নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৫২ পিএম
জমির শেয়ার বিক্রির নামে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিচালিত অনিয়ন্ত্রিত আবাসন ব্যবসা বন্ধের দাবি জানিয়েছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)।
সংগঠনটির দাবি, এ ধরনের ব্যবসায়িক মডেলের কারণে ইতোমধ্যে প্রায় ৪০ হাজার নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ নিয়ে প্রায় ১০ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব প্রকল্পের কারণে ক্রেতাদের প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা আটকে থাকলেও আগামী দুই থেকে তিন বছরে আইনি জটিলতায় আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে সংগঠনটি।
একইসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চলমান তদন্ত দ্রুত শেষ করে রিহ্যাবের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা। তাদের অভিযোগ, তদন্তের নামে প্রায় তিন মাস ধরে দেশের আবাসন খাতের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠনটির নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. মো. আলী আফজাল। সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সংগঠনটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক।
রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট বলেন, আবাসন খাতে উদ্বেগজনকভাবে এমন একটি ব্যবসায়িক মডেলের বিস্তার ঘটছে, যেখানে জমির নির্দিষ্ট অংশ বা শেয়ার বিক্রি করে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট আয়তনের ফ্ল্যাট নির্মাণ ও হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ভবনের অনুমোদিত নকশা, নির্মাণের সক্ষমতা, অর্থের ব্যবহার, ফ্ল্যাটের সুনির্দিষ্ট অবস্থান এবং মালিকানা হস্তান্তরের আইনি নিশ্চয়তা থাকে না। ফলে অর্থ বিনিয়োগ করেও ক্রেতারা নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট পাওয়া কিংবা বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, এ ধরনের প্রকল্পে নির্মিত ভবনের অনুমোদিত নকশা ও বাস্তব নির্মাণের মধ্যে অসংগতি এবং নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। ১০০টি ভবন পরিদর্শন করলে প্রায় প্রতিটি ভবনেই কোনো না কোনো ধরনের ব্যত্যয়ের অভিযোগ পাওয়া যেতে পারে। এসব ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার, নির্মাণের শর্ত ও কারিগরি নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। তাই শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ভবনগুলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কারিগরি যাচাইয়ের আওতায় আনা জরুরি।
রিহ্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সম্প্রতি প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত শেয়ারভিত্তিক আবাসন ব্যবসায় প্রতারণার অভিযোগে ৯ হাজার ৮২৩টি মামলা বিচারাধীন থাকার তথ্য উঠে এসেছে। এসব মামলায় প্রায় ৪০ হাজার ক্রেতা এবং ১২ হাজার কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট। জমির শেয়ার কিনলেই নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের আইনগত মালিকানা নিশ্চিত হয় না। একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি, অনুমোদনহীন প্রকল্পে অর্থ সংগ্রহ, নির্মাণ ব্যয়ে অস্বচ্ছতা এবং দক্ষ প্রকৌশলী ও পেশাদার তদারকির অভাবে ক্রেতারা ঝুঁকিতে পড়ছেন।
সংগঠনটির মতে, বৈধ আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোকে জমির মালিকানা, প্রকল্প অনুমোদন, নকশা, নির্মাণবিধি, প্রকৌশলগত নিরাপত্তা, কর ও ভ্যাটসহ সব ধরনের আইনগত বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে হয়। কিন্তু শেয়ারভিত্তিক মালিকানার নামে পরিচালিত কিছু প্রকল্পে একই মাত্রার তদারকি ও আইন প্রয়োগ হচ্ছে না। এতে নিয়ম মেনে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে।
রিহ্যাবের দাবির মধ্যে রয়েছে- জমির শেয়ার বিক্রি করে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিনির্ভর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক মডেল বন্ধ করা, প্রকল্পের জমির মালিকানা ও অনুমোদন নিশ্চিত না করে অর্থ সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা এবং শেয়ারভিত্তিক প্রকল্পে নির্মিত ভবনগুলোর স্বাধীন কারিগরি ও আইনগত নিরীক্ষা করা। একই সঙ্গে জাল দলিল, ভুয়া অনুমোদন, একই জমি একাধিকবার বিক্রি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট বলেন, কোনো বৈধ যৌথ মালিকানা বা স্বচ্ছ বিনিয়োগ ব্যবস্থার বিরোধিতা করছে না রিহ্যাব। তবে জমির অংশীদারত্ব বা যৌথ উদ্যোগের নামে এমন ব্যবসা চলতে পারে না, যেখানে অর্থের বিপরীতে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের অধিকার, বৈধ মালিকানা, নির্মাণের দায় এবং হস্তান্তরের নিশ্চয়তা নেই।
তিনি বলেন, শেয়ারভিত্তিক অনিয়ন্ত্রিত আবাসন ব্যবসার সমস্যা শুধু আবাসন খাতের নয়, এটি জাতীয় সমস্যা। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয়, আবাসনের নিরাপত্তা, সরকারি রাজস্ব ও দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ জড়িত। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চলমান তদন্তে রিহ্যাবের পূর্ণ সহযোগিতা রয়েছে। তবে তদন্তের অজুহাতে একটি জাতীয় পর্যায়ের বাণিজ্য সংগঠনের নেতৃত্ব, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও নিয়মিত সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা কাম্য নয়।
তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তদন্ত চলতে পারে, কিন্তু সে কারণে সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘একটি সংগঠনের নেতৃত্ব, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও নিয়মিত সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত যদি দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে, তাহলে সেই সংগঠন কীভাবে তার সদস্যদের স্বার্থ রক্ষা করবে? আমরা মনে করি, তদন্ত চলতে পারে, কিন্তু সে কারণে সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
রিহ্যাব নেতারা বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের বাণিজ্য সংগঠনগুলোর নিয়ন্ত্রক ও তদারককারী কর্তৃপক্ষ। রিহ্যাব সব সময় সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। মন্ত্রণালয়ের যেকোনো আইনসংগত নির্দেশনা ও তদন্ত কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত সংগঠনটি। তবে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে বিদ্যমান অনিশ্চয়তা দূর করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-২ আবু খালিদ মো. বরকত উল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট-৩ এ এফ এম ওবায়দুল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (অর্থ) ড. মো. হারুন অর রশিদসহ সংগঠনটির পরিচালক ও অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এমআর/এএইচ