Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

অর্থবছরের শুরুতেই আয়-ব্যয়ের টানাপড়েন, বাড়ছে চাপ

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৫ পিএম

  • দুই মাসে রাজস্ব ঘাটতি ২৯ হাজার কোটি টাকা
  • বিদেশি ঋণ ছাড় কমেছে, বেড়েছে ঋণ পরিশোধ
  • নতুন ঋণের চেয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধ বেশি
  • জ্বালানি খাতে বাড়ছে সরকারের ব্যয়
  • এলএনজি ভর্তুকি ছাড়িয়েছে বাজেট বরাদ্দ
  • বেতন-ভাতা বাড়লে অতিরিক্ত ব্যয় ১ লাখ কোটি টাকার বেশি
  • রফতানি কমেছে, আমদানি ব্যয় বেড়েছে

বাজেটের অর্থায়নে চলতি অর্থবছরের শুরুতেই দুই দিক থেকে চাপ বাড়ছে সরকারের। একদিকে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত হারে বিদেশি ঋণের অর্থ ছাড় হচ্ছে না, অন্যদিকে আগে নেওয়া ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের দায় ক্রমেই বাড়ছে। এর সঙ্গে রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বাড়তি ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং বড় প্রকল্পে সরকারি অর্থায়নের চাপ যুক্ত হয়েছে। ফলে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড বাজেট বাস্তবায়নে অর্থের জোগান নিয়ে অর্থবছরের শুরুতেই টানাপড়েন তৈরি হয়েছে।

উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে গত তিন অর্থবছরে গড়ে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি ডলার ঋণ পেয়েছে বাংলাদেশ। বিপরীতে ঋণের দায় পরিশোধ হয়েছে বছরে গড়ে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বা প্রায় ৯০০ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ পাওয়ার প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের চিত্র বলছে, সে লক্ষ্যে অর্থ ছাড় হচ্ছে না। বরং কিছু মেগা প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ বাড়ছে।

অর্থাৎ নতুন ঋণের অর্থপ্রাপ্তি প্রত্যাশার তুলনায় কমলেও পুরোনো ঋণের দায় পরিশোধে সরকারের ব্যয় বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে বাজেটের অর্থায়ন ব্যবস্থায়। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার চাপও বাড়ছে। ফলে বিদেশি অর্থায়ন কমে যাওয়া এবং ঋণ পরিশোধের দায় বাড়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

এর সঙ্গে রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্র অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৫১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। শুধু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় নয়, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে আহরিত ৫৪ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকার চেয়েও এবার রাজস্ব কম এসেছে।

চলতি অর্থবছরে সরকার মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের রাজস্ব আহরণের পরিসংখ্যান এনবিআর এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি।

রাজস্ব আহরণে এ দুর্বলতার পেছনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধীরগতিও প্রভাব ফেলছে। উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট ও বাজারে চাহিদা কম থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগের গতি কমেছে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি টানা পাঁচ মাস ধরে ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। এতে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও মুনাফায় চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে সরকারের কর আহরণের ভিত্তিও দুর্বল হচ্ছে।

সরকারি বিনিয়োগেও তেমন গতি নেই। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার এডিপি বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। এটি ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়ন হার। চলতি অর্থবছরের শুরুতেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। জুলাই-আগস্ট দুই মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

image

এদিকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতেও বাড়ছে সরকারের ব্যয়ের চাপ। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় জ্বালানি সরবরাহ ও দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত সাড়ে ছয় মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

স্পট মার্কেটে এ সময়ে এলএনজির দাম তিন গুণ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের শুরুর আড়াই মাসেই এলএনজি খাতে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অথচ পুরো অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান বাজারদর অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিদ্যুৎ খাতেও লোকসান ৬০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

জ্বালানি ও বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয়ের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিও সরকারের ব্যয়ে নতুন চাপ তৈরি করছে। পুরোপুরি কার্যকর হলে এ খাতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় ১ লাখ কোটি টাকার বেশি হতে পারে। এর সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বাবদও বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হবে।

