মোস্তফা ইমরুল কায়েস
৩০ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:৩৯ পিএম
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বিদেশ থেকে বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিটেন্স। গত কয়েক বছর ধরে এই রেমিটেন্সে অবদান রাখছে বাংলাদেশ থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করতে যাওয়া নারী কর্মীরাও। ভাগ্য বদলের জন্য বিদেশে গেলেও এসব নারী কর্মীর বেশিরভাগেরই অবস্থা বদলায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তারা কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন, বেতন না পাওয়াসহ নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। দেশে ফিরে এসেও প্রতিকূল অবস্থায় পড়তে হয় অনেককে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও রফতানি ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মতে, ২০২২ সালে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ থেকে ১১ লাখ নারী ও পুরুষ কর্মী পাঠানো হয়েছে। তবে বায়রার দাবি, ২০২২ সালে বিভিন্ন এজেন্সির হাত ধরে ২২ লাখ কর্মী বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছে।
বিদেশ যাওয়া মোট কর্মীর মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ নারী। ২০১৫ সাল থেকে নারী গৃহকর্মী যাওয়ার সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও কাজের মান ও পরিবেশ বাড়েনি। বাংলাদেশ থেকে বেশ কয়েকটি দেশেই নারীকর্মী পাঠানো হয়, যাদের বেশিরভাগই অদক্ষ। এরমধ্যে সৌদি আরব, লেবানন, ওমান ও জর্ডানে বাংলাদেশ থেকে নারীদের গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানো হয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং ও ইটালিতে সামান্য কিছু দক্ষ নারী কর্মী পাঠানো।
বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে কাজ করতে যাওয়া নারী কর্মীদের মধ্যে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যারা কাজ করতে যায় তাদের অনেকেই যৌন নির্যাতনসহ নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এরসঙ্গে আছে মজুরি বৈষম্য ও নিরাপত্তহীনতা। পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কা, নেপাল, থাইল্যান্ড, ভারত থেকে যাওয়া নারী কর্মীদের চেয়ে বাংলাদেশের নারী কর্মীরা অর্ধেক বা তারও কম মজুরি পান।
গত এক মাস এমন অর্ধ-শতাধিক নারীর সাথে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের।
কাজ করেও তারা বেতন পাননি
পটুয়াখালীর লাভলী বেগম (ছদ্মনাম)। ২০২২ সালের শুরুতে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে গিয়ে ৮ মাস ছিলেন। এক বাসায় কাজ করবে বলে নেওয়া হলেও তাকে আরও দুই বাসায় কাজ করতে বাধ্য করা হয়। ঠিকমতো খাবার দিত না গৃহকর্তা। ছয় মাসের বেতনও পাননি তিনি। দুই মাস কর্মহীন ছিলেন। সৌদিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সেফহোমে থেকে গত আগস্টে দেশে ফিরে আসেন এবং মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে নেত্রকোনার সুমনা (ছদ্মনাম) গিয়েছিলেন জর্ডানে। সেখানে দুই বছর একটি বাসায় কাজ করতেন। ৫-৬ মাস পরপর তাকে বেতন দেয়া হতো। সর্বশেষ ৫ মাসের বেতন পাননি।
একই অবস্থায় পড়েন গলাচিপার পারভীন (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, মালিক বেতন চাইলে বলতো তোরে মাইরা ডাস্টবিনে ফেলাইয়া দিমু।
বেতন না পাওয়ার বেশি অভিযোগ সৌদি আরবেই। যদিও বিএমইটি ডিজি শহীদুল আলমের দাবি, এ সংখ্যা কম। তারা এসব বিষয় নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন বলে দাবি করেন।
শূন্য হাতে ফিরেছেন সায়মা
ঢাকার নবাবগঞ্জের সায়মা দুই বছর ৯ মাস সৌদিতে ছিলেন। বলা হয়েছিল বেতন দেয়া হবে ২০ হাজার টাকা কিন্তু দেওয়া হতো ১৫ হাজার। ঠিকভাবে খাবার দেয়া হতো না। তিনি তার বেতনের টাকা দেশে পাঠানোর জন্য সেখানে থাকা কফিলের পরিচিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসির নামে এক বাঙালির ব্যাংক এ্যাকাউন্টে দিয়েছেন। কিন্তু সেই ব্যক্তি তার ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকার পুরোটাই মেরে দিয়েছেন। ফলে তাকে শূন্য হাতেই দেশে ফিরতে হয়েছে। দেশে ফিরে সেই নাসিরের বিরুদ্ধে থানায় ডিজি করলেও সুফল পাননি।
