Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

সরকারি হিসাবে স্বস্তি, খুচরা বাজারে চড়া দাম!

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৮ এএম

রাজধানীর পাইকারি বাজারে পেঁয়াজ, আলু ও বেশ কয়েকটি সবজির দামে কমতির প্রবণতা দেখা গেছে। তবে খুচরা বাজারে এসব পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে, রসুন, শুকনো মরিচ, শসা, চালের কয়েকটি ধরন ও কিছু মাছের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আলু, শসা, লাউ, রসুন ও গরুর মাংসের দামেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) পর্যন্ত পাওয়া কৃষি বিপণন অধিদফতরেরর ঢাকা মহানগরীর পাইকারি বাজারদরের তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব চিত্র পাওয়া গেছে। সরকারি হিসাবে কয়েকটি পণ্যের দাম কমলেও খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন কতটা ঘটছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পেঁয়াজ, আলু, বেগুন ও ঢেঁড়সের মতো পণ্যের পাইকারি দামের সঙ্গে খুচরা দামের ব্যবধানও চোখে পড়ার মতো।

কৃষি বিপণন অধিদফতরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবর রাজধানীর পাইকারি বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি ছিল ৩০ থেকে ৪২ টাকা। আগের মাসের একই সময়ে দাম ছিল ৩০ থেকে ৪৮ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে পেঁয়াজের সর্বোচ্চ পাইকারি দাম কমেছে ১২ দশমিক পাঁচ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে দেশি পেঁয়াজের কেজি ছিল ৬৪ থেকে ৭৪ টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পেঁয়াজের পাইকারি দামে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।

তবে খুচরা বাজারে পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। অর্থাৎ পাইকারি বাজারে সর্বোচ্চ ৪২ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজ খুচরা বাজারে ৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এতে পাইকারি ও খুচরা দামের মধ্যে কেজিতে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।

Onions_and_potatoes

আলুর দামেও কমতির প্রবণতা রয়েছে। ২৯ অক্টোবর আলুর পাইকারি দাম ছিল কেজিতে ১২ থেকে ১৯ টাকা। আগের মাসে এই দাম ছিল ১৫ থেকে ২১ টাকা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে আলুর গড় দামে ১৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ পতন হয়েছে। তবে গত বছরের একই সময়ে আলুর কেজি ছিল আট থেকে ১২ টাকা। ফলে গত বছরের তুলনায় এ বছর আলুর পাইকারি দাম বেশি রয়েছে। অন্যদিকে, খুচরা বাজারে আলুর কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। 

রসুনের বাজারে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। দেশি রসুনের পাইকারি দাম ছিল কেজিতে ৫৫ থেকে ৯০ টাকা, যা আগের মাসে ছিল ৫৫ থেকে ৮৫ টাকা। আমদানি করা রসুনের কেজি বিক্রি হয়েছে ১৫৫ থেকে ১৭৫ টাকায়। এক মাস আগে এই দাম ছিল ১১৮ থেকে ১৩৫ টাকা। অর্থাৎ আমদানি করা রসুনের সর্বোচ্চ পাইকারি দাম এক মাসে ২৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দাম বেড়েছে ২৬ দশমিক ৯২ শতাংশ।

বর্তমানে খুচরা বাজারে মানভেদে রসুনের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ২০০ টাকায়। ফলে দেশি ও আমদানি করা রসুনের ধরন এবং মান অনুযায়ী দামে বড় পার্থক্য রয়েছে।

শুকনো মরিচের দামও বেড়েছে। ২৯ অক্টোবর পাইকারি বাজারে শুকনো মরিচের কেজি ছিল ২২০ থেকে ৩২০ টাকা। আগের মাসে দাম ছিল ২১০ থেকে ৩২০ টাকা। কৃষি বিপণন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে শুকনো মরিচের দামে ১০৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। তবে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি শুকনো মরিচের দাম রাখা হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ পাইকারি বাজারের সর্বোচ্চ দামের তুলনায় খুচরা বাজারে কেজিতে ১৮০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের।

Untitled_design_(16)

