নিজস্ব প্রতিবেদক
১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম
ব্যস্ত সড়ক, আধুনিক গণপরিবহন, বহুতল বাণিজ্যিক ভবন, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ও বিপণিবিতান—সব মিলিয়ে রাত পর্যন্ত সচল জনজীবনের শহর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নগরকেন্দ্রে পর্যটন, ব্যবসা, পরিবহন, আবাসন ও সেবাখাতের বিস্তৃত কর্মকাণ্ড অর্থনীতিকে গতিশীল রেখেছে। তবে একটি শহরের অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে শুধু উন্নত অবকাঠামো কিংবা আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রই ভূমিকা রাখে না। মানুষের নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং প্রশাসনের ওপর আস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংককের অভিজ্ঞতা বলছে, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারলে ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক থাকে, পর্যটকেরা অর্থ ব্যয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ পান। অন্যদিকে অপরাধ, প্রতারণা কিংবা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে একটি শহরের সুনাম ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে থাইল্যান্ডের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির প্রায় ৮৯ শতাংশ এসেছে নগরাঞ্চল থেকে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির মোট উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক আসে ব্যাংকক থেকে। অর্থাৎ রাজধানীর উৎপাদনশীলতা ও নগর ব্যবস্থাপনার উন্নতি জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে ব্যাংককের অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি যানজট, অবকাঠামোর ওপর চাপ ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকিও রয়েছে।

যানজটের কারণে প্রতিবছর ব্যাংককের মোট আঞ্চলিক উৎপাদনের আনুমানিক ৭ থেকে ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। এই পরিসংখ্যান দেখায়, একটি শহরকে নিরাপদ করার পাশাপাশি দক্ষ, বাসযোগ্য ও গতিশীল করে তোলাও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ।
পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র ব্যাংকক
থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। দেশটির পর্যটন ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক পর্যটক এসেছেন ৩ কোটি ২৯ লাখ ৭০ হাজার। তাঁদের কাছ থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৫৪ ট্রিলিয়ন বাত। একই বছরে অভ্যন্তরীণ পর্যটনসহ দেশটির মোট পর্যটন আয় ছিল প্রায় ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন বাত।
তবে ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা কমেছে ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং মোট পর্যটন আয় কমেছে ১ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ বিপুল পর্যটন অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও পর্যটকের সংখ্যা ও আয় ধরে রাখা থাইল্যান্ডের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। ব্যাংককের নিজস্ব পরিসংখ্যানেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়।
থাইল্যান্ডের জাতীয় পরিসংখ্যান দফতরের Bangkok Statistical Data 2025 অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্যাংককে আসা ভ্রমণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ। অর্থাৎ এক বছরে ভ্রমণকারীর সংখ্যা কমেছে ২ দশমিক ২৮ শতাংশ। তাঁদের মধ্যে রাতযাপনকারী ভ্রমণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ। ব্যাংককে রাতযাপনকারী বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা আগের বছরের ৬৯ লাখ ৫০ হাজার থেকে কমে প্রায় ৬৬ লাখ ৯০ হাজারে দাঁড়ায়।
নিরাপত্তায় প্রযুক্তি ও সমন্বিত উদ্যোগ
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে থাইল্যান্ডের পর্যটন পুলিশ প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও বহুভাষিক সহায়তার ব্যবস্থা জোরদার করেছে।

থাইল্যান্ডের পর্যটন পুলিশের ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা ব্যবস্থার সহায়তায় ৫০০-এর বেশি পরোয়ানাভুক্ত সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রে অপরাধ প্রতিরোধ এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পর্যটকদের জরুরি সহায়তার জন্য রয়েছে ১১৫৫ নম্বরে পর্যটন পুলিশের হটলাইন এবং Thailand Tourist Police অ্যাপ। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অ্যাপটি আটটি ভাষায় সহায়তা দিতে পারে। এতে জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের জন্য রয়েছে এসওএস সুবিধা।
এ ছাড়া ২০২৫ সালে চালু করা Trusted Thailand উদ্যোগের মাধ্যমে পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা ও সেবার মান উন্নত করার চেষ্টা চলছে। ২০২৬ সালের মে মাসে থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষ এ উদ্যোগ জোরদারের কথা জানায়। হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিপণিবিতান ও পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তা এবং সেবার মান সম্পর্কে পর্যটকদের আস্থা তৈরি করাই এর অন্যতম লক্ষ্য।
থাইল্যান্ড নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ভাবনা
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সম্মেলন থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এই বড় আয়োজনে বিশ্বের ১৯০টি দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেছেন। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ব্যাংককসহ পুরো দেশে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে থাইল্যান্ডের রয়্যাল থাই পুলিশ ও ব্যাংকক মেট্রোপলিটন পুলিশ।
বিশ্বনেতা ও আন্তর্জাতিক অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজধানীতে যান চলাচলে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে থাই কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাব্যবস্থা ও বিশেষ ট্রাফিক পরিকল্পনা কার্যকর করেছে। ১০ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত সম্মেলনের প্রধান ভেন্যু ও ভিআইপি হোটেলগুলোর ১০০ মিটারের মধ্যে সব ধরনের জনসভা, মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ব্যাংককের কেন্দ্রস্থলে তীব্র যানজট এড়ানো এবং ভিআইপি বহরের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে ট্রাফিক কন্ট্রোল অ্যান্ড কমান্ড সেন্টার (১১৯৭) ও ট্রাফিক পুলিশ নির্দেশিকা জারি করেছে। যান চলাচলের ওপর চাপ কমাতে ব্যাংকক সিটি করপোরেশন নির্দিষ্ট দিনগুলোতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বাড়ি থেকে কাজ করার ব্যবস্থা এবং ১৬ অক্টোবর বিশেষ ছুটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
বিশ্বব্যাংকের থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার বিভাগের পরিচালক স্টিফেন এন. এনদেগওয়া ২০২৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নগর অর্থনীতিবিষয়ক প্রতিবেদনে বলেছেন, ভবিষ্যতের থাই শহর গড়ে তোলা কেবল নগর পরিকল্পনার বিষয় নয়; এটি প্রবৃদ্ধি, প্রতিযোগিতা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার বিষয়।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের এই বিশ্লেষণ ব্যাংককের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ, একটি আন্তর্জাতিক নগরকেন্দ্রের উৎপাদনশীলতা শুধু কারখানা, অফিস কিংবা বাণিজ্যিক ভবনের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। কর্মীরা কতটা নিরাপদে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন, ব্যবসা কতটা নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয় এবং বিদেশি গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীরা কতটা আস্থা পান—এসব বিষয়ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার অংশ।

একই প্রতিবেদনে পরিকল্পনা ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ড. পুন থিয়েংবুরানাথুম বিনিয়োগ আরও কৌশলগতভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শহরের অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামো ও সেবার উন্নয়ন করা হলে নগর বিনিয়োগ থেকে বেশি সুফল পাওয়া সম্ভব।
থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষের গভর্নর থাপানি কিয়াতফাইবুল ২০২৬ সালের মে মাসে Trusted Thailand উদ্যোগ নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে পর্যটকদের আস্থাকে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন প্রতিযোগিতার জন্য অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, নিরাপত্তা, ন্যায্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও টেকসই সেবাকে পর্যটকের পুরো ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
একেএস/এআর