নিজস্ব প্রতিবেদক
১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০২ পিএম
দেশে দারিদ্র্য কমার পরিবর্তে আবারও বাড়ছে। ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৯ শতাংশে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হারও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ হয়েছে। শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীই নয়, আয় ও ব্যয়ের চাপে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে মধ্যবিত্ত শ্রেণিও। বর্তমানে দেশের প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর সিআইআরডিএপি মিলনায়তনে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) স্টেট অব দ্য রিয়েল ইকোনমি: ডাইনামিক্স অব রিভার্সালস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ শীর্ষক প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রকাশনাটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান ও নামিরা শামীম।
অনুষ্ঠানে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রবণতা এবং মধ্যবিত্তের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়ে পিপিআরসি ও বিশ্বব্যাংকের তথ্যে মিল পাওয়া গেছে। পিপিআরসির জাতীয় প্রতিনিধিত্বমূলক জরিপ অনুযায়ী, গত তিন বছরে দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্য—দুটিই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। বর্তমানে ব্যয়ভিত্তিক জিনি সহগ দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৪৩৬।
জরিপের তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ পরিবার ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এই শ্রেণির মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ। তাঁরা দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকলেও আয় স্থবির হয়ে পড়া, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং আকস্মিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে যেকোনো সময় দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারেন।
স্বাস্থ্য ব্যয়ও মানুষের অর্থনৈতিক সংকট বাড়াচ্ছে বলে উল্লেখ করেন হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের প্রায় অর্ধেক পরিবারের অন্তত একজন সদস্য দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত। ফলে এসব পরিবারকে নিয়মিত ওষুধ ও চিকিৎসার পেছনে অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে সংসারের অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন শুধু আন্তর্জাতিক সংকট কিংবা অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণে সমস্যায় পড়ছে না। বরং উচ্চ দারিদ্র্য, কম বিনিয়োগ ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির একটি কাঠামোগত ফাঁদে আটকে গেছে। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে সাময়িকভাবে সংকট মোকাবিলার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারে গুরুত্ব দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জঁ পেম বলেন, অর্থনীতির প্রধান সমস্যাগুলো সমাধানে বাণিজ্য, সরকারি অর্থব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি খাতে দ্রুত কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেসরকারি খাতের আস্থা ফেরাতে শ্রমবাজার ও শিক্ষাব্যবস্থাকে শিল্প ও ব্যবসা খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে আয়বৈষম্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। আগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে দারিদ্র্য কমার যে সম্পর্ক ছিল, সেটিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে প্রবৃদ্ধির সুফল দারিদ্র্য কমাতে ভূমিকা রাখলেও বাংলাদেশে সেই অগ্রগতি আগের মতো হচ্ছে না।
দেশের রপ্তানি খাতের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, গত ২০ বছরে তৈরি পোশাক খাতের বাইরে বড় কোনো রপ্তানিমুখী খাত গড়ে ওঠেনি। একসময় মোট রপ্তানিতে তৈরি পোশাকের অংশ ছিল ৭৩ থেকে ৭৫ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে ৮৪ থেকে ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান সংকটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, এখন শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই চাকরি নিশ্চিত হচ্ছে না। পাশাপাশি সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে মানুষকে। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম একটি সাধারণ অনুমতির জন্য সরকারি অফিসে ৩০ থেকে ৪০ বার ঘোরার পরিস্থিতি মেনে নেবে না।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা না থাকায় অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকেরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন। তৈরি পোশাক খাতে নারীদের কর্মসংস্থান কমে যাওয়াও উদ্বেগের বিষয়। এ পরিস্থিতিতে নারীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, কৃষি ও পরিবেশবান্ধব খাতে কাজের সুযোগ এবং শিশুযত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সমাপনী বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সংকট স্বীকার করে দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।
এ জন্য অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, প্রবৃদ্ধির নতুন ক্ষেত্র তৈরি, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং শাসনব্যবস্থার সংস্কার—এই পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে একটি সমন্বিত রূপান্তর পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
হোসেন জিল্লুর রহমান আরও বলেন, সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে হয়রানি মানুষের উদ্যোগ, কর্মক্ষমতা ও স্বপ্নকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সেবা ও শাসনব্যবস্থাকে হয়রানিমুক্ত করাও জরুরি। মানুষের জীবনযাত্রায় বাস্তব পরিবর্তন আনতে হলে সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।
এমএইচ/এআর