images

শিক্ষা

সাত কলেজের অধ্যাদেশ শিগগির, প্রাধান্য পাচ্ছে সবার স্বার্থ

সাখাওয়াত হোসাইন

২১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম

  • অধ্যাদেশে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের আশা
  • অক্ষুণ্ন থাকছে স্বাতন্ত্র্য, ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  • পরিচয় সংকটে ভুগতে হবে না শিক্ষার্থীদের
  • শিক্ষার মান উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব
  • ইডেন-বদরুন্নেসা মেয়েদের, ঢাকা কলেজ ছেলেদের

শিগগিরই অনুমোদন হতে যাচ্ছে রাজধানীর সরকারি সাত কলেজ নিয়ে প্রস্তাবিত ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাকেবি) অধ্যাদেশ। এরমধ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সবার স্বার্থ রক্ষা করে অধ্যাদেশের কাজ চূড়ান্ত করেছে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অনুমোদন করার জন্য তোড়জোড় চালাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রধান্য পাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থ। সাত কলেজের পক্ষ থেকেও তাগাদা দেওয়া হচ্ছে অধ্যাদেশ পাসের জন্য। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত হতে পারে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক। সেই বৈঠকে অগ্রাধিকার পাবে অধ্যাদেশটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে বলেন, সংশোধিত অধ্যাদেশে ইন্টারমিডিয়েট, অনার্স-মাস্টার্সের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার স্বার্থ দেখা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুমোদন করার পর যাতে কারো মধ্যে কোনো ধরনের আক্ষেপ না থাকে। সেইসঙ্গে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের চাওয়া সাত কলেজের শিক্ষা মান উন্নয়ন ঘটবে। সেইসঙ্গে পরিচয় সংকটে ভুগতে হবে না। সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের কলেজের পরিচয় ছাড়াও আলাদাভাবে স্বতন্ত্র পরিচয় থাকবে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনের বিষয়টিও থাকবে অধ্যাদেশে এবং শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে সাত কলেজের স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যও অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ ও আন্দোলন

এদিকে অধ্যাদেশ অনুমোদনের এক দফা দাবিতে ‘অধ্যাদেশ মঞ্চ’ করে আন্দোলন করছেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। গত ১৯ জানুয়ারি থেকে চলছে এই আন্দোলন। সময়ক্ষেপণ না করার তাগিদ দিয়ে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, অধ্যাদেশ অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত জারি থাকবে আন্দোলন।

জানতে চাইলে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী হাসান মামুন বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে আমরা দাবি জানিয়ে আসছি। নানাভাবে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয়েছে। নিজেদের বিকশিত করার সুযোগ পায়নি। অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ দিনের বঞ্চনার অবসান হবে।

ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী ফারহানা আফরিন বলেন, দ্রুত অধ্যাদেশ চাই। সাত কলেজের শিক্ষার মানোন্নয়নে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন চাই। সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা দিতে হবে।

শিক্ষার্থীদের দাবি, গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি আইন-২০২৫’-এর খসড়া প্রকাশ করলেও তা এখনো অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হয়নি। গত ডিসেম্বরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বৈঠকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই অধ্যাদেশ জারি করা হবে। কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা আবারও আন্দোলনে নেমেছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশের খসড়া চূড়ান্ত করেছে মন্ত্রণালয়। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চূড়ান্ত খসড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় আশা করছে, দ্রুততম সময়ে অধ্যাদেশ যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাবে।

মন্ত্রণালয় জানায়, অধ্যাদেশের খসড়া চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে সবার যৌক্তিক প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে এবং উদ্বেগসমূহকে বিবেচনায় নিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার উপযোগী কাঠোমা নির্ধারণ করাই ছিল মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের মূল লক্ষ্য। সবার ধৈর্যশীল সহযোগিতা এবং গঠনমূলক ভূমিকার কারণেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় জটিল এ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ সময়ে সময়ে প্রেস রিলিজের মাধ্যমে ধারাবাহিক অগ্রগতির তথ্য সর্বসাধারণকে অবহিত করেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, টেকসই ও বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মৌলিক ও উপরিকাঠামোগত সংস্কারের কাজগুলো সুশৃঙ্খলভাবে ধাপে ধাপে এবং যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে হয়। অধ্যাদেশটি যেহেতু এখন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। দীর্ঘদিনের ধৈর্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার এই ধারা অব্যাহত রেখে অতি দ্রুত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা নিশ্চিত করতে পারব, যা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার প্রসারে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

আরও পড়ুন

সাত কলেজে অনার্স-মাস্টার্স ফাইনালের প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ

