নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০৫ পিএম
ব্যাংকের মুনাফা বাড়লেই যে তার মূল ব্যবসা বা ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা শক্তিশালী হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বর্তমানে অনেক ব্যাংক ঋণ ও অগ্রিমের পরিবর্তে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়িয়ে আয় করছে।
এতে মুনাফা বাড়লেও ব্যাংকের প্রকৃত ব্যবসায়িক সক্ষমতার চিত্র আড়ালে থেকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিজয়নগরে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরামের (সিএমজেএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত ‘ইন-ডেপথ ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস অব ব্যাংকিং সেক্টর’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকের মূল ব্যবসা হলো অর্থ সংগ্রহ করে তা ঋণ হিসেবে বিনিয়োগ করা এবং সেখান থেকে সুদ আয় করা। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকের মুনাফা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে আসা আয়ও বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে কোনো ব্যাংকের মুনাফা বাড়লেও তার ঋণ ও অগ্রিমের প্রবৃদ্ধি বা মূল ব্যবসার সক্ষমতা একইভাবে বেড়েছে কি না, তা আলাদাভাবে দেখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, গত দুই বছরে ব্যাংকিং খাতে মুনাফার ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সময় বিভিন্ন ব্যাংক উল্লেখযোগ্য অর্থ আয় করেছে। পাশাপাশি সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকেও আয় করেছে ব্যাংকগুলো। ফলে কোনো কোনো ব্যাংকের ঋণ ও অগ্রিম কমলেও সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বেড়েছে এবং মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যাংকের নিট সুদ আয় বা নেট ইন্টারেস্ট ইনকাম আরও স্পষ্টভাবে উপস্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে এমটিবির এমডি বলেন, ব্যাংকের প্রকৃত ব্যবসা থেকে কতটা আয় হচ্ছে এবং বিনিয়োগ থেকে কতটা আয় আসছে, সেটি আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
এদিকে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতিকেও সামগ্রিকভাবে দেখার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। তার মতে, আগে খেলাপি ঋণকে মূলত সরকারি ব্যাংকগুলোর সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। এখন বেসরকারি ব্যাংকসহ পুরো ব্যাংকিং খাতেই এটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বিষয়টি কোনো একটি ব্যাংকের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকের মুনাফা বাড়লেও সামনে প্রভিশনের প্রয়োজনীয়তা বাড়তে পারে। বিভিন্ন সময়ে নীতিগত সহায়তার আওতায় দেওয়া ঋণের একটি অংশ এখন খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। কিছু ঋণ এখনো নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) হিসেবে দেখানো সম্ভব না হলেও ভবিষ্যতে সেগুলোর বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে। এতে ব্যাংকের প্রভিশন ব্যয় বাড়বে।
এ পরিস্থিতিতে ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত বা কোল্যাটেরাল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে দেওয়া ঋণের বড় অংশ নগদ অর্থায়ন বা ক্যাশ ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে হওয়ায় ঋণ আদায়ে সমস্যা দেখা দিলে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে বলেও জানান তিনি।
ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি নিয়েও সতর্ক করেন এমটিবির এমডি। তিনি বলেন, কোনো ব্যাংকের আমানত ও বিনিয়োগের পরিসংখ্যান দেখেই তারল্য পরিস্থিতি ভালো রয়েছে বলে সিদ্ধান্তে আসা ঠিক নয়। কোনো ব্যাংকের বিনিয়োগের বড় অংশ যদি আটকে যায়, তাহলে কাগজে-কলমে তারল্য থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
সৈয়দ মাহবুবুর রহৃমান বলেন, ব্যাংক খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে প্রতিটি ব্যাংকের ব্যালান্সশিট সঠিকভাবে নির্ণয় করা, সক্ষম ও কমপ্লায়েন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এবং আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন সিএফএ সোসাইটির প্রেসিডেন্ট মাহতাব ওসমানী ও নর্থ স্টার ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের মো. মিনহাজ জিয়া। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিএফএ সোসাইটির সেক্রেটারি এস এম গালিবুর রহমান।
এমআর/এআরএম