তেলের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন নেই
নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোজ্যতেলের বাজারে এক মাসের ব্যবধানে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। ২৯ অক্টোবর পাইকারি বাজারে খোলা সয়াবিন তেলের লিটার ছিল ১৮৩ থেকে ১৮৪ টাকা। আগের মাসে এই দাম ছিল ১৮২ থেকে ১৮৪ টাকা। এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ছিল ২০০ থেকে ২০৩ টাকা। পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ৯৮০ থেকে ৯৯৫ টাকায়। উভয় ধরনের বোতলজাত তেলের দামে আগের মাসের তুলনায় পরিবর্তন হয়নি।

খোলা পাম তেলের লিটার ছিল ১৬১ থেকে ১৬২ টাকা। আগের মাসে দাম ছিল ১৬৩ থেকে ১৬৪ টাকা। সরিষার তেলের লিটার ১৮৫ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আগের মাসের তুলনায় সরিষার তেলের দামেও পরিবর্তন দেখা যায়নি।

চিনির কেজি ছিল ১০২ টাকা। আগের মাসেও দাম ছিল ১০২ টাকা। অর্থাৎ সরকারি হিসাবে চিনির পাইকারি দামে পরিবর্তন হয়নি। তবে খুচরা বাজারে খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা কেজি দরে এবং প্যাকেটজাত চিনি ১৪০ টাকা কেজি দরে। এতে পাইকারি ও খুচরা বাজারের মধ্যে দামের ব্যবধান রয়েছে।

সবজিতে কমেছে কয়েকটির দাম, বেড়েছে শসা ও লাউয়ের
সবজির বাজারে এক মাসের ব্যবধানে কয়েকটি পণ্যের দাম কমেছে। আবার কিছু সবজির দাম বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বেগুনের পাইকারি দাম ছিল কেজিতে ৫০ টাকা, যা আগের মাসে ছিল ১০০ টাকা। অর্থাৎ এক মাসে বেগুনের পাইকারি দাম অর্ধেকে নেমেছে। তবে খুচরা বাজারে বেগুনের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। ফলে পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামে কেজিতে ৭০ টাকা ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।

পটলের পাইকারি দাম ছিল কেজিতে ৪০ টাকা। আগের মাসে দাম ছিল ৫০ টাকা। ঢেঁড়সের কেজি ছিল ২৮ থেকে ৪০ টাকা, যা আগের মাসে ছিল ৫৫ টাকা। করলার কেজি ছিল ৫০ টাকা, আগের মাসে ছিল ৬০ টাকা। এসব পণ্যে গত মাসের তুলনায় দাম কমার প্রবণতা দেখা গেছে। তবে খুচরা বাজারে ঢেঁড়সের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। 

Retail_market2

অন্যদিকে, শসার পাইকারি দাম ছিল কেজিতে ৪০ থেকে ৬৫ টাকা। আগের মাসে দাম ছিল ৩৫ থেকে ৬০ টাকা। গত বছরের একই সময়ে শসার কেজি ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকা। বর্তমানে খুচরা বাজারে শসা বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় পাইকারি ও খুচরা দুই বাজারেই শসার দাম বেশি।

লাউয়ের দামেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রয়েছে। পাইকারি বাজারে প্রতি পিস লাউ বিক্রি হয়েছে ২৫ থেকে ৫০ টাকায়। আগের মাসে দাম ছিল ২০ থেকে ৫০ টাকা। গত বছরের একই সময়ে লাউয়ের দাম ছিল ২০ থেকে ৩০ টাকা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে লাউয়ের গড় দামে ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। খুচরা বাজারে লাউয়ের দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা প্রতি পিস।

চালের কয়েকটি ধরনে বেড়েছে দাম
চালের বাজারে বিভিন্ন ধরনের দামে ভিন্নতা রয়েছে। পাজাম, ব্রি ধান-২৮ ও ব্রি ধান-২৯ ধরনের মাঝারি চালের পাইকারি দাম ছিল কেজিতে ৪৯ থেকে ৫৩ টাকা। আগের মাসে দাম ছিল ৪৬ থেকে ৫১ টাকা। সরকারি হিসাবে, এক মাসের ব্যবধানে এ শ্রেণির চালের গড় দামে পাঁচ দশমিক ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই চালের কেজি ছিল ৫২ থেকে ৫৮ টাকা। বর্তমানে খুচরা বাজারে ব্রি ধান-২৮ চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে।