দালালের খপ্পরে পড়া ও প্রতারণা নিত্যসঙ্গী
নওগাঁর সামিনা আক্তার। সংসারে সুখের কথা চিন্তা করে দুই বছর আগে সৌদিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন। বেতন, খাবার আর পরিবেশ না মেলায় বাধ্য হয়ে তিন মাসের মাথায় দেশে ফিরেছেন। সাথে ছিল শারীরিক নির্যাতন বোনাস। যে সুখের আশায় তিনি বিদেশ গিয়েছিলেন, সেই সুখের স্বপ্ন এখন তার জীবনে কষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত এক বছরে এমন কয়েক শতাধিক নারী জানিয়েছেন, দালালরা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিদেশে গিয়ে তার কিছুই পাননি তারা।
প্রশিক্ষণ ও ভাষা জ্ঞানের অভাবে বিপাকে পড়ছেন অনেকে
বরিশালের নাজমা আক্তার সৌদিতে যাওয়ার দুই বছর আগে মিরপুরে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বাসা বাড়ির কাজের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২২ সালে তিনি যখন সৌদি যান এজেন্সির পক্ষ থেকে তাকে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। তার পুরনো প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে তাকে সৌদিতে পাঠানো হয়। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, যে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম সেটার সাথে সৌদি বাসাবাড়ির কাজের এবং তাদের জিনিসপত্র ব্যবহারের অভিজ্ঞতা কোনো মিল ছিল না। আমাকে নানা সমস্যা পড়তে হয়েছে।
শুধু নাজমা আক্তার নয় সৌদি আরব, জর্ডান, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নারী গৃহকর্মী হিসেবে যারা গিয়েছেন তারা সবাই একই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভাষা এবং বাসা বাড়ির কাজের প্রশিক্ষণ না নিয়ে যাওয়ায় গৃহকর্মীরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
এজেন্সির অবহেলা
বিভিন্ন সময়ে নারী কর্মীরা দেশে ফের এসে কাজের পরিবেশ, মজুরি ও নির্যাতন নিয়ে অভিযোগ করলেও এজেন্সিগুলো তা আমলে নেয়নি। ভুক্তভোগীদের অনেকে ঢাকা মেইলকে বলেছেন, যাওয়ার আগে রাজধানীর গাবতলীর টেকনিক্যাল সেন্টারে স্বাক্ষর নিয়ে একটি কাগজ হাতে তুলে দেয়। সেটা দিয়েই তাদের বিদেশে পাঠানো হয়।
বিচার পান না নির্যাতিতারা
গত সাত বছরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে হাজার খানেক নারী বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা প্রবাসী মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন দপ্তর অভিযোগ করলেও কোনো সমাধান পাননি।

রাজধানীর ওয়ারীর ফুল বানু চলতি বছরের জুনে সৌদিতে গৃহকর্মী হিসেবে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে চুন থেকে পান খসলেই করা হতো নির্যাতন। গৃহকর্ত্রী এক দফা মারতেন। এরপর মেয়েকে দিতেন সেই মারার কাজ। টানা চার মাস মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনে প্রায় পাগল হয়ে পড়েছিলেন এই নারী। ভাগ্যক্রমে ফুল বানু দেশে ফিরলেও এখনো শরীরের কষ্ট কমেনি। তিনি বলেন, যে টাকার জন্য সৌদি গিয়েছিলাম, প্রতি রাতে সেই টাকায় কেনা ট্যাবলেট খেয়ে এখন আমাকে ঘুমাতে হয়। অভিযোগ করলাম কিন্তু বিচার পেলাম না। চার মাস কাজ করে মাত্র দুই মাসের বেতন পেয়েছি।
একই অভিজ্ঞতা জানান ময়মনসিংহ জেলার সোহরা বেগম। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ায় নিজ সন্তানকে নিয়ে বাপের বাড়িতে থাকতেন। দালালের খপ্পরে পড়ে সৌদি গিয়েছিলেন। ২০২২ সালের শুরুর দিকে গিয়ে দুটি বাসা বাড়িতে ৮ মাসে কাজ করেছেন। কিন্তু বেতন পেয়েছেন মাত্র তিন মাস। এর বাইরে ছিল প্রতিদিন রুটিন মাফিক মারধর।
এ বিষয়ে অভিবাসী উন্নয়নকর্মী প্রোগ্রামের চেয়ারমান শাকিরুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, গৃহকর্মীরা সেই দেশের লেবার আইনের আওতায় পড়ে না। ফলে নারীরা কোনো সমস্যায় পড়লে তাদের অভিযোগ করার কোনো সুযোগই নাই। আর অভিযোগ করলেও উল্টো মালিক তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। এ ক্ষেত্রে তাকে সহায়তা করতে পারে একমাত্র দূতাবাস। আরেকটা জটিলতা হচ্ছে, দূতাবাস আইনি সহায়তা দিলেও পরে সেই নারী দেশে ফিরে আসার পর সেটি আর ফলোআপ হয় না। ধীরে ধীরে মামলাগুলো সাক্ষী প্রমাণের অভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
