Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

মূল্যস্ফীতি ও ঋণ প্রবাহের ভারসাম্যে নতুন মুদ্রানীতি

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩০ পিএম

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্যাংকঋণের চাহিদা বাড়ানোর লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। 

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের প্রধান ভবনের পঞ্চম তলায় জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যান্য ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান কর্মকর্তা, গবেষণা বিভাগের নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও সহকারী মুখপাত্রসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা এতে উপস্থিত থাকবেন।

নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি কমানোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি অর্থনীতিতে ঋণ ও বিনিয়োগের গতি ফেরানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। কারণ বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকলেও বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোর মধ্যে ভারসাম্য রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাই শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। জুনে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা ছিল রেকর্ড সর্বনিম্ন। ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগের স্থবিরতা, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদের হার ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলেও নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কম থাকায় সেই অর্থ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে না।

বিশেষ করে শিল্প, নির্মাণ ও পরিবহন খাতে নতুন ঋণের চাহিদা দুর্বল রয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে তারল্য থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। এতে একদিকে ব্যাংকিং খাতে তারল্য ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধির গতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২ আগস্ট নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করেছে। ঋণের খরচ কমিয়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো ছিল এ সিদ্ধান্তের অন্যতম উদ্দেশ্য। তবে নীতি সুদহার কমানোর পরও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের ওপরে উঠতে পারেনি।

এ অবস্থায় নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকঋণের প্রবাহ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী ধরনের অবস্থান নেয়, সেদিকে নজর রয়েছে ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারদের। বিশেষ করে ঋণের চাহিদা কম থাকা অবস্থায় ব্যাংকিং খাতের তারল্য কীভাবে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। জুলাইয়ে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। আগস্টের মূল্যস্ফীতি গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন হলেও তা এখনো ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে।

ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কাটেনি। এমন পরিস্থিতিতে নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি কমানোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে অর্থনীতিতে ঋণ ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ কতটা রাখা হবে, সেটিই নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এদিকে বছরে দুইবারের পরিবর্তে তিন মাস পর পর মুদ্রানীতি ঘোষণার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি সংসদীয় কমিটিতে বছরে চারবার মুদ্রানীতি ঘোষণার প্রস্তাব এসেছে। অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মুদ্রানীতিকে দ্রুত সমন্বয় করাই এ ধরনের প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য।

তিন মাস পর পর মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হলে মূল্যস্ফীতি, ঋণপ্রবাহ, বিনিয়োগ ও তারল্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্রুত নীতি সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সময়মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া এবং নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর।

মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ, ঋণের পরিবেশ ও সুদের হারে প্রভাব ফেলে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি থাকলে অতিরিক্ত চাহিদা কমাতে নীতি কঠোর করার সুযোগ থাকে। আবার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হলে উৎপাদন ও বিনিয়োগে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়।

রেপো, রিভার্স রেপোসহ বিভিন্ন বাজারভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের তারল্য ও সুদের হারেও প্রভাব ফেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাই নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়াতে কী ধরনের নীতি নেওয়া হয়, তা আগামী তিন মাসের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

টিএই/এএইচ