নিজস্ব প্রতিবেদক
০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৮ পিএম
তৈরি পোশাক খাতের টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব রূপান্তরে বিশ্বব্যাংকের ৫ মিলিয়ন ডলারের তহবিল ও প্রকল্পের পরিধি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। সংগঠনটি বলেছে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশগত শর্ত পূরণে পানি সাশ্রয়, বর্জ্যপানি পরিশোধন ও পানি পুনর্ব্যবহারে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও উচ্চ ব্যয়ের কারণে অনেক কারখানার পক্ষে তা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক মারা কে. ওয়ারউইকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের বৈঠকে এিই আহ্বান জানানো হয়।
বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন ‘ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম’ এবং এর আওতায় ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ভিজিএফ (ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং) পাইলট প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বিজিএমইএর পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে ৩১টি কারখানার একটি তালিকা প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর মধ্য থেকে বিশ্বব্যাংক আটটি কারখানাকে নিয়ে কাজ শুরু করবে। তবে টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারে দেশের পোশাক কারখানাগুলোর আগ্রহ ও চাহিদার তুলনায় তহবিল ও নির্বাচিত কারখানার সংখ্যা খুবই কম বলে বৈঠকে তুলে ধরা হয়।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, পানি ব্যবস্থাপনা এখন শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। বিশেষ করে ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো পোশাক উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে পানির ব্যবহার কমানো, বর্জ্যপানি পরিশোধন এবং পানি পুনর্ব্যবহারের তথ্যকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ঢাকার নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষার পাশাপাশি রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে পানি সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি। এ কারণে প্রকল্পের তহবিল ও পরিধি আরও বড় করার জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
বৈঠকে বিজিএমইএ নেতারা বলেন, পোশাক কারখানায় টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের অন্যতম বড় বাধা হলো উচ্চ বিনিয়োগ ব্যয়। এর ফলে অনেক প্রকল্পের আর্থিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করা উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়া নিয়েও চাপ রয়েছে।
তাদের মতে, বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা যদি অনুদান কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ও শূন্য সুদে সহজ শর্তে বড় পরিসরে অর্থায়ন করে, তাহলে পোশাক কারখানাগুলোর জন্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা সহজ হবে।
বৈঠকে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। অনেক কারখানায় নিজস্ব বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি স্থাপনের জায়গা থাকলেও আশপাশে উপযুক্ত জলাশয় বা নিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই। আবার ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোর এককভাবে বড় শোধনাগার স্থাপনের আর্থিক সক্ষমতাও সীমিত।
এ অবস্থায় স্থায়ী পাইপলাইন স্থাপনের পরিবর্তে লরি বা ট্যাংকারের মাধ্যমে শিল্পবর্জ্য অপসারণ এবং ক্লাস্টারভিত্তিক বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলেও এ ধরনের কার্যক্রম দ্রুত সম্প্রসারণের আহ্বান জানানো হয়।
বৈঠকে শিল্প খাতে টেকসই বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পরিবেশগত নীতি ও সরকারি বিধিবিধান হঠাৎ পরিবর্তন না করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিজিএমইএ নেতারা বলেন, কোনো নিয়ম বাস্তবায়নের আগে পর্যাপ্ত সময় ও পূর্বাভাস দেওয়া হলে কারখানাগুলো দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগে আরও উৎসাহিত হবে।
বৈঠকে বিজিএমইএর পরিচালক ড. মো. হাসিব উদ্দিন অংশ নেন। বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দলে ছিলেন লিড ওয়াটার স্পেশালিস্ট ডেভিড মেলকম লর্ড, সিনিয়র ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন স্পেশালিস্ট রোকেয়া আহমেদ, ওয়াটার স্পেশালিস্ট মো. মাহাদী হাসান এবং এনভায়রনমেন্টাল স্পেশালিস্ট বুশরা নিশাত।
বৈঠক শেষে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দল বিজিএমইএর প্রস্তাবগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সবুজ রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।
এমআর/এএম