বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম
ভর্তি পরীক্ষার হলে সাধারণত চোখে পড়ে উৎকণ্ঠা, খাতা–কলমের শব্দ, আর সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া তরুণদের ব্যস্ততা। কিন্তু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার দিনে সেই চেনা দৃশ্যের মাঝেই ছিল তিনটি ব্যতিক্রমী গল্প—যারা চোখে দেখতে না পেলেও স্বপ্ন দেখতে জানে, আর সেই স্বপ্ন ছুঁতে ভয় পায় না।
২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন তিনজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মুহাম্মদ সাহির ইসলাম, রবিউল হাসান ও আজিজুল ইসলাম।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রে একযোগে অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষায় তাদের জন্য নেওয়া হয় আলাদা ও বিশেষ ব্যবস্থা।
রংপুর থেকে আসা মুহাম্মদ সাহির ইসলামের যাত্রাপথ শুধু কুমিল্লা পর্যন্ত নয়—জীবনের পথটাও ছিল কঠিন। তিন ভাই-বোনই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। বাবা নেই, মা একাই লড়ছেন সংসারের ভার নিয়ে। তবুও সাহির থেমে যাননি। পরীক্ষা শেষে শান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন,
জাতীয় শ্রুতি লেখক ও বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী সুন্দরভাবে পরীক্ষা দিতে পেরেছি। আলহামদুলিল্লাহ, পরীক্ষা ভালো হয়েছে। পথটা কষ্টের ছিল, তবে মা আর সহযোগীদের সমর্থন আমাকে সাহস দিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলার মদনপুর থানার রবিউল হাসানের অভিজ্ঞতাও ছিল ইতিবাচক। তার ভাষায়, পরীক্ষা দিতে কোনো সমস্যা হয়নি। শ্রুতি লেখকরা সহযোগিতা করেছেন, সময়ও বাড়ানো হয়েছে। ব্যবস্থাপনা ভালো ছিল। আশা করি ভালো কিছু হবে।
আরেক পরীক্ষার্থী আজিজুল ইসলাম জানালেন ভিন্ন বাস্তবতার কথা। সহযোগিতা পাওয়ায় কৃতজ্ঞ হলেও তার কণ্ঠে ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিজ্ঞতার ভার।
আমি চাই, সব জায়গায় আমাদের জন্য এভাবে সুযোগ তৈরি হোক। নয়ত প্রতিবার কথা বলে, অনুমতি নিয়ে পরীক্ষার হলে ঢুকতে হয়। অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের বিষয়গুলো বোঝে না। আমরা কঠিন নীতিমালার মুখোমুখি হই। আমাদের যতটুকু সুবিধা প্রয়োজন, ততটুকু দিলেই যথেষ্ট।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ বছর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য সচেতনভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, তিনজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর সুবিধার্থে ডিন অফিসে আলাদা ব্যবস্থায় পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
এই তিন শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ শুধু একটি পরীক্ষায় বসা নয়—এটি একটি বার্তা। দৃষ্টি শক্তির সীমাবদ্ধতা শিক্ষার পথে শেষ কথা নয়। সঠিক সহায়তা, মানবিক নীতিমালা আর সামান্য সদিচ্ছাই বদলে দিতে পারে অসংখ্য জীবনের গতিপথ।
ভর্তি যুদ্ধের এই গল্প তাই শুধু ফলাফলের অপেক্ষায় নয়, এটি লড়াই, আশা আর সমান অধিকারের এক নীরব দাবি।
প্রতিনিধি/এসএস