিউল্লাহ ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলার সোলজালিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম সোলজালিয়া গ্রামের সন্তান, তার পিতার নাম মাওলানা ফজলুর রহমান। তারা উভয়ই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সদস্য ছিলেন। ওয়ালিউল্লাহ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তৎকালীন অর্থ সম্পাদক এবং মুকাদ্দাস সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে দায়িত্বরত ছিলেন। দুইজনই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের দেশীয় ব্লকের ২১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন। ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতায় তাদের গুম করা হয়েছে বলে দাবি পরিবারের।
প্রতিনিধি/এফএ