Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১১ পিএম

মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিয়োগের বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে দেশটির সরকার। এ ছাড়া বাংলাদেশের ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করতে রাজি হয়েছে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে কাজ করছেন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বন্ধ ও সীমিত হয়ে যাওয়া বৈদেশিক শ্রমবাজার পুনরায় চালু ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

যেভাবে পরিচালিত হবে নিয়োগপ্রক্রিয়া

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগ্রহী কর্মীরা তালিকাভুক্ত ও অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করাতে পারবেন অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টার থেকে। এ ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট মেডিক্যাল সেন্টারকে এককভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না। নিয়োগপ্রক্রিয়াটি চারটি ধাপে পরিচালিত হবে।

প্রথম ধাপ: জব অর্ডার সংগ্রহ

মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজেদের উদ্যোগে দেশটির শ্রমবাজার থেকে জব অর্ডার বা কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র সংগ্রহ করতে পারবে।

দ্বিতীয় ধাপ: কর্মী নির্বাচন

যে এজেন্সি জব অর্ডার সংগ্রহ করবে, সেই এজেন্সি বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসরণ করে কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। অর্থাৎ, কর্মী সংগ্রহ ও নির্বাচনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির কাছেই থাকবে।

তৃতীয় ধাপ: মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া

মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) এবং তালিকাভুক্ত অপর ২৫টি প্রসেসিং ও সার্ভিস এজেন্সি প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। এ প্রক্রিয়ার মধ্যে কলিং ভিসা, ই-ভিসা এবং অন্যান্য নির্ধারিত সরকারি কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত।

চতুর্থ ধাপ: বিএমইটি ছাড়পত্র

মালয়েশিয়ার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম শেষ করবে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত প্রতিটি বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সি নিজস্ব নিয়োগ লাইসেন্সের অধীনেই কর্মীদের বিএমইটি ছাড়পত্রের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবে। অর্থাৎ, যে এজেন্সি জব অর্ডার সংগ্রহ ও কর্মী নির্বাচন করবে, সেই এজেন্সিই নিজস্ব লাইসেন্সের অধীনে কর্মীদের সরকারি ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে।

প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বোয়েসেল ও অপর ২৫টি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দিতে পারবে। এর মাধ্যমে প্রতিটি রিক্রুটিং এজেন্সির নিজস্ব দায়িত্ব, জবাবদিহি ও ব্যবসায়িক স্বাধীনতা বজায় থাকবে।

কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষায় জোর

মন্ত্রণালয় বলেছে, পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বাংলাদেশের কর্মীদের স্বার্থ। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, তবে সে জন্য কোনো কর্মীকে অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা বহন করতে দেওয়া যাবে না। কর্মীরা যাতে সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় কাজের সুযোগ পান, সেটিই সরকারের লক্ষ্য।

রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে দেশের আইন মেনে এবং কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে ব্যবসা পরিচালনা, নতুন জব অর্ডার সংগ্রহ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ

মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী, এ তালিকা চূড়ান্ত করার দায়িত্ব বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার যৌথ।

শ্রমবাজার দ্রুত চালুর স্বার্থে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যমান মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিল। তবে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে সরেজমিনে প্রতিটি মেডিক্যাল সেন্টার পরিদর্শনের পর চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে। এ কারণে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগবে।

এ অবস্থায় মালয়েশিয়া সরকার অনুমোদিত বিদ্যমান তালিকা থেকে বাংলাদেশের অনুরোধে ফ্যাসিবাদ ও অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত মেডিক্যাল সেন্টারগুলো বাদ দিয়ে দেশটির সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত অবশিষ্ট সেন্টারগুলোর মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে শ্রমবাজার চালুর পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব মালয়েশিয়ার তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে নতুন নীতিমালার আলোকে যাচাই-বাছাই করে মেডিক্যাল সেন্টারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ শুরু করবে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত মেডিক্যাল সেন্টারগুলো বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত যাচাই-বাছাই করে। এসব সেন্টারকে স্থানীয় নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেন্টারটির কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য করবে। এ প্রক্রিয়া নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।

পর্যায়ক্রমে তালিকায় নতুন মেডিক্যাল সেন্টার যুক্ত করা হবে। এ বিষয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। নতুন সেন্টার যুক্ত হলে তা মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ও অনুমোদিত সেন্টারগুলোর তালিকা প্রকাশ করবে।

দীর্ঘমেয়াদি শ্রমবাজার গড়ার লক্ষ্য

মন্ত্রণালয় বলেছে, সরকারের লক্ষ্য শুধু মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো নয়; বরং আরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈধ ও যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো, নিয়োগপ্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করা এবং কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা।

এ উদ্যোগকে শুধু একটি শ্রমবাজার পুনরায় চালুর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না সরকার। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার শ্রম সহযোগিতার একটি নতুন ও আরও অংশগ্রহণমূলক অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে এটিকে দেখতে চায় মন্ত্রণালয়।

এই অগ্রগতি অর্জনে দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা ও ইতিবাচক মনোভাবের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ সুযোগ সফল করতে সরকার, রিক্রুটিং এজেন্সি ও কর্মীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি, সুশৃঙ্খল ও টেকসই শ্রমবাজার গড়ে তোলাই এখন লক্ষ্য।

এআর