সাত কলেজের একজন সিনিয়র শিক্ষক নাম প্রকাশ না করে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা চাই সবার প্রত্যাশার যৌক্তিক প্রতিফলন ঘটুক অধ্যাদেশে। তাহলে অধ্যাদেশটি ফলপ্রসূ হবে, এককভাবে শুধু একপক্ষের দিকে তাকিয়ে অধ্যাদেশ দিলে তা কার্যকর হবে না। ছাত্র-শিক্ষক সবার স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি থাকতে হবে। সেইসঙ্গে সাত কলেজের নিজেদের আলাদা ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে, তাও সংরক্ষণ করতে হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইডেন মহিলা কলেজের একজন শিক্ষক জানান, নতুন এই কাঠামো নিয়ে বড় দাগে আপত্তি নেই ওই কলেজগুলোর শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের। সবার স্বার্থে বিষয়টি দেখা হয়েছে গুরুত্ব সহকারে। তবে শব্দগত কিছু বিষয় আরও পরিষ্কার করলে সুন্দর হবে।

গত সেপ্টেম্বরে এই কাঠামোয় করা অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশের পর থেকে প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে আন্দোলন করে আসছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ক্লাসও শুরু করা যাচ্ছিল না। এ রকম পরিস্থিতিতে সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যাখ্যা দিয়ে জানায় প্রস্তাবিত ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়া পরিমার্জন করে চূড়ান্তের কাজ চলছে।

dhaka_central02
ঢাকার সরকারি সাতটি কলেজ নিয়ে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

অধ্যাদেশের নতুন খসড়া অনুযায়ী ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ নামে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। স্থায়ী ক্যাম্পাস না হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজন অনুযায়ী ভবন বা স্থান ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ থাকবে। ঢাকা মহানগরীর সাতটি কলেজ—ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ ও তিতুমীর কলেজ ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’র সংযুক্ত কলেজ হিসেবে সম্পর্কিত থাকবে। সংযুক্ত কলেজগুলোর বিদ্যমান পরিচয়, বৈশিষ্ট্য, অবকাঠামো, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অক্ষুণ্ন থাকবে।

আরও পড়ুন

সাত কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় করতে যত সংকট

নতুন খসড়া অনুযায়ী উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্যদের সমন্বয়ে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ নামে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা গঠিত হবে। সংযুক্ত কলেজের অনুমোদন প্রদান ও বাতিল, পাঠ্যক্রম নির্ধারণ, পরীক্ষা গ্রহণ এবং ডিগ্রি প্রদানসহ শিক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করবে এই বিশ্ববিদ্যালয়। সংযুক্তি ও সংযুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট নেবে। এছাড়া সংযুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষকদের চাকরিকালীন ও গবেষণামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করবে বিশ্ববিদ্যালয়।

এবার হাইব্রিড নয়

অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের ব্যাপারে খসড়ায় বলা হয়েছিল, সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাদান পদ্ধতি হবে হাইব্রিড মোডে। সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ ক্লাস ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে নেওয়া যাবে। আর পরীক্ষা সশরীরে অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের খসড়া অধ্যাদেশের ব্যাপারে মতামত জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে পাঠদান করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান ও শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে সংশোধিত খসড়ায় ভার্চুয়াল মোডে পাঠদান নিয়ে কিছু বলা হয়নি।

ইডেন ও বদরুন্নেসায় ভর্তির সুযোগ পাবেন নারী শিক্ষার্থীরা

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি সংযুক্ত ইডেন মহিলা কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে পাঠদান করা হবে শুধু ছাত্রীদের। তবে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি সংযুক্ত এসব কলেজে পড়াশোনার সুযোগ থাকছে না ছাত্রদের। সেইসঙ্গে ঢাকা কলেজেরও থাকছে না মেয়েদের পড়ার সুযোগ, এই কলেজটি ছেলেদের পড়াশোনা করার জন্যই বিশেষায়িত থাকবে।

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির প্রশাসক ও ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘পরিমার্জনের কাজ শেষ হয়েছে। অধ্যাদেশটি চূড়ান্তভাবে বের হলে বোঝা যাবে। সবার স্বার্থ সংরক্ষণ করে দ্বিতীয় খসড়াটি বের হয়েছে। কিছু কিছু সংশোধনী ছিল, তাও বিভিন্ন মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে।’

অধ্যাপক ইলিয়াস বলেন, ‘যে খসড়াটি চূড়ান্ত করা হয়েছে, সেটি মন্ত্রণালয় থেকে কেবিনেটে পাঠানো হবে। অনুমোদন হওয়ার পর পাওয়া যাবে। আশা করা যায়, আগামী উপদেষ্টা পরিষদের অধ্যাদেশ অনুমোদন হতে পারে।’

এসএইচ/জেবি