নিজস্ব প্রতিবেদক
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম
কোনো ধরনের আলোচনা, গণশুনানি, জনপরামর্শ ও অংশীজনের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা ছাড়াই জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সংস্থাটি বলেছে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা ও রাজস্ব চাপের কারণে নেওয়া এ সিদ্ধান্ত জনস্বার্থবিরোধী এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই জ্বালানি তেলের বর্ধিত দাম অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তারা।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এসব দাবি জানানো হয়।
আইপিডি জানায়, দেশের ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ডিজেল। পরিবহন, কৃষি ও পণ্য সরবরাহে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে বাস ও পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব কৃষি উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর পড়বে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে।
আইপিডি বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসেও সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। এর মধ্যে পাঁচ মাসের ব্যবধানে তিন দফা মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর চাপ তৈরি করেছে। একই সময়ে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ চললেও বিপুলসংখ্যক বেসরকারি চাকরিজীবী, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের আয় সে তুলনায় বাড়ছে না।
সংস্থাটির মতে, জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ শুধু বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের আয়-ব্যয়ের বিষয় নয়। এর সঙ্গে গণপরিবহন, কৃষি, শিল্প, পণ্য সরবরাহ, খাদ্যপণ্যের দাম, মূল্যস্ফীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সরাসরি যুক্ত। তাই বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা এবং সম্ভাব্য সামাজিক-অর্থনৈতিক অভিঘাত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
আইপিডি বলেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও বিপিসির আর্থিক চাপ বাস্তব হলেও এর পুরো বোঝা একবারে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া টেকসই সমাধান নয়। বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয়, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, রেশনিং, করছাড় ও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে সরকারকে যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে আইপিডি—
১. অবিলম্বে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য বাতিল করতে হবে।
২. ভবিষ্যতে জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে।
৩. আন্তর্জাতিক বাজারের অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানির ওপর প্রযোজ্য শুল্ক, কর ও ভ্যাট সাময়িকভাবে সমন্বয় করে ভোক্তার ওপর চাপ কমাতে হবে।
৪. সবার জন্য ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে কৃষি সেচ, গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন ও জরুরি সেবায় ডিজিটালভাবে যাচাইযোগ্য লক্ষ্যভিত্তিক জ্বালানি সহায়তা চালু করতে হবে।
৫. ডিজেলনির্ভর কৃষি কমাতে সৌর সেচ দ্রুত সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৃষকদের সহজ অর্থায়ন ও প্রণোদনা দিতে হবে।
৬. জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের অপচয়, অদক্ষতা, সিস্টেম লস ও উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জের কাঠামো স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে।
৭. কৌশলগত জ্বালানি মজুত, গণপরিবহন, রেল ও নৌপথ, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
আইপিডি বলেছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সময়ে শুধু মূল্য বাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় আর্থিক চাপ সামাল দেওয়ার পরিবর্তে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন, গণপরিবহন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য রেখে জ্বালানি মূল্যনীতি প্রণয়ন করা জরুরি। জনস্বার্থ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পুনর্বিবেচনা করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
এএইচ/এআর