অন্যদিকে রফতানি কমে আমদানি ব্যয় বাড়ায় বৈদেশিক লেনদেনেও চাপ তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাইয়ে পণ্য রফতানি হয়েছিল ৪৪২ কোটি ডলারের। চলতি অর্থবছরের একই মাসে তা কমে হয়েছে ৪৩৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ রফতানি কমেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। বিপরীতে চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে আমদানি হয়েছে ৬৪৪ কোটি ডলারের পণ্য, যা আগের অর্থবছরের একই মাসে ছিল ৫৯৩ কোটি ডলার। এ হিসাবে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

রফতানি আয় কমা ও আমদানি ব্যয় বাড়ার এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মোট বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান ছাড় হয়েছে প্রায় ২৯ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে ছাড় হয়েছিল প্রায় ৭৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অর্থ ছাড় কমেছে প্রায় ৪৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। এ সময়ে নতুন সহায়তার প্রতিশ্রুতিও বড় ধরনের বাড়েনি।

অন্যদিকে জুলাই ও আগস্টে মোট ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার ডলার বা প্রায় ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে মূল ঋণ বাবদ পরিশোধ হয়েছে ৫১ কোটি ৬০ লাখ ৪০ হাজার ডলার এবং সুদ বাবদ ১৮ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার।

গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল বাবদ ৪৪৯ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে সরকার, যা স্থানীয় মুদ্রায় ৫৪ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরে পরিশোধ হয়েছিল ৪০৮ কোটি ডলার বা ৪৯ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ৪১ কোটি ডলার বা ৬ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা।

ইআরডির বৈদেশিক সাহায্যের বাজেট ও হিসাব বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বিভিন্ন প্রকল্পে নেওয়া ঋণের সুদ ও আসলসহ কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের শেষ পর্যায়ে থাকায় বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের সুদের হারও বেড়েছে। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বিনিময় হার নমনীয় করায় ডলারের বিপরীতে টাকার মানও কিছুটা কমেছে। এসব কারণে বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে। পুরোনো ঋণ যে হারে পরিশোধ করা হচ্ছে, সে হারে নতুন অর্থ ছাড় হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।’

বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপরও নির্ভরতা বাড়াচ্ছে সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে সরকারের ঋণের চাহিদা আরও বেড়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ সময়ের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশিত হয়নি।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘অর্থবছরের শুরুতেই সরকার অর্থ সংকটে পড়েছে—বিভিন্ন আলামত থেকে তা বোঝা যাচ্ছে। জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে ব্যয়ের চাপ কিছুটা সামাল দেওয়া গেলেও সামগ্রিক চাপ কমছে না। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের বাড়তি অর্থ ব্যয় হবে। এর সঙ্গে বড় প্রকল্পে সরকারি অর্থায়নের দায়ও যুক্ত হবে। ফলে ব্যয় যে হারে বাড়ছে, সে তুলনায় অর্থায়নের উৎস এখনো পরিষ্কার নয়।’

ব্যয়ের চাপ শুধু আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির কারণে তৈরি হয়নি উল্লেখ করে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘এরই মধ্যে যেসব বড় ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অর্থায়ন কীভাবে হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। শুধু কর বাড়িয়ে বা উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে এ চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ, রাজস্ব আয় এবং ব্যয় সাশ্রয়—সব দিক সমন্বয় করেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করলেও বর্তমান বৈশ্বিক সুদহার বিবেচনায় এর ব্যয় কম হবে না। পাশাপাশি বন্ডের অর্থ নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে পরিশোধের চাপও তৈরি করবে। তাই অর্থ পাওয়ার প্রত্যাশায় আগেই ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিলে ভবিষ্যতে সরকারের আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে।’

রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক অর্থ ছাড় কমে যাওয়া এবং পুরোনো ঋণ পরিশোধের চাপের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়লে ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণের চাহিদাও বাড়বে। এতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তিতে চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সুদহার বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে বাজেটের অর্থায়ন সংকট সামাল দিতে গিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির মতো উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড ছেড়ে অর্থ সংগ্রহের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে সরকারের। তবে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বন্ডের সুদহার বেশি হতে পারে। ফলে বেশি সুদে বন্ড ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ করলে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের আর্থিক চাপ আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

টিএই/এআর