নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪২ পিএম
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশকে নতুন ঋণের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। একই সময়ে এশিয়ান অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি), চীন ও ভারতের কাছ থেকেও নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। অর্থছাড়ও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় কমে যাওয়ার বিপরীতে পুরোনো ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে মোট ১২৭ কোটি ৩০ লাখ ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের অবদান বেশি। তবে বড় বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি আসেনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম প্রান্তিকে জাপানের কাছ থেকে ৩৫ কোটি ১০ লাখ ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে দেশটি থেকে কোনো ঋণ প্রতিশ্রুতি আসেনি। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছে ১১৫ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি। দুটি ঋণ চুক্তির আওতায় এ অর্থের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসব দেশের কাছ থেকেও কোনো ঋণ প্রতিশ্রুতি ছিল না।
ইউরোপ থেকে তিনটি অনুদান চুক্তির আওতায় ৬ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে গত প্রান্তিকে দুটি ঋণ চুক্তি ও ১১টি অনুদান চুক্তি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সফরে জাপানে রয়েছেন। এ সফরে আগামী পাঁচ বছরের জন্য ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও বিনিয়োগ চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইআরডির জাপান উইংয়ের একজন কর্মকর্তা।
ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, উন্নয়ন সহযোগীরা সাধারণত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য ঋণ দিয়ে থাকে। কিন্তু সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি দীর্ঘদিন ধরে শ্লথ। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার এযাবৎকালের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না বড় উন্নয়ন সহযোগীদের অনেকে। একই কারণে ঋণের অর্থছাড়ও কমছে।
ইআরডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থছাড় হয়েছে ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে অর্থছাড়ের পরিমাণ ছিল ১০০ কোটি ডলারের বেশি। সে হিসাবে অর্থছাড় কমেছে ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ বা ৪৮ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। গত প্রান্তিকে পাওয়া অর্থের মধ্যে ঋণ হিসেবে এসেছে ৫৪ কোটি ১৭ লাখ ডলার। বাকি প্রায় ১২ কোটি ডলার পাওয়া গেছে অনুদান হিসেবে।
প্রথম প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি অর্থছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সহজ শর্তের ঋণদাতা সংস্থা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ)। সংস্থাটি থেকে এসেছে প্রায় ২০ কোটি ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬ কোটি ডলার ছাড় করেছে এডিবি। ভারত থেকে এসেছে ১০ কোটি ৫০ লাখ ডলার। জাপান থেকে অর্থছাড় হয়েছে ৪ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। অন্যান্য দেশের কাছ থেকে এসেছে প্রায় ১২ কোটি ডলার।
অন্যদিকে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় কমলেও পুরোনো ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সুদ ও আসল মিলিয়ে ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ডলারের বিদেশি ঋণ পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১২৮ কোটি ডলারের কিছু কম।
গত প্রান্তিকে পরিশোধিত অর্থের মধ্যে মূল ঋণ ছিল প্রায় ৮৬ কোটি ডলার। বাকি প্রায় ৪৯ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছে সুদ হিসেবে। ঋণ পরিশোধে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ও সরকারি তহবিলের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি, অর্থছাড় ও পরিশোধের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ধীর হলে প্রতিশ্রুতৃ ঋণের অর্থছাড় ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে পুরোনো ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ অব্যাহত থাকায় নতুন অর্থায়ন কমে গেলে বৈদেশিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ আরও বাড়তে পারে।
এএইচ/এআরএম