Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে সাত শিল্প গ্রুপের আর্থিক লেনদেনে এনবিআরের নজর

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২৩ এএম

দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে চলমান অস্থিরতার মধ্যে সাতটি শিল্প গ্রুপের আর্থিক কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ লক্ষ্যে সাত শিল্প গ্রুপের ১২০টি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের নথিপত্র তলব করেছে সংস্থাটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)। তালিকায় রয়েছে এনভয়, মন্ডল, গিভেন্সি, স্ট্যান্ডার্ড, নিপা, ওয়েল ও টুসুকা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দেশের সব ব্যাংকে এ-সংক্রান্ত জরুরি নির্দেশনা পাঠিয়েছে সিআইসি। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শুরু হওয়া অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। তবে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং শিল্প খাতে নতুন করে অস্থিরতা এড়াতে আপাতত ব্যাংক হিসাব জব্দ না করে নজরদারি ও যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যাংকগুলোকে তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবের নথিপত্র, লেনদেনের বিবরণ এবং আর্থিক তথ্য সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

এর আগে মঙ্গলবার এনবিআরের এক অনুষ্ঠানে সংস্থাটির চেয়ারম্যান আহসান হাবিব বিশেষ একটি কারণে ৩৪ ব্যক্তি ও ৩৪ পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) ও আয়কর গোয়েন্দা বিভাগ কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ইতোমধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি শিল্প গ্রুপের মালিক, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নতুন তালিকায় থাকা অধিকাংশ ব্যক্তি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত অথবা বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্নভাবে সুবিধাভোগী ছিলেন বলে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে।

তথ্য তলবের তালিকায় এনভয় গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলো হলো এনভয় গার্মেন্টস লিমিটেড, এনভয় প্যাকেজেস লিমিটেড, এনভয় ডিজাইন লিমিটেড, এনভয় ফ্যাশনস লিমিটেড ও এনভয় টেকনোলজিস লিমিটেড। এ ছাড়া গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী, তার স্ত্রী শারমিন সালাম ও মেয়ে শাহরিন সালাম ওশী, রাশিদা আহমেদ এবং তানভীর আহমেদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে।

তালিকায় সবচেয়ে বেশি নাম রয়েছে মন্ডল গ্রুপের। গ্রুপটির ৪৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়েছে এনবিআর। এর মধ্যে রয়েছে মন্ডল ইন্টিমেটস, কটন ফিল্ড (বিডি), কটন ক্লাব (বিডি), কটন ক্লোথিং (বিডি), মন্ডল ফেব্রিকস, ট্রপিক্যাল নিটেক্স, মার্ক সোয়েটার, মন্ডল স্পিনিং মিলস, আলিম নিট (বিডি), মন্ডল সিকিউরিটিজ, অ্যাপোলো ফ্যাশন, ট্রিমস ইন্টারন্যাশনাল, ইকো ইন্টিমেটস, অ্যাপোলো নিটওয়্যার, অ্যাপোলো প্যাকেজিং, এমব্রেলা, মন্ডল নিট কম্পোজিট, মন্ডল নিটওয়্যারস, মন্ডল ইয়ার্ন ডাইং, মনটেক্স ফেব্রিকস ও পানামা অ্যাগ্রো কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আবদুল আলিম মন্ডল, তারিন তাসলিমা, মো. জুবায়ের মন্ডল, সুলতানা খাতুন, মাসুদা খাতুন, হাজী আবদুল মান্নান মন্ডল, মোমেনা খাতুন, আবদুল মোমিন মন্ডল, মাহমুদুল হাসান, জান্নাতুল ফেরদৌস, আসাদুর রহমান সিকদার, গোলাম ফারুক তালুকদার, মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, সুরভী রহমান, শেরিন সুলতানা, তাসলিমা আক্তার, খন্দকার ফারুক কায়সার, নাহিদ খন্দকার ও হাজী আবদুল মজিদ মন্ডলসহ অন্যরা। গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল মোমিন মন্ডল।

গিভেন্সি গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ও চার ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো গিভেন্সি গার্মেন্টস লিমিটেড, গিভেন্সি স্পিনিং মিলস লিমিটেড, গিভেন্সি গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড, গিভেন্সি ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেড এবং গিভেন্সি ফুডস অ্যান্ড এসেনশিয়ালস লিমিটেড। ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন খতিব আবদুল জাহিদ মুকুল, মাসুমা খাতুন লিপা, মাহমুদা খাতুন ও খতিব আবদুল হাদী। গ্রুপটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক খতিব আবদুল জাহিদ মুকুল।

স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপেরও একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়েছে এনবিআর। তালিকায় রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড-সাগর ইনফো বিল্ডার্স লিমিটেড জেভি এবং দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড। এ ছাড়া হোসনে আরা বেগম, ইঞ্জিনিয়ার মো. আতিকুর রহমান, মাহমুদা বেগম, ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম মোশাররফ হোসেন, তাসমিয়াহ রহমান, হাসনাত মোশাররফ, ফারিয়া রহমান, ফাহিম মোশাররফ ও হাসিব মোশাররফের নাম রয়েছে।

নিপা গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠান ও চার ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো নিপা নিট ওয়ার কোম্পানি, সেলিনা অ্যাপারেলস লিমিটেড ও নিপা ফ্যাশন ওয়ার ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড। ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সানজিদ চৌধুরী, খসরু চৌধুরী, এম মুনিরুল ইসলাম ও মো. টিপু সুলতান। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খসরু চৌধুরী।

চট্টগ্রামভিত্তিক ওয়েল গ্রুপের ১৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ওয়েল অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড, ওয়েল গ্রুপ, ওয়েল ফ্যাশন লিমিটেড এবং ওয়েল ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানি লিমিটেড। এ ছাড়া গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট নাসরিন আক্তার, আবদুস সালাম, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সৈয়দ শহীদুল ইসলাম, সৈয়দ তরিকুল ইসলাম, মো. আসিফ হাসান, জান্নাতুল ইসলাম, আফরোজা বেগম, ড. নাসরিন আফরোজ, আকতারুনিসা ও জিনাত ইসলামের নাম রয়েছে। ওয়েল গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য।

টুসুকা গ্রুপের ২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্যও চেয়েছে এনবিআর। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে টুসুকা প্যাকেজিং, টুসুকা স্টিচেস, টুসুকা অ্যাপারেলস, টুসুকা ফ্যাশনস, টুসুকা ওয়াশিং, টুসুকা প্রসেসিং, টুসুকা ডেনিম, টুসুকা জিন্স ও টুসুকা ট্রাউজার্স। গ্রুপটির চেয়ারম্যান আরশাদ জামাল ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমান ছাড়াও ফিরোজ আলম, মো. রাফায়েত উল্লাহ খান, মো. শফিকুল ইসলাম, মো. ইকবাল কবির, একরামুল হক, মো. আতিকুজ্জামান (সাগর) ও মো. আতিকুজ্জামান (রিপন)-এর নাম রয়েছে।

এ ছাড়া এনবিআরের তথ্য তলবের তালিকায় তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম আবদুল মান্নান, তার পরিবারের সদস্য ফরিদা মান্নানসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে। মিরপুরের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবের তথ্যও চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে মিরপুর এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য গোয়েন্দা সূত্রে উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সুতা, পোশাকের আনুষঙ্গিক পণ্য, প্যাকেজিং ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত। এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আপাতত ব্যাংক হিসাব জব্দ না করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক লেনদেন, হিসাব এবং আর্থিক তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

এমআর/এএস