মাইগ্রেশন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর ঢাকা মেইলকে বলেন, কর্মীরা দেশে ফেরত আসার ফলে আইনি সহায়তা পাওয়া দুষ্কর হয়। ভুক্তভোগীকে সেই দেশে দূতাবাসের তত্ত্বাধায়নে রেখে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম একটা পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। এ উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। সরকারের অবশ্যই একটি ফাণ্ড থাকা উচিত। কেউ নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে আসলে তার পুনর্বাসনের ব্যয় বহন করাও উচিত। পাশাপাশি কোনো নারী কর্মী যাওয়ার আগে সেখানে কি ধরনের প্রতিকূলতা হতে পারে, বিকল্প পথগুলো কি কি- এসব ব্যাপারে বোঝানো হয় না।
দূতাবাসগুলোতে নেই আইনি সহায়তা কেন্দ্র
বিদেশে নারীরা নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি নারী কর্মীদের আইনি সহায়তার জন্য খোলা হয়নি কোনো ধরনের সহায়তা কেন্দ্র।
আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার অভিবাসন বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, নারীরা গৃহকর্মী হিসেবে সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে যাওয়ার আগে আমাদের পক্ষ থেকে দেশগুলোতে ডরমেটরি সিস্টেম চালুর দাবি তোলা হয়েছিল। আমরা বলেছিলাম তারা বাসা বাড়িতে কাজ করে ফেরত আসবেন। তাহলে নির্যাতনের ঘটনা কমবে। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সেই উদ্যোগ নেয়নি প্রবাসী মন্ত্রণালয়।
প্রবাসী নারীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন বিএনএসকে’র নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, যেসব নারী বিদেশে নির্যাতনের শিকার হন, তারা সেখানে গিয়ে তেমন আইনি সহায়তা পান না। এজন্য বিদেশের দূতাবাসগুলোতে কোনো ধরনের আইনি কাঠামোও নেই। এছাড়া নারীদের পাঠানোর সময় বয়সের হেরফের (কম বা বেশি দেখানো) করা হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারীরা। পরবর্তীতে বিদেশে যেতেও সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
কাজের পরিবেশ নিয়ে নানা অভিযোগ
প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের কাছে বিদেশ ফেরত নারীর হিসাবে না থাকলেও বেসরকারি এনজিওগুলো তার হিসাব রাখছে।
অভিবাসী ও প্রবাসীদের কাজ করা সংগঠন অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) ২০১৭ সালের তথ্য মতে, যৌন নির্যাতনের শিকার নারী কর্মীদের ৩০ শতাংশই অন্ত:সত্ত্বা হয়ে দেশে ফেরেন। চিকিৎসকের পরামর্শে এদের মধ্যে ৮০ শতাংশ গর্ভপাতের সুযোগ পেলেও বাকিরা অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তান প্রসবে বাধ্য হন।
এসব নির্যাতন নিয়ে সরকারি কোনো তথ্য মিলে না। বেসরকারি সংস্থা ওকাপ’র এক গবেষণা মতে, সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা নারী কর্মীর ৫৬ শতাংশ এবং লেবানন থেকে আসা ৫৮ শতাংশই শারীরিক নির্যাতনের শিকার। বিদেশ ফেরত কর্মীদের নিয়ে কাজ করা এই সংস্থাটির মতে, গত তিন বছরে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নারী কর্মীর ৩১ শতাংশই শারীরিক নির্যাতনের শিকার। এছাড়া রয়েছে কর্মীদের বেতন না দেয়া, সাপ্তাহিক ছুটি না থাকা এবং চিকিৎসা না করানোর মতো নানা ঘটনা। এক্ষেত্রে নিয়োগ কর্তাসহ সংশ্লিষ্ট অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
অন্যদিকে ব্র্যাকের অভিবাসন প্রোগ্রামের মতে, শুধুমাত্র ২০২১ সালেই সৌদিসহ মধ্যেপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন ২ হাজার ৯০০ অধিক নারী।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম মনে করেন, নীতিমালায় অনেক কিছু বলা আছে কিন্তু ২০১৩ সালের প্রবাসী আইনে তাদের জন্য আলাদাভাবে কিছু বলা হয়নি। এসব জায়গায় বদল আনতে হবে। দরকার একটি দীর্ঘ বা মধ্যমেয়াদী নীতিমালা। তিনি আরও মনে করেন, দক্ষ কর্মী পাঠানো, তাদের সুরক্ষা ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করে নজরদারি বাড়ানো, সিস্টেম বদলানো ও প্রশিক্ষিত কর্মী গড়তে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।
ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের সভাপতি সৈয়দ সাইফুল হক বলেন, দুই দেশের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমেই এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি করা সম্ভব।
গত দুই যুগের বেশি সময় ধরে কাজ করা মাইগ্রেশন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর ঢাকা মেইলকে বলেন, তারা (সৌদি) যেহেতু পরিবর্তন হবে না, তাহলে আমাদের অন্য দেশে কর্মী পাঠানোর কথা চিন্তা করতে হবে। নারীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ (বিশেষ করে বিদেশি ও প্রবাসী প্রশিক্ষক দিয়ে) দিয়ে ও ভাষায় দক্ষ করে তারপর পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে গৃহকর্মী হিসেবে গিয়ে আর নির্যাতনের শিকার হতে হবে না।
তিনি বলেন, নারীরা শুধুমাত্র গৃহকর্মী নয়, অন্যসব কাজেও প্রশিক্ষিত হয়ে যেতে পারে। তার জন্য তাদেরকে উৎসাহিত করতে সরকার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বিভিন্ন সময়ে সেক্টর তৈরির জন্য সরকারি সফর হয়েছে কিন্তু সেক্টর বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ সংশ্লিষ্টরা নেয়নি। এ কারণে একই সেক্টরে নারীদের প্রতিবছর পাঠানো হচ্ছে, বাড়ছে না কাজের ভিন্নতা।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দিয়ে তিনি বলেন, আমূল রিবর্তনের জন্য নারীদের মনমানসিকতার বদল করতে হবে এবং স্বল্প শিক্ষিত নারীদের অনুপ্রাণিত করার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ মহিলা প্রবাসী শ্রমিক সমিতির জেনারেল সেক্রেটারি শেখ রোমানা ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের কোয়ান্টিটির প্রয়োজন নে,ই কোয়ালিটির দরকার। নারীর অবস্থান বদলাতে নারীদের প্রশিক্ষিত করার পাশাপাশি গৃহকর্মী সেক্টরের বাইরে তাদের পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া বিদেশে কাজ করতে গিয়ে নারীদের নির্যাতনের শিকার বিষয়টি তখনই বন্ধ হবে যখন নারীরা সচেতন হবে। এজন্য তাদের শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
বায়রার সহ-সভাপতি শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রবাসে নারী কর্মী নির্যাতন নিয়ে যে অভিযোগ রয়েছে তা নিয়ে কাজ চলছে। এসব এড্রেস করা ডিফিকাল্ট। কিন্তু আমরা যদি আনুপাতিক হারে বলি তাহলে তা কিন্তু খুবই কম। তারপরও আমাদের কাছে কথা হচ্ছে, একজন মানুষের যদি নির্যাতনের শিকার হয় সেটাও কাম্য নয়। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে নিরাপদ অভিবাসনটা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে সৌদিতে নির্যাতনের যে অভিযোগ রয়েছে তা নিয়ে মন্ত্রণালয়, বায়রা এবং দূতাবাসে একযোগে কাজ করছে। আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে আশা রাখি একটা ভালো ফলাফল আসবে। পাশাপাশি দক্ষ নারী কর্মী পাঠাতে আমরা প্রাইভেট সেক্টর ট্রেনিং দেয়ার ব্যবস্থা ছাড়া ও দক্ষ কর্মী তৈরিতে আমরা কাজ করছি।
প্রবাসী নারী কর্মীদের নির্যাতনসহ নানা সময় অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে টানা দুই সপ্তাহ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আহমেদ মুনিরুস ছালেহীনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো জবাব দেননি। সর্বশেষ ২৯ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার বিকেলে তাকে ফোনে পাওয়া গেলেও জরুরি মিটিংয়ে আছেন, পরে ফোন করবেন বলে কেটে দেন। পরে তাকে কয়েক দফা চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও রফতানি ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক শহীদুল আলম মনে করেন, নারীদের বিদেশ যাত্রার ট্রেনিংগুলো অন্তত ছয় মাস করা দরকার। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, অভিযোগগুলো যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি হয় সেই অনুযায়ী কাজ হচ্ছে। এছাড়া বিচারিক কাজে ভুক্তভোগীদের সহায়তায় তারা যাতে ঢাকায় আসতে পারে ও বিচারকার্য চালাতে উৎসাহী হয় তার জন্য উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
এমআইকে/জেএম