Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

বাংলাদেশে ৩.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আভাস আইএমএফের, মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৭ এএম

চলতি বছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে আগামী বছর প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামতে পারে।

একই সঙ্গে ২০২৭ সালে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কাও করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে আইএমএফের অক্টোবরের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

‘রেজিলিয়েন্স আন্ডার স্ট্রেইন, আর্জেন্ট চয়েসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতি নানা ধাক্কা সামলে টিকে থাকলেও সব দেশ সমানভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারছে না। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সুবিধা পাওয়া দেশগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি চাপে রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে। এতে ডলারের চাহিদা, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় এবং উৎপাদন খরচের ওপর চাপ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে পণ্য ও সেবার দামে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

আইএমএফের হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। তবে ২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ চলতি বছর সামান্য উন্নতির সম্ভাবনা থাকলেও আগামী বছরে অর্থনীতির গতি দুর্বল হতে পারে। বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এশিয়ার কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কম। আইএমএফের হিসাবে, ২০২৬ সালে ভারতের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ শতাংশ, ভিয়েতনামের ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং চীনের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস নেপালের সমান, ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

তবে বিভিন্ন দেশের অর্থবছর ও হিসাবের সময়সীমায় পার্থক্য থাকায় এসব পূর্বাভাস তুলনার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।

মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। কিন্তু ২০২৭ সালে আবার বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে।

পূর্বাভাসে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য নিয়েও উদ্বেগের ইঙ্গিত রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্য ছিল জিডিপির প্রায় শূন্য শতাংশ। ২০২৬ সালে তা ঘাটতিতে পড়ে জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে ঘাটতি বেড়ে ২ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

চলতি হিসাবে ঘাটতি বাড়লে আমদানি ব্যয়, রফতানি আয়, প্রবাসী আয় ও সেবা খাতের বৈদেশিক লেনদেনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে আমদানি বিল বাড়তে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে চলতি হিসাবের ঘাটতির পূর্বাভাস থেকেই রিজার্ভ বা ডলারের বাজারে ঠিক কতটা চাপ তৈরি হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এর জন্য রফতানি, প্রবাসী আয়, মূলধনি প্রবাহ এবং অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।

জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

আইএমএফের প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে উঠেছিল। জুনের শুরুতে দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি স্থিতিশীল হয়। সেপ্টেম্বরে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধের আগের স্তরের ৮৮ শতাংশে পৌঁছায়।

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে অপরিশোধিত তেলের গড় দাম ২০২৫ সালের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি থাকতে পারে। প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়তে পারে ৪৮ শতাংশ।

এআই বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধির আশা

বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে এআই খাতের বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছে আইএমএফ। এআই প্রযুক্তি, ডেটা সেন্টার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে বিনিয়োগের ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত অর্থনীতির কয়েকটি দেশ এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারী দেশগুলো উপকৃত হচ্ছে।

তবে এআই খাতে বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল না এলে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রযুক্তিটির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সক্ষমতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ না হলে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। এতে শেয়ারবাজার, ভোগব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার ও বিনিয়োগ বাড়লে ২০২৯ সালের মধ্যে বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আরও শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি ঋণ নিয়ে সতর্কবার্তা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, ঋণের চাপ বাড়লে সরকারগুলোর নতুন সংকট মোকাবিলার আর্থিক সক্ষমতা কমে যায়। একই সঙ্গে ঋণের সুদ ব্যয় বাড়লে উন্নয়ন ও জনসেবায় ব্যয় করার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি অর্থব্যবস্থাকে টেকসই করা, মধ্যমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা গ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

সব মিলিয়ে, এআই বিনিয়োগের সহায়তায় বিশ্ব অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপ সেই প্রবৃদ্ধির স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

এমআর