নাজিরশাইল ও সম্পা কাটারি ধরনের সরু চালের পাইকারি দাম ছিল কেজিতে ৮৫ টাকা। আগের মাসে দাম ছিল ৮৬ টাকা। অন্যদিকে, বিরই চালের কেজি ছিল ৯৩ টাকা, যা আগের মাসে ছিল ৮৬ টাকা। খুচরা বাজারে এই দুই ধরনের চাল যথাক্রমে ৯০ ও ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

chal

ব্রি ধান-৩৪ সুগন্ধি চালের পাইকারি দাম ছিল কেজিতে ৯৫ থেকে ১৭৫ টাকা। আগের মাসে এই চালের দাম ছিল ১০০ থেকে ১৮৮ টাকা। ফলে এক মাসের ব্যবধানে গড় দাম কমেছে ছয় দশমিক ২৫ শতাংশ। তবে খুচরা বাজারে এই চালের দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত। 

ডাল ও মসলার বাজারেও ভিন্ন চিত্র
ডালের বাজারে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে, আবার কয়েকটির দাম কমেছে। মুগ ডালের মোটা ধরনের পাইকারি দাম ছিল কেজিতে ১৩৬ টাকা। আগের মাসে দাম ছিল ১১৮ থেকে ১২২ টাকা। সরকারি হিসাবে, এক মাসে এই ডালের গড় দামে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। খুচরা বাজারে মুগ ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা কেজি দরে।

মসুর ডালের মোটা ধরনের কেজি ছিল ৮০ টাকা, যা আগের মাসে ছিল ৮১ টাকা। তবে খুচরা বাজারে এই ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা কেজি দরে। ফলে পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামে কেজিতে ৬০ টাকা ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।

আদার পাইকারি দাম ছিল কেজিতে ৮০ টাকা। আগের মাসে দাম ছিল ৭০ টাকা। এক মাসের ব্যবধানে আদার দামে ২৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে বলে সরকারি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। খুচরা বাজারে আদা বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা কেজি দরে। হলুদের পাইকারি দাম ছিল কেজিতে ১০৫ টাকা, যা আগের মাসে ছিল ৯৫ থেকে ১০০ টাকা। খুচরা বাজারে হলুদ বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে।

মুরগি ও মাংসের বাজার
ব্রয়লার মুরগির পাইকারি দাম ছিল কেজিতে ১৪৬ থেকে ১৫৮ টাকা। আগের মাসে দাম ছিল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। এক মাসের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির গড় দামে এক দশমিক ৯৪ শতাংশ পতন হয়েছে। তবে গত বছরের একই সময়ে দাম ছিল ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে গড় দাম বেড়েছে এক দশমিক ৩৩ শতাংশ। বর্তমানে খুচরা বাজারে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকা কেজি দরে।

2552

সোনালি মুরগির পাইকারি দাম ছিল কেজিতে ৩০৫ টাকা। আগের মাসে দাম ছিল ২৯৫ টাকা। এক মাসের ব্যবধানে সোনালি মুরগির গড় দামে তিন দশমিক ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। খুচরা বাজারে সোনালি মুরগির কেজি ৩৪০ টাকা।

গরুর মাংসের পাইকারি দাম ছিল কেজিতে ৭৩০ থেকে ৭৫০ টাকা। আগের মাসে দাম ছিল ৭৩০ থেকে ৭৭০ টাকা। এক মাসে গরুর মাংসের গড় দামে এক দশমিক ৩৩ শতাংশ পতন হয়েছে। তবে গত বছরের একই সময়ে গরুর মাংসের কেজি ছিল ৬৬০ থেকে ৬৮০ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে গড় দাম বেড়েছে ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

খাসির মাংসের পাইকারি দাম ছিল কেজিতে এক হাজার ২৫০ টাকা। আগের মাসে দাম ছিল এক হাজার ১৮০ টাকা। এক মাসের ব্যবধানে খাসির মাংসের গড় দামে তিন দশমিক ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে।

এএইচ